ভুখা পেটের বিকল্প খাবার থেকে জিআই তকমা, যেভাবে বিখ্যাত হল লাল পিঁপড়ের চাটনি

GI, red ant chutney: ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় কাই চাটনি নামে পরিচিত এই খাবারটি। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার খাবার এই চাটনি।

বেড়াতে গিয়ে স্থানীয় খাবারের খোঁজ তো করেন অনেকেই। কিন্তু সেই খাবার খুঁজতে খুঁজতে যদি আপনার হাতে এসে পড়ে এক বাটি পিঁপড়ের চাটনি। মুখ ঘোরালে চলবে না মোটেই। কারণ এই পিঁপড়ের চাটনিই কিন্তু আজ ডেলিকেসি। অন্তত ওড়িশার তো বটেই। সম্প্রতি জিআই তকমা পেয়েছে ওড়িশার এই লাল পিঁপড়ের চাটনি। সেই জিআই তকমা, রসগোল্লার উপর যা নিয়ে যুযুধান হয়ে উঠেছিল বাংলা ও ওড়িশা। তবে ওড়িশার এই লাল পিঁপড়ের চাটনির ডেলিকেসির উপর ভাগ বসাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেনি অন্য কোনও রাজ্য। এবার গোটা খ্যাতি পকেটস্থ করেছে ওড়িশা একাই। শোনা যায়, এই খাবার যে শুধুই সুস্বাদু, তা-ই নয়। একই সঙ্গে নাকি অজস্র ঔষধী গুণ এই বিশেষ রকমের পিঁপড়ের চাটনির।

খিদের বালাই এমনই, যে একসময় গাছপালা থেকে পিঁপড়ে, পিঁপড়ের ডিম ধরে ধরে খেতে বাধ্য হতেন আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া সমাজের মানুষজন। সেই পিঁপড়েই আজ যাকে বলে ডেলিকেসি। সম্প্রতি জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন অর্থাৎ জিআই ট্যাগ পেয়েছে ওড়িশার বিখ্যাত সেই লাল পিঁপড়ের চাটনি। পিঁপড়ের চাটনি শুনে অবশ্য চোখ কপালে তুলবেন অনেকেই। যে পিঁপড়ের কামড় খেলে ত্রিভুবন অন্ধকার, সেই পিঁপড়ে খাবারের পাতে! হ্যাঁ, ব্যাপারটি অবাক করার মতো হলেও দীর্ঘদিন ধরেই আদিবাসী পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষেরা এই খাবার খেয়ে জীবননির্বাহ করে এসেছেন।

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় কাই চাটনি নামে পরিচিত এই খাবারটি। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার খাবার এই চাটনি। দেশের অন্য এলাকার বাসিন্দারা যতই নাক শিঁটকাক না কেন, ময়ূরভঞ্জের বাসিন্দাদের কাছে এই চাটনির জবাব নেই। সিমলিপাল এলাকাতে একে বলা হয় সিমলিপাল কাই চাটনি। না, পিঁপড়ে দেখলেন আর ধরে চাটনি বানিয়ে ফেললেন, ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও এমন নয়। কাই পিম্পুদি নামে এক বিশেষ ধরনের পিঁপড়ে পাওয়া যায় এসব অঞ্চলে। বাংলায় অনেকে বলেন লাল তাঁত পিঁপড়ে। সেই বিশেষ ধরনের পিঁপড়ে দিয়েই তৈরি হয় এই চাটনি।

আরও পড়ুন: দুটি পদই দেওয়া হয় শেষ পাতে, জানেন আসলে কী তফাৎ ‘চাটনি’ এবং ‘অম্বল’-এর

স্বাদের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টি একেবারে বিনামূল্যে। বিকল্প খাবারের খোঁজ কিন্তু আজকের পৃথিবীতে কোনও নতুন বিষয় নয়। চিন, জাপানের মতো বহু দেশেই বিভিন্ন রকম পোকামকড় খাওয়ার চল রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মাংসজাত প্রোটিনের বিকল্প খুঁজে বের করাটাই এই উদ্যোগের মূল কথা। বিশেষজ্ঞেরা এই লাল পিঁপড়েগুলি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এতে প্রচুর পরিমাণ জরুরি প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-১২, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, তামা ও অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে। অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া আদিবাসী মানুষজন, যাঁরা মূলধারার খাবারদাবারের তেমন নাগাল পেতেন না, তাঁদের ভরসা বলতে ছিল ওই পিঁপড়ে থেকে পাওয়া পুষ্টিটুকুই। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা 'অরণ্যের অধিকার' থেকে শুরু করে বহু আদিবাসীকেন্দ্রীক সাহিত্যে এমন খাবারদাবারের উল্লেখ আমরা পেয়েছি। পড়ে অবাকও হয়েছি। কিন্ত সেই পিঁপড়ের ডিমের তৈরি চাটনিই আজ মাথা উঁচু করল ওড়িশার।

ময়ূরভঞ্জে মেলা ওই পিঁপড়ের বৈজ্ঞানিক নাম ওইসোফিল্লা সামারাগডিমা। গোটা বছরই এই পিঁপড়ে ময়ূরভঞ্জ এলাকায় দেখা যায়। গাছের পাতা দিয়ে তৈরি বাসায় খোঁজ মেলে এই বিশেষ প্রজাতির পিঁপড়ের। সেখান থেকেই পিঁপড়ে সংগ্রহ করে আনেন আদিবাসীরা। এর পর জলের মধ্যে গাছের পাতায় লেগে থাকা ওই পিঁপড়েগুলিকে ডুবিয়ে রাখা হয়। এর পর লার্ভা ও ডিম আলাদা করা হয়। রসুন, নুন, লঙ্কা, আদার মতো হরেক রকম মশলার সঙ্গে সেগুলি বেটে তৈরি করা হয় কাই চাটনি। ওড়িশা ছাড়াও ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডের বেশ কিছু অঞ্চলেও এই চাটনি খাওয়ার চল রয়েছে।

এই চাটনির জন্য বেশ কিছুদিন আগেই ময়ূরভঞ্জের আয়ুশমন্ত্রকের কাছে আবেদন জমা করেছিলেন বাসিন্দারা। সহজ নয় এই পিঁপড়ে সংগ্রহের কাজ। এই পিঁপড়ে তেমন ভয়াবহ বিষাক্ত না হলে এর কামড় বেশ জ্বালাদায়ী। সেই সব ঝঞ্ঝাট সহ্য করেই রোদে পুড়ে জলে ভিজে পিঁপড়ের সংগ্রহের কাজ করেন বহু আদিবাসী পরিবার। এটাই রুজিরুটি। কিন্তু স্থানীয় স্তরে দাম থাকলেও বৃহত্তর ক্ষেত্রে তেমন দাম নেই এই চাটনির। ফলে ব্যবসায়িক ভাবে তেমন কিছু আশার মুখ দেখতে পান না আদিবাসী মানুষগুলো।

করোনা কালে হঠাৎই রটে গিয়েছিল এই পিঁপড়ের চাটনি নাকি ভ্যাকসিনের চেয়েও বেশি কার্যকর। নয়নধর পাধিওয়াল নামে ওড়িশার এক ইঞ্জিনিয়ার গবেষক নাকি এমন দাবি করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থও হয়েছিলেন। আবেদনকারী বিস্তারিত ভাবে এই কাই চাটনির খাদ্যগুণের কথা আদালতে জানিয়েছিলেন। তবে আদালতের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে তাঁর দাবি। তা কোভিড সারুক ছাই না সারুক, এই পিঁপড়ের চাটনিতে জ্বর, সর্দি-কাশি সারানোর মতো বহু ভেষজ গুণই যে রয়েছে এই চাটনিতে, তা কিন্তু স্থানীয়রা অনেকেই মানেন।

তবে শুধু ওড়িশার ময়ুরভঞ্জ জেলাই নয়, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগঢ়, অন্ধ্রপ্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর , ত্রিপুরা, মেঘালয়, এমনকী বাংলার অনেক আদিবাসী-উপজাতিদের মধ্যেই এই চাটনি খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এ রাজ্যের পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার বিভিন্ন প্রান্তেও আদিবাসীরা এই ঝাল ঝাল চাটনি বানান ও বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে খেয়ে থাকেন। সাধারণ ভাবে পিঁপড়ে গাছ থেকে পেড়ে আনার পর পরিষ্কার করে বেটে মশলা মিশিয়ে তৈরি হয় এই কাই চাটনি। বহু জায়গায় আবার এই লাল পিঁপড়েকে জলে ফুটিয়ে আদা, রসুন ও লঙ্কা-সহযোগে স্যুপের আকারেও খাওয়া হয়। সেটা নাকি আবার দারুণ জ্বর-সর্দির ওষুধও। এই চাটনি মূলত আদিবাসী খাবার হলেও জিআই ট্যাগ পাওয়ার আগেই তা পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের দরবারে। বিখ্যাত ব্রিটিশ শেফ গর্ডন ব়্যামসে এই পিঁপড়ের চাটনি খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি নাকি একে দুনিয়ার সেরা চাটনি বলেও আখ্যা দেন।

আরও পড়ুন:তরকারি থেকে চাটনি, টমেটো ছাড়া ফ্যাকাসে লাগে স্বাদ, জানেন এর বাংলা প্রতিশব্দ?

এবার জিআই ট্যাগ পাওয়ার পরে আরও বেশি মাত্রায় বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেল বিশেষ এই কাই চাটনির নাম। এককালে অভাবের সংসারের পুষ্টির বিকল্প ঠিকানা ছিল যে পিঁপড়ের চাটনি, সেই খাবার কি আদৌ ব্যবসায়িক লাভের মুখ দেখাবে ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ এলাকার বাসিন্দাদের। ভবিষ্যতে যাতে আর পিঁপড়ের ডিম খেয়ে দিন যাপন করতে না হয়, সেই নিশ্চয়তা কি দেবে সাম্প্রতিক এই জিআই তকমা! সেটা কিন্তু লাখ টাকার প্রশ্ন!

 

More Articles