কলকাতা বইমেলায় নেই বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন: কূটনীতির ছায়ায় ভাঙল দুই বাংলার সাহিত্য সেতু?
Kolkata International Book Fair 2026: ওপার বাংলার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্ভার নিয়ে যে ‘বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন’ গড়ে উঠত, তা ছিল মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু ২০২৫ সালের পর ২০২৬, টানা দু'বছর কলকাতার বইপ্রেমিকরা বঞ্চিত হতে চলেছেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে।
কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় এবারও থাকবে না বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। বইমেলা চত্বরে পাঠককূলের হাতে হাতে ঘুরবে না হুমায়ূন আহমেদ, সাদাত হোসাইন।
‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড’-এর সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, বিদেশ মন্ত্রকের (MEA) বা ভারত সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ ছাড়া বাংলাদেশের কোনো প্রকাশককে আসন্ন ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় স্টল দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন,
বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে, মেলার নিরাপত্তা ও পবিত্রতা বজায় রাখতেই আমরা সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু সেই ছাড়পত্র না মেলায় আমরা অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, এ বছরও বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন থাকছে না।
গিল্ডের এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই কার্যত সিলমোহর পড়ে গেল আশঙ্কায়। পর পর দুবার বাংলাদেশ ভারতে বইমেলায় জায়গা পেল না।
পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৬ সাল থেকে কলকাতা বইমেলায় বাংলাদেশ ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর রকমারি বই, লিটল ম্যাগাজিন আর ওপার বাংলার বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্ভার নিয়ে যে ‘বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন’ গড়ে উঠত, তা ছিল মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু ২০২৫ সালের পর ২০২৬, টানা দু'বছর কলকাতার বইপ্রেমিকরা বঞ্চিত হতে চলেছেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদল এবং অস্থিরতার কারণে শেষ মুহূর্তে তাদের অংশগ্রহণ বাতিল হয়েছিল। আর এবারও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
NPA Bangladesh: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এনপিএ তাঁদের ১০১ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তিনজনকে মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে— ফেরদৌস আরা রুমি, মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং নাজিফা জান্নাত।
দুটো দেশের সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে সাম্প্রতিককালে, বা কূটনৈতিক যে টানাপোড়েন চলছে, সেটাই যে এর নেপথ্যে মূল কারণ তা তো বলা বাহুল্যই। এই বিষয়ে দে'জ পাবলিশিংয়ের কর্ণধার শুভঙ্কর দে তথা অপু দে ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন,
দুই দেশের রাজনৈতিক অবস্থা যা, তাতে এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা চাই তারা অংশ নিক, কিন্তু আমাদের হাতে কিছু নেই। বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থা, যারা অংশ নিতে চেয়েছিলেন, তাদের বলা হয়েছিল, বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কিন্তু তারপর তারা আর আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।
২০২৪-এর অগাস্টে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কের সমীকরণ অনেকটাই বদলেছে। বিশেষ করে, বিগত কয়েক মাসে দু’দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক শীতলতা ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব এসে পড়েছে সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের এই আদান-প্রদানে।
‘দ্য হিন্দু’ (The Hindu) এবং ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর (Business Standard) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গিল্ড বারবারই নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। ত্রিদিব বাবু স্পষ্টই বলেছেন,
যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো ঝুঁকি নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কে দায়িত্ব নেবে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Khaleda Zia’s Funeral: এই জানাজায় যারা যোগ দিয়েছিলেন তারা সকলেই বিএনপি কর্মী ছিলেন না। কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্তিম বিদায়ে এমন ছবি এই উপমহাদেশে খুব কমই তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ, বিষয়টি আর কেবল সাহিত্যের আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই, তা পুরোদস্তুর ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে পড়েছে।
কিন্তু এই ঘটনায় সম্পর্ক কি আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে? এই প্রশ্নটাই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। কারণ, বইমেলা তো কেবল বই কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলাও বটে। শিল্প-সাহিত্যই তো কাঁটাতারের বেড়া ভাঙার জায়গা, মেলবন্ধনের সেতু, ক্ষত জুড়ে দেওয়ার স্থান। অতীতেও যখন রাজনৈতিক কারণে দুই বাংলার মধ্যে সম্পর্ক টালমাটাল, তখনও গান, কবিতা আর নাটকই দুই পারের মানুষের মনকে জুড়ে রেখেছে। অথচ, বইমেলায় এই অনুপস্থিতি সেই সাংস্কৃতিক প্রবাহেই যেন এক বড়সড় বাঁধ তৈরি করল।
সেই জায়গাটা কি আমরা করতে পারছি না? কেন এটা বন্ধ থাকছে? এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউস থেকে সল্টলেকের করুণাময়ী প্রাঙ্গণ পর্যন্ত। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের সংস্থাগুলোর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে স্টল পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন, অন্তত প্রকাশকদের উদ্যোগে সাহিত্যের এই ধারাটি বজায় থাকুক। গিল্ড কর্তৃপক্ষও জানিয়েছেন, তারা নীতিগতভাবে বাংলাদেশের বই বিক্রির বিরোধী নন, কিন্তু সরকারি ছাড়পত্র ছাড়া তারা অফিশিয়াল স্টল বরাদ্দ করতে অক্ষম। এমনকি, ভারতীয় স্টলগুলোতে বাংলাদেশের বই রাখার ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি নেই বলেও জানানো হয়েছে, কিন্তু তাতে কি আর সেই ‘বাংলাদেশ চত্বর’-এর আমেজ ফিরে পাওয়া সম্ভব?
কি বলছেন সকলে? সাহিত্যপ্রেমী এবং বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তার জেরে বইয়ের আদান-প্রদান বন্ধ হয়ে যাওয়াটা আসলে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপরই আঘাত। এ বছর বইমেলায় ‘থিম কান্ট্রি’ হিসেবে থাকছে সুদূর আর্জেন্টিনা। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ে মাতামাতি হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু একেবারে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, যাদের সঙ্গে ভাষা ও নাড়ির টান, তাদের অনুপস্থিতি অনেককেই ভাবাচ্ছে।
'প্রতিক্ষণে'র প্রধান সম্পাদক শুদ্ধব্রত দেব ইনস্ক্রিপ্টকে বলেন,
এর পেছনে রয়েছে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ। আশা করছি, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে। দুই দেশের পাঠকই এতে খুশি হবে।
এই অচলাবস্থা কি শুধু কূটনৈতিক কারণে, নাকি এর গভীরে রয়েছে আরও বড় কোনো ক্ষত? ভবিষ্যতে কি এই মেঘ কাটবে? কারণ, বাংলা বইয়ের বাজার তো কেবল পশ্চিমবঙ্গটুকু নয়, বাংলাদেশ তার এক বিশাল অংশীদার। ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি, যে মেধা ও মননের আদান-প্রদান এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে, তার ক্ষতিপূরণ কী দিয়ে হবে?
বেনাপোল-পেটরাপোলের কাঁটাতার এবার কি পাকাপাকিভাবে সাহিত্যের আঙিনাতেও দেওয়াল তুলে দিল? বইমেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে এখন সেই প্রশ্নই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কূটনৈতিক বরফ কবে গলবে তা সময় বলবে, কিন্তু ততদিন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের এই যূথবদ্ধ উদ্যাপনে যে বড় ছেদ পড়ল, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।






