নীতির প্রশ্নে বামপন্থা কি আপসের পথে?

Salim-Humayun:জোট করা তো অনেক বড় বিষয়, এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক করতে গেলেনই বা কেন মহম্মদ সেলিম?

inscript
৬ মিনিট
নীতির প্রশ্নে বামপন্থা কি আপসের পথে?

রাজ্যে নির্বাচনের দামামা বেজে গেছে। নির্বাচনী ইস্যু কী হবে! SIR-এর জন্য ভোটে কী প্রভাব পড়বে? এসব প্রশ্ন যেমন ভাবাচ্ছে, তেমনই প্রশ্ন জাগছে রাজনৈতিক মহলে— এবারও কি বাম-কংগ্রেস জোট হবে? আইএসএফ কি থাকবে সেই জোটে? তৃণমূল বহিষ্কৃত হুমায়ূন কবীরের নতুন দল জনতা উন্নয়ন পার্টি কি ভোটকাটুয়ার ভূমিকা পালন করবে? নাকি নাস্তানাবুদ করবে তৃণমূলকে মুর্শিদাবাদে? এসব প্রশ্নের মাঝে জন্ম নতুন বিতর্কের। নীতি-আদর্শের জলাঞ্জলি দিল সিপিএম?

২৮ জানুয়ারি রাতে নিউটাউনের এক হোটেলে কমিউনিস্ট পার্টির (CPIM)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ও জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ূন কবীরের বৈঠক হয়। তারপর থেকেই ঘরে বাইরে কার্যত অসন্তোষের মুখে পড়তে হচ্ছে সিপিএম-কে। প্রশ্ন উঠছে, হুমায়ূনের মতো সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদকের বৈঠক কেন? হুমায়ূন কবীর অবশ্য সংবাদমাধ্যমে বলেন, বাম ও আইএসএফের সঙ্গে জোট করে লড়তে চান তিনি। মহম্মদ সেলিম বলেন, মন বুঝতে এসেছিলেন।

*হুমায়ূনের বিতর্কিত রাজনৈতিক জীবন*

রেজিনগরের বাসিন্দা হুমায়ূন কবীর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে ছিলেন ২০১৩ সাল পর্যন্ত। এরপর যোগ দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেসে। কিন্তু দল বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তাঁকে তৃণমূল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল ৬ বছরের জন্য। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে হেরে যান। এরপর ২০১৮ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গিপুর আসনে বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন। কিন্তু জয়লাভ করতে পারেননি। বহিষ্কারের ছয় বছর পূর্ণ হলো তৃণমূলের টিকিটে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিধায়ক হন ভরতপুর আসন থেকে।

২০২৪ সালের মে মাসে হুমায়ুন কবীরের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, '২ ঘণ্টার মধ্যে আমি যদি হিন্দুদের ভাগীরথী নদীতে ফেলতে না পারি তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব।'

২০২৫ সালে হুমায়ূন বাবরি মসজিদ নির্মাণে উদ্যত হন। ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি যখন মাথাচাড়া দিয়েছে বঙ্গে, এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের আবেগজড়িত বাবরি নির্মাণের উদ্যোগ ধর্মীয় মেরুকরণ জোরদার করবে বলেই আশঙ্কা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের। জোট করা তো অনেক বড় বিষয়, এমন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বৈঠক করতে গেলেনই বা কেন মহম্মদ সেলিম? প্রশ্ন এটাই। এটা কি বামপন্থা নীতির পরিপন্থী নয়?

ইনস্ক্রিপ্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিপিএমের রাজ্যসভার সদস্য বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “দুজন পরিণত বয়সের মানুষ কথা বললে নীতি আদর্শের প্রশ্ন আসে কোত্থেকে? রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছে কি? তার আগে ব্যক্তি বিদ্বেষ তৈরি করবেন না। অন্য রাজনীতি করছে বলে তাঁর সঙ্গে কথা বলা যাবে না? সাম্প্রতিককালে দেখতে পাচ্ছি ভিন্ন মতাদর্শের হলে তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন না, তাঁর বাড়িতে যাবেন না। তাঁর মেয়ের বিয়েতে যাবেন না। এরকম অসামাজিক, অসভ্য দৃষ্টি তৈরি করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সেটা বর্জন করতে হবে।”

কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই কি সব? হুমায়ূনের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের বৈঠক কেন? মন বোঝার জন্য কি বৈঠক করতে হয়! এই প্রশ্নের উত্তরে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, হ্যাঁ, সিদ্ধান্তই সব। তাছাড়া দু’জন রেস্তোরাঁয় খেতে খেতে গল্প করতে পারেন না! বৈঠক হয়েছে কে বলেছে? এটা তো মিডিয়া নাম দিয়েছে।”

হুমায়ূন-সেলিমের বৈঠক নিয়ে দলের অন্দরেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছেন কেউ কেউ। সিপিএমকে নিশানা করেছে তৃণমূল-বিজেপিও। তার জবাব দিতে গিয়ে সিপিএমের যুবনেতা শতরূপ ঘোষ বলছেন, “সিপিএম তো এখনও বলেনি, হুমায়ুনকে ভরসা করবে কি না। কিন্তু, সমস্ত নীতি-নৈতিকতার ঠেকা কি আমরা একা নিয়ে বসে রয়েছি? বিজেপি তাকে প্রার্থী করলে দোষ নেই। তৃণমূল মন্ত্রী করলে দোষ নেই। সিপিএম তাঁর সঙ্গে কথা বললে অপরাধ হয়ে গেল? ভোটের জন্য বিজেপি, তৃণমূল রাজনীতি করবে, তখন নৈতিকতার প্রশ্ন আসবে না। তোমরা দেশের সরকার চালাচ্ছ, রাজ্যের সরকার চালাচ্ছ, তোমরা নৈতিকতার ধার ধারবে না। আর যাবতীয় নৈতিকতার ঠেকা কি আমরা নিয়ে বসে রয়েছি?”

এই নিয়ে আর এক তরুণ নেতা প্রতীক উর রহমান সমাজমাধ্যমে লেখেন, “নীতি নৈতিকতা ছাড়া, আর যাই হোক, কমিউনিস্ট পার্টি হয় না।” কার উদ্দেশ্যে হঠাৎ এই পোস্ট? অনেকেই মনে করছেন তাঁর এই পোস্ট শতরূপ ঘোষের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে করা। এই নিয়ে ইনস্ক্রিপ্টকে প্রতীক উর জানিয়েছেন, “সোশ্যাল মিডিয়া প্রতিটি মানুষের মত প্রকাশের জায়গা। মত প্রকাশ করেছি। এখন তো দেওয়াল লিখন কমে গেছে, তাই ফেসবুকের দেওয়ালে লিখে রেখেছি, নিজের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য। যাতে আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারি।”

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।