গাজা থেকে বিশ্ব কূটনীতি: ট্রাম্পের 'বোর্ড অফ পিস' ঘিরে বিতর্ক
Board Of Peace: প্রাথমিকভাবে এই বোর্ডের লক্ষ্য গাজা অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর গড়ে ওঠা যুদ্ধবিরতিকে টিকিয়ে রাখা হলেও, ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী এর ভূমিকা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নানা সংকট ও সংঘাত সমাধানেও এই বোর্ড হস্তক্ষেপ করতে পারে।
ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চ থেকে ২২ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ, ‘Board of Peace’। প্রাথমিকভাবে এই বোর্ডের লক্ষ্য গাজা অঞ্চলে দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর গড়ে ওঠা যুদ্ধবিরতিকে টিকিয়ে রাখা হলেও, ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী এর ভূমিকা কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক নানা সংকট ও সংঘাত সমাধানেও এই বোর্ড হস্তক্ষেপ করতে পারে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরই আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও উদ্বেগ।
ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বোর্ড সম্পূর্ণভাবে গঠিত হয়ে গেলে "যা খুশি করার ক্ষমতা" তাঁর থাকবে, যদিও তা জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই হবে। এই মন্তব্যই নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, তাহলে কি বিশ্ব কূটনীতির প্রধান মঞ্চ হিসেবে জাতিসংঘের ভূমিকা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে এসেছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি, শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েন ও সংঘাত নিরসনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের ‘Board of Peace’ উদ্যোগকে ঘিরে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, এতে বিশ্ব কূটনীতির মূল মঞ্চ হিসেবে জাতিসংঘের ভূমিকা দুর্বল হতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata International Book Fair 2026: ওপার বাংলার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্ভার নিয়ে যে ‘বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন’ গড়ে উঠত, তা ছিল মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু ২০২৫ সালের পর ২০২৬, টানা দু'বছর কলকাতার বইপ্রেমিকরা বঞ্চিত হতে চলেছেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে।
সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী এ প্রসঙ্গে ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন, “ট্রাম্পের এই উদ্যোগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। এটা খুবই বিপজ্জনক বিষয়। বোর্ড অফ পিস অর্থের বিনিময়ে সদস্যপদ দেওয়ার একটা ক্লাব, যার লক্ষ্য জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে আন্তর্জাতিক শাসনের নতুন কাঠামো দাঁড় করানো।” ট্রাম্প জানিয়েছেন, বোর্ডের স্থায়ী সদস্যদের প্রত্যেককে ১ বিলিয়ন ডলার করে অর্থ সহায়তা দিতে হবে। সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর বক্তব্য, "অর্থ দিয়ে বোর্ডের সদস্য হওয়ার পরও যে ট্রাম্প কাউকে বাদ দেবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।"
এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হবেন ট্রাম্প নিজেই। এই নিয়ে সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ী বলেন, “এখানে তিনিই কার্যত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সদস্য নির্বাচন, সদস্য বরখাস্ত, বোর্ড কখন বসবে, আলোচনার বিষয় সব ট্রাম্পই ঠিক করবেন। অন্যান্য সদস্যদের অবস্থান অনিশ্চিত।”
গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। ইজরায়েল ও হামাস একে অপরের বিরুদ্ধে একাধিকবার চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। মানবিক সাহায্য প্রবেশ, বন্দি বিনিময় এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এই অবস্থায় ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ‘Board of Peace’ মাঠে নেমে এগুলির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন এবং ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো কঠিন প্রশ্নে বোর্ড কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বরং এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি হাতিয়ার বলেও অনেকে মনে করছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
America's youth: আগে মধ্যবিত্ত হওয়া মানে ছিল নির্দিষ্ট একটি আয়ের সীমার মধ্যে থাকা এবং কেবল একজন উপার্জনকারীর আয়েই নিজের বাড়ি, গাড়ি ও ভবিষ্যতের সঞ্চয় নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি কেবল আয়ের অঙ্ক নয়, বরং “আর্থিক স্থিতিশীলতা” অর্জনের এক কঠিন লড়াই।
বিশ্বের বড় শক্তিধর দেশগুলি ও আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী পশ্চিমী মিত্ররা বিষয়টি নিয়ে এখনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এই বোর্ডে এখনও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অন্যান্য স্থায়ী সদস্য— চিন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেন যোগ দেয়নি। ফ্রান্স সরাসরি যোগ দিতে অস্বীকার করেছে। ব্রিটেন জানিয়েছে, আপাতত তারা এই বোর্ডে যোগ দিচ্ছে না। চিনও এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান নেয়নি। "এই কারণেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না", ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সৌরীশ ঘোষ। তিনি আরও বলেন, "ইজরায়েল গাজায় মৃত্যু প্লাবন নিয়ে এসেছে, সেই দেশরই তো উপস্থিতি নেই, শান্তি চুক্তি হবে কী ভাবে?"
উল্লেখযোগ্যভাবে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব ও কাতার ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার মতো কয়েকটি উদীয়মান দেশ এই বোর্ডে যোগ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সৌরীশ ঘোষের মতে, "মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি আব্রাহাম চুক্তি (২০২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইজরায়েল এবং বেশ কয়েকটি আরব মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি)-র জন্য ট্রাম্পের শান্তি বোর্ডে যুক্ত হওয়ার সম্মতি জানিয়েছে। সারা পৃথিবী জুড়ে আমেরিকার পেট্রোডলারের খেলা শুরু হয়েছিল এই মধ্যপ্রাচ্য থেকেই। সৌদি আরব, কুয়েতের মতো দেশগুলি বরাবর আমেরিকার সঙ্গে ছিল; তাই এরা আমেরিকার যে কোনো বক্তব্যকেই সমর্থন জানাবে তার দ্বিমত নেই। কিন্তু ইজরায়েল যুক্ত না হলে, বা ভারত-চিন-রাশিয়ার মতো দেশগুলি এই উদ্যোগে এগিয়ে না এলে আদৌ এটা শান্তি প্রতিষ্ঠার দিকে এগোবে বলে মনে হয় না।"
কিন্তু সত্যিই কি ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় যুদ্ধবিরতি বা বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এই বোর্ড অফ পিস গঠন করতে চাইছেন? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সৌরীশ ঘোষ বলেন, "আমেরিকা সত্যিই গাজায় শান্তি চাইলে ইজরায়েল কালকেই যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারে, এত আলোচনার প্রয়োজনই নেই। দিনের পর দিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যখন এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আমেরিকা তার বিরোধিতা করেছে। গাজায় ইজরায়েলের হত্যালীলায় সমর্থন জানিয়ে গেছে আমেরিকা। এখন এই নাটকের কোনো মানেই হয় না। ভেনেজুয়েলার তেল দখল, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদের দিকে নজর, বিশ্বজুড়ে ট্যারিফ বৃদ্ধি— এগুলো ট্রাম্প করছেন কারণ তিনি ভয় পাচ্ছেন, তাঁর মনে হচ্ছে তিনি রাশিয়া-চিনের কাছে পিছিয়ে পড়ছেন।"
সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ীর মতে, "বোর্ড অফ পিস গঠনের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত করতে চাইছেন। যেখানে গাজার মানুষের কোনো অধিকার থাকবে না, মার্কিন ঘনিষ্ঠ শক্তি গাজাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।"
ট্রাম্প বরাবরই বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সন্দিহান। ন্যাটো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা জাতিসংঘ— সব ক্ষেত্রেই তিনি আগেও সমালোচনামুখর ছিলেন। ‘Board of Peace’ সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। এই বোর্ড যদি ভবিষ্যতে অন্যান্য অঞ্চলের সংঘাতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করে, তবে বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে বদলে যেতে পারে। শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে এটি যদি প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘Board of Peace’ আপাতত গাজা যুদ্ধবিরতির এক নতুন পরীক্ষাগার। কিন্তু এই উদ্যোগ সত্যিই বিশ্বশান্তির পথ দেখাবে, নাকি জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে একটি নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি করবে, তার উত্তর দেবে সময়ই।







