‘মঙ্গলে বাসা বাঁধব’, লোভের পাপ, পাপের পরিণাম…

মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেই কসমো-স্কাইমেড সেকেন্ড জেনারেশন এফএম২ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করল এলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্স। গত ১৮ই জানুয়ারি স্পেসএক্স ফ্যালকন নাইন রকেট ৪৯ টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করেছে। তারও ঠিক তিন মাস আগে, ২০২১ সালে অক্টোবর মাসের শেষে শুরু হয়েছিলো গ্লাসগো সামিট বা কপ২৬ । কপ২৬-তে অংশ গ্রহণ করেছিল ১৯৭ টি দেশ, বিশ্বের ১২০ জন তাবড় নেতা। কতগুলো লক্ষ্য ছিল গ্লাসগো সামিটের। প্রথমত, পৃথিবীর মোট তাপমাত্রা কিছুতেই আরও ১.৫ ডিগ্রির বেশি বাড়তে না দেওয়া। দ্বিতীয়ত, দেশের ধনীদেশগুলি জলবায়ু দূষণের প্রভাব কমানোর উদ্দ্যেশ্যে দরিদ্র দেশগুলিকে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়ে সাহায্য করবে (এই প্রতিশ্রুতি ২০০৯  সালেই সিওপি১৫ কোপেনহেগেন সামিটে দেওয়া হয়)। তৃতীয়ত, নেট জি়রো লক্ষ্যে পৌঁছনো - যা প্যারিস চুক্তিতেই বলা হয়েছিল। নেট জি়রো হল বায়ুমন্ডলে যে পরিমাণ গ্রিন হাউস গ্যাস, বিশেষত কার্বন ডাই-অক্সাইড আমরা ছাড়ি, সেই পরিমাণ গ্রিণ হাউস গ্যাস বায়ুমন্ডল থেকে আবার ফিরিয়ে নেওয়া।

কপ২৬ তাদের স্থির করা অধিকাংশ লক্ষ্যেই পৌঁছতে পারবে না। যে সমস্ত দেশগুলি মূলত কার্বন সহ অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস উৎপাদনের জন্যে দায়ী, তারা দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, কপ২৬ বৈঠকের পরেও।  প্যারিস চুক্তির পরেও পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা আরও ১.৫ ডিগ্রির বেশিই বেড়েছে, আর তার জন্যে পৃথিবীর ধনী দেশগুলির অর্থনীতিই দায়ী। পরিবেশবিদদের মতে, কপ২৬-এ নেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি মেনে চললেও ২০৩০ নাগাদ পৃথিবীর সামগ্রিক তাপমাত্রা আরও ১.৮ থেকে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বাড়বে। অন্যদিকে পৃথিবীর ধনীতম দেশগুলি কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্দ্যেশ্যে গরিব দেশগুলিকে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ দিয়ে উঠতে পারেনি। এই নিয়ে কথা কিন্তু কপ২৬ এর অনেক আগেই শুরু হয়েছিল।

কিন্তু এত কপ২৬ নিয়ে এত কাটাছেঁড়ার মাঝেও একটি বিষয় নিয়ে উচ্চবাচ্য শোনা গেল না  - আর তা হল এলন মাস্ক, জেফ বেজোসদের মতো অপেশাদার মহাকাশযাত্রীদের মহাকাশে বিলাসযাত্রা আর তার কারণে কী পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড সমেত অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হয়ে বায়ুদূষণ ঘটায় তার হিসেবনিকেশ।

আরও পড়ুন-উত্তরপ্রদেশ কী করে মেরুকরণ রাজনীতির সূতিকাগার হলো?

রকেট উৎক্ষেপণ মহাকাশের অসংখ্য অজানা তথ্য সম্পর্কে গবেষণা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। কিন্তু যে ভাবে কোটিপতিদের মহাকাশে বিলাসযাত্রার বহর আমরা দেখছি, তা কিন্তু মহাকাশ বিষয়ে গবেষণায় কোনো অবদান রাখে না। বরং এই যাত্রার বহর দেখে প্রমাদ গুণতে হয়, মনে হয়, পৃথিবীর জলবায়ু, বাতাস, মাটি, সম্পদকে নিধন করে শান্তি হয়নি; এবার দরকার মহাকাশযাত্রা, মঙ্গলযাত্রা - এবার দরকার মহাকাশে দূষণ বাড়ানো, স্পেস জাঙ্কের পরিমাণ বাড়ানো - আর বিলাসযাত্রার আগে পৃথিবীতে বেশ খানিকটা বিষবাষ্প উগরে দিয়ে অর্থের আস্ফালন দেখানো।

রকেট থেকে নির্গত গ্যাস, ওজো়ন লেয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটি অন্যতম কারণ। স্পেসএক্সে রকেট উৎক্ষেপণের সময় ব্যবহার করে আরপি-ওয়ান, যা কেরোসিনের মতই কাজ করে। স্পেসএক্স ফ্যালকন নাইন উৎক্ষেপণের সময় যা নির্গত করে, তা রীতিমত কালো কার্বনের কণা, যা সরাসরি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে গিয়ে মেশে। অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ইনজিনিয়ারিং রিসার্চের গবেষক জেসিকা ড্যালাসের মতে, এই কার্বন কণাগুলো বাতাসে দীর্ঘদিন থাকে। আর মূলত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারেই এরা ভাসমান অবস্থায় থাকে।

স্পেসএক্সের মালিক ইলন মাস্ক খুব শীঘ্রই মঙ্গলে পর্যটকদের নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, মঙ্গলে বাড়ি বানানোর পরিকল্পনাও রয়েছে অদূর ভবিষ্যতে। স্পেসএক্স ফ্যালকন নাইনের সাথে পাল্লা দিয়ে কখনও ছুটেছে ভার্জিন গ্যালাকটিক, কখনও বা বেজো়সের সংস্থা ব্ল্যু অরিজিনের উৎক্ষিপ্ত রকেট।  কেবল মঙ্গলেই নয়, চাঁদেও পড়েছে  স্পেসএক্স আর ব্ল্যু অরিজিন এদের দু'জনেরই নজর।

রকেটের জ্বালানি হিসেবে  বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার হয়।  প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান সাংবাদিক টেরেজা পুল্টারোভার মতে, তার অধিকাংশই কোনো সংস্থার গোপন তথ্য হিসেবেই থেকে যায়। মার্কিন এরোস্পেস কর্পোরেশনের এক বিশেষজ্ঞ মার্টিন রস - যিনি বায়ুমন্ডলের উপর রকেট উৎক্ষেপণের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন - তাঁর কথায় আভাস পাওয়া গেছে যে সমস্ত গ্যাস উদগীরণ হচ্ছে কেবল রকেট উৎক্ষেপণের সময় বাতাসের তাপমাত্রা কত বাড়ে, কী ধরনের গ্যাস উদগীরণ হয়, বাতাসে তাদের তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী ফলাফল কী কী, তা নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট গবেষণা এখনও দরকার।

মার্টিন রস জানাচ্ছেন, গবেষকরা রকেট থেকে উৎক্ষিপ্ত কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ নিয়ে এখনও চিন্তিত নয়; কারণ শিল্পক্ষেত্র, যানবাহন এবং মানুষের কারণে তৈরি হওয়া কার্বন ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমানের তুলনায় রকেট থেকে নির্গত বিষবাষ্পের পরিমাণ নগণ্য। কারণ, এযাবৎ খুব বেশি রকেট উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু যে পরিমাণে এর হার বাড়ছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে কী হতে পারে সেই নিয়েই আশঙ্কিত বিজ্ঞানীরা। নর্থার্ন স্কাই রিসার্চের  বিশিষ্ট গবেষক ড্যালাস কাসাবোস্কির মতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৬০ টি রকেট মহাকাশে পাড়ি দেবে। ড্যালাস কাসাবস্কির মতে, ভার্জিন গ্যালাক্টিকের এক-একটি দেড় ঘন্টার স্পেস ট্যুরিজ়ম উড়ানে যে পরিমাণ দূষণ হয়, তা দশ ঘন্টার ট্রান্স- আটলান্টিক উড়ানে যে দূষণ হয়, তার সমান।

মার্টিন রসের কথায়, কেবল জ্বালানির ধরণই নয়, রকেটের ইনজিনের গঠনের ওপরেও নির্ভর করে দূষণের পরিমাণ কতটা হবে। যদিও স্পেসএক্সের বেশ কিছু রকেটে জ্বালানী হিসেবে মিথেন ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্ল্যু অরিজিনও লিকুইড অক্সিনের এবং লিকুইড হাইড্রোজেন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে। জ্বালানি হিসেবে এরা নিঃন্দেহে পরিবেশ-বান্ধব। কিন্তু মজার বিষয় এই অক্সিজেনকে তরলে পরিণত করতে এবং কম্প্রেস করতে যথেষ্ঠ শক্তির প্রয়োজন হয়। আর যদি না তা পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতিতে করা হয়ে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হবে।

কপ২৬-এর ঠিক আগে পরিবেশ এবং রাজনৈতিক কর্মী জর্জ মনবায়োট লিখেছিলেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে দিতে না চাইলে ব্যক্তি পিছু গড় কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কোনো মতেই যেন বছরে দুই টনের বেশি না হয়। মজার বিষয় হল, পৃথিবীর ১ শতাংশ ধনীতম ব্যক্তি মাথাপিছু বছরে ৭,৫০০ টনের বেশী কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেন। নাসার ক্লাইমেট সায়েন্টিস্ট পিটার ক্যালমাসের মতে, ভার্জিন গ্যালাক্টিকের বিলাসযাত্রা ছিলো সাময়িক, রকেটটি পৌঁছেছিল মাত্র ৫৩ মাইল উচ্চতায়, কিন্তু যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়েছে, প্রতি যাত্রী পিছু (মোট ছয় জন যাত্রী ছিলেন), তা সাধারণ বিমান উড়ানের থেকে ছয়গুণ বেশি।

এই ভাবে মহাজগতে ভ্রমণ বা রকেট উৎক্ষেপণ যদি ১০০০ বার হয়, তাতে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে, তাতে আন্টার্কটিকার তাপমাত্রা আরও এক ডিগ্রি বৃদ্ধি পাবে। ১৯৯০ এর পর থেকে আন্টার্কটিকায় কিন্তু ইতিমধ্যেই চার ট্রিলিয়ন মেট্রিক টন বরফ গলে গিয়েছে। অন্যদিকে এই বরফের গলনের কারণে পোলার ভর্টেক্সের মত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ফলস্বরূপ পৃথিবীর যে সমস্ত জায়গায় বরফ পড়ার কথা নয়, সেখানেও বরফ পড়ছে।

আমরা প্রতিবেদনের শুরুতে বলেছিলাম, বিশ্বের ধনীতম দেশগুলি গরিব দেশগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মোকাবিলা করার জন্যে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য করবে, যা আদতেও তারা করে উঠতে পারেনি প্যারিস চুক্তির এতদিন পরেও। মনে পড়ে গেল, এই মহামারীর সময়তেই জেফ বেজো়স প্রতি সেকেন্ডে ২,৫৩৭ ডলার অর্থ পকেটে পুরেছেন। বার্নি স্যান্ডার্স যে আয়কে বলেছেন, মরালি অবসিন বা নীতিগত ভাবে অশ্লীল।

কপ২৬-এর অঢেল কোলাহলের মাঝেও কোটিপতিদের তৈরি লাক্সারি পলিউশন ক্ষতির খতিয়ান স্রেফ মাটি চাপা পড়ে গেল। মহাকাশ বিষয়ে জানা এবং স্যাটেলাইট স্থাপনের জন্যে, রকেট উৎক্ষেপণ প্রয়োজন; কিন্তু মহাকাশে বিলাসযাত্রা কি জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন পর্যায়ে জরুরি নাকি! যেখানে খাদ্যসুরক্ষা নেই, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নেই, প্রকৃতি ক্রমেই ভয়াল রূপ ধারণ করেছে, দারিদ্র বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, সেখানে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর শরীরে খানিকটা বিষ-বমি করে দিয়ে মহাকাশের পানে বিলাসযাত্রা অশ্লীল লাগে না?

More Articles

;