দশ টাকার নোট, সিগারেটের প্যাকেট || গরু পাচারের কোড ল্যাঙ্গুয়েজ জানলে চোখ কপালে উঠবে
Cow Smuggling in Bengal: বীরভূমের ইলামবাজার থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের একাধিক সীমান্তবর্তী গ্রাম, একটি নির্দিষ্ট রুটের মাধ্যমে চলতো এই রমরমা ব্যবসা।

পশ্চিমবঙ্গের গরু পাচার মামলায় ইতিমধ্যেই হাজতবাসের নির্দেশ পেয়েছেন তৃণমূলের বীরভূম জেলা সভাপতি, অনুব্রত মণ্ডল। সিবিআই হেফাজত থেকে এবার তার ঠাঁই হয়েছে আসানসোলের বিশেষ সংশোধনাগারে। মামলার শুনানির সময় সিবিআই আইনজীবী আদালতে বলেছিলেন, "এটা কোন একটা সিঙ্গেল ম্যান বিজনেস নয় বরং এটি একটি চেইন।" তদন্তে নেমে পশ্চিমবঙ্গের এই গরু পাচার মামলা নিয়ে আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিবিআই। তাদের হাতে আছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। সিবিআই গোয়েন্দাদের নজরে উঠে এসেছে বীরভূমের একাধিক পশুহাট। তাদের সন্দেহ, এই পশু হাটের আড়ালেই চলতো গরু পাচারের রমরমা ব্যবসা।
বীরভূমের ইলামবাজার থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদের একাধিক সীমান্তবর্তী গ্রাম, একটি নির্দিষ্ট রুটের মাধ্যমে চলতো এই রমরমা ব্যবসা। ইতিমধ্যেই গরু পাচারের অবৈধ বেঙ্গল করিডোরের কথা উঠে আসছে। আর এই করিডোর এর মধ্যে অন্যতম জেলা হয়ে উঠেছে মুর্শিদাবাদ। ভাগীরথী নদীতে একাধিক অবৈধ পাচারের ঘাট রয়েছে এবং সেখানেই একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে গরুগুলির চোরাপাচার করা হতো বলে মনে করছে সিবিআই। কিন্তু কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো এই চোরা চালানোর জন্য? সূত্রের খবর, এই চালানোর জন্য ব্যবহার বিশেষ এক ধরনের ৫ টাকার নোট এবং কিছু বিশেষ সিগারেটের প্যাকেট
নোটের মাধ্যমে গরু পাচার?
ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু একটি নির্দিষ্ট পথে পাচার করা হতো বলে জানতে পেরেছে সিবিআই। আর এই পথের অন্যতম নোডাল পয়েন্ট হিসেবে উঠে এসেছে বীরভূম এবং মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু জায়গার নাম। সিবিআই তদন্তে উঠে এসেছে, এই সমস্ত সীমান্ত থেকে গরু পাচার করার জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করত চোরা কারবারিরা। একটি পাঁচ টাকার নোটে পাচার সংক্রান্ত তথ্য লিখে রাখা হতো। স্থানীয় সূত্র মার পথে এমনই কিছু তথ্য উঠে এসেছে সিবিআই এর হাতে। প্রতিটি গরুর জন্য পাচারকারীরা আলাদা করে ৫ টাকার নোট তৈরি করতেন এবং তারা পেতেন প্রতি গরু পিছু এক হাজার টাকা করে। রীতিমতো জমির ফসল নষ্ট করে চলতো গরু পাচার। আর এই পাচারকারীদের ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতেন গ্রামবাসীরা। তবে এখন সিবিআই এর তৎপরতা বাড়ার পর থেকেই বন্ধ হয়েছে গরু পাচার।
এই বিশেষ ৫ টাকার নোট ব্যবহার করে গরু পাচার করা হতো মুর্শিদাবাদ জেলার বেশ কিছু সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে। আর যে গরু পাচার চক্র কাজ করতো তা মূলত নিয়ন্ত্রণ করা হতো বীরভূম থেকে। গরু পাচারের করিডোর হিসেবে ব্যবহার করা হতো মুর্শিদাবাদকে। মুর্শিদাবাদের পাইকর করিডোর ছিল সবথেকে বড় করিডর। সূত্রের খবর, মুর্শিদাবাদের হাট এবং বীরভূমের হাট থেকে আসা গরু সরাসরি পাচার করা হতো মুর্শিদাবাদের এই পাইকর সীমান্ত থেকে। অন্যদিকে সাগরদিঘী হাট থেকে পাচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হতো গরু। সাগরদিঘী এলাকার মিরপুর ঘাট, টিকলিপাড়া ঘাট, গয়েশপুর এলাকা সহ বিভিন্ন জায়গায় এই ভাবেই অবৈধ ঘাট নির্মাণ করে চালানো হতো পাচারের কাজ।
বিকল্প পদ্ধতি
পাঁচ টাকার নোট ব্যবহার করে যদি চোরাচালান করা সম্ভব না হয়ে ওঠে, তখন পাচারকারীরা ব্যবহার করতেন একটি বিশেষ সিগারেটের প্যাকেট। বীরভূম থেকে মুর্শিদাবাদের সীমান্তে সিগারেটের প্যাকেট দেখলেই ছেড়ে দেওয়া হতো গরু বোঝাই লরি। এই সিগারেটের প্যাকেটগুলি ছিল চোরাচালানকারীদের সিক্রেট বক্স। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে খবর, এই সিগারেটের প্যাকেটের ভিতর একটি কাগজ থাকতো এবং সেই কাগজে লেখা থাকত এই চোরা চালানোর বিষয়ে কিছু গোপন তথ্য। সেই তথ্য শুধুমাত্র তারাই বুঝতে পারতেন যারা এই চোরাচালানের কাজের সঙ্গে সরাসরি ভাবে সংযুক্ত। বীরভূমের ইলামবাজারের গরু হাট থেকে গরু বোঝাই করা লরি চালকদের কাছে এই সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে দিতেন বীরভূমের একজন প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। কিন্তু এই সিগারেটের প্যাকেট খোলার অনুমতি একদম ছিল না লরিচালকদের। নির্দিষ্ট কিছু লোক ছাড়া ওই বিশেষ সিগারেটের প্যাকেটের বিষয়ে আর কেউ তেমন কিছু জানতেন না।
গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত থেকে উঠে আসছে, যদি রাস্তায় কেউ এই গরু বোঝাই লরি দাড় করাতো তাহলে লাইসেন্সের পরিবর্তে দেখানো হতো সেই বিশেষ সিগারেটের প্যাকেট। এই প্যাকেট চোখে পড়লেই বিএসএফ জওয়ানরা ওই লরিকে ছেড়ে দিতেন। এর ফলে বীরভূমের ইলামবাজারের গরু হাট থেকে মুর্শিদাবাদের লোহাপুর পর্যন্ত আসতে কোনো রকম কোন সমস্যা হতো না চোরাচালানকারীদের। অভিযোগ, লোহাপুর এসে কাজ শেষ হতো অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ আব্দুল লতিফের। লোহাপুর থেকে এই পুরো চোরা চালানোর বিষয়টির দায়িত্ব নিতে মুর্শিদাবাদ সিন্ডিকেট। এবার মুর্শিদাবাদ সিন্ডিকেট এর হাতে আর ৫ টাকার নোট নয়, বরং থাকতো দশ টাকার একটি বিশেষ ছাপ দেওয়া নোট। আর সেই নোট দেখালে গরুর লরি সরাসরি পৌঁছে যেত জলঙ্গি, শামশেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ এবং লালগোলার সীমান্তবর্তী কিছু বিশেষ কাজের জন্য নির্মিত শুনশান ঘাটে।
কী লেখা থাকত ঐ সিগারেটের প্যাকেট ও ৫ টাকার নোটে?
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানাচ্ছে, ওই বিষয়ে সিগারেটের প্যাকেটের ভিতরে থাকতো একটি বিশেষ ধরনের কাগজ যার উপরে গরুর ছাপ মেরে দেওয়া হতো। তার পাশাপাশি ওই সিগারেটের প্যাকেট এর উপরে থাকত একটি লরির নম্বর এবং গরুর বিশেষ নম্বর। অন্যদিকে ৫ টাকার নোটের উপরে থাকত গরুর সিরিয়াল নম্বর এবং তারিখ। এই বিশেষ নম্বর আর গরুর ছাপ ছিল ইলামবাজারের অনুব্রত ঘনিষ্ঠ গরু পাচারকারী আব্দুল লতিফের প্রতীক। তার কাজ ছিল ইলামবাজারের গরু হাট থেকে উন্নত মানের প্রাপ্তবয়স্ক বলদ কিনে লোহাপুর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া এবং মুর্শিদাবাদের অন্য পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ৫ টাকার নোট এবং সিগারেটের প্যাকেট দেখেই গরু বোঝাই লরি ছাড় দেওয়ার জন্য ওই এলাকার বিভিন্ন থানাতে লতিফ নিজেই গিয়ে পৌঁছে দিতেন মাসিক খাম। জানা গিয়েছে, এই খামের মধ্যে থাকতো টাকা। যদি বড় লরি সেই এলাকা দিয়ে পার হতো তাহলে ২০ হাজার টাকার কাছাকাছি দেওয়া হতো আর ছোট লরি গেলে ৫ হাজার টাকা। এই টাকা যে ঠিকানাতে পৌঁছতো, সেই ঠিকানার ব্যাপারে খোঁজ চালাতে শুরু করেছে সিবিআই। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু ঠিকানার সন্ধান পেয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। কয়েকটি বিশেষ সিগারেটের দোকানেরও খোঁজ পেয়েছেন সিবিআই কর্তারা। কেন্দ্রীয় তদন্ত থেকে উঠে আসছে, স্থানীয় বিশেষ কিছু সিগারেটের দোকান থেকে অত্যন্ত কম টাকা বিনিময়ে এই সমস্ত ফাঁকা সিগারেটের প্যাকেট কিনে আনতেন লতিফের কর্মীরা এবং তাতে বিশেষ কিছু কাগজ ভরে ছাপ দিয়ে তৈরি করা হতো ওই সিগারেটের প্যাকেট। অন্যদিকে ৫ টাকার নোটের উপরে পেন দিয়ে লেখা হতো গরুর সিরিয়াল নম্বর এবং পাচারের ব্যাপারে সম্পূর্ণ তথ্য। তাই এখনকার দিনে ৫ টাকার নোট খুব বিরল এবং সিগারেটের প্যাকেট সাধারণ মানুষের জন্য কোন কাজের না হলেও, চোরাচালানকারীদের কাছে এগুলি হীরে জহরতের থেকে কম কিছু নয়।







