"কেন নাম বাদ গেল, কেউ বলছে না", SIR-বঞ্চিতরা ন্যায় পাবেন আদালতে?
পরিবারের সাত ভাইবোনের মধ্যে তিন জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়েছে, “আপনারা সাত ভাইবোন, তাই নাম বাদ গিয়েছে।” এই ব্যাখ্যা শুনে বিস্মিত তসলিমা।
২০০২ সাল থেকে ভোট দিচ্ছেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের নাম এখনও ভোটার তালিকায় রয়েছে। অথচ হঠাৎ করেই নিজের নাম উধাও। কেন বাদ গেল, তার স্পষ্ট উত্তরও পাননি। ট্রাইবুনালে নথি জমা দিয়েছেন, বিভিন্ন দফতরে ঘুরেছেন, কিন্তু সমাধান মেলেনি। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়, শুধু ভোটাধিকার নয়, রেশন-সহ অন্যান্য সরকারি পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
হুগলির ধনেখালির দশঘরা স্টেশন বাজারের বাসিন্দা সফুরা বেগমের দাবি, তাঁর নাম প্রথমে ট্রাইবুনালে বিচারাধীন ছিল। পরে সেটিও বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “২০০২ সাল থেকে ভোট দিয়ে আসছি। শ্বশুরবাড়িতেও ভোট দিয়েছি। অথচ এখন আমার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। যেখানে যেতে বলছে, সেখানেই কাগজ জমা দিচ্ছি। শুধু শুনছি রেশন বন্ধ হয়ে যাবে, ব্যাঙ্কের সুবিধাও বন্ধ হতে পারে। কিন্তু কোনও সুরাহা হচ্ছে না।”
একই এলাকার বাসিন্দা তসলিমা বিবির অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাঁর অভিযোগ, পরিবারের সাত ভাইবোনের মধ্যে তিন জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ জানতে চাইলে তাঁকে বলা হয়েছে, “আপনারা সাত ভাইবোন, তাই নাম বাদ গিয়েছে।” এই ব্যাখ্যা শুনে বিস্মিত তসলিমা। তিনি বলেন, একাধিকবার আবেদন করার পরও কোনও সমাধান হয়নি। এখন তাঁর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে। “ভয় হচ্ছে, আমাদের নিয়ে কী হবে! নানা ধরনের কথা শুনছি। খুব আতঙ্কে রয়েছি,” বলেন তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR controversy: ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর পাসপোর্ট নবীকরণও আটকে যায় প্রাক্তন সম্পাদক আর. রাজাগোপালের। তাঁর দাবি, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি মেয়ের বিয়েতেও যেতে পারেননি। এই ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধন, নথি যাচাই এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
ধনেখালির আর এক বাসিন্দা জনিশা খাতুনও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, বাস্তবে তিন ভাইবোন হলেও নথিতে ছয় ভাইবোন দেখিয়ে তাঁর নাম বাতিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক জায়গায় আবেদন করেছি। এখানে কাগজ জমা দিতেও বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনও ফল হয়নি।”
এই সব অভিযোগকে সামনে রেখেই মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠক করে CPI(ML) Liberation। দলের দাবি, বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটার কোনও না কোনওভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাতিল হয়েছে অথবা তথাকথিত ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র অজুহাতে বিচারাধীন রাখা হয়েছে।
CPI(ML) Liberation-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের দাবি, SIR প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলেও অধিকাংশই জানেন না কেন তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বা কীভাবে তা পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। এই পরিস্থিতিতে দল রাজ্যজুড়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করেছে এবং সেই স্বাক্ষর-সহ কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে জনস্বার্থ মামলা হিসেবে বিষয়টি গ্রহণের আবেদন জানাবে। তাঁর মতে, ভোটারদের আইনি লড়াইয়ের সমস্ত খরচ রাষ্ট্রের বহন করা উচিত। পাশাপাশি ব্লক স্তর পর্যন্ত ট্রাইবুনাল গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তিরও দাবি জানান তিনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR: নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) অভিযানে এক বছরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৬ কোটি নাম। কমিশনের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট ভোটারদের সরানো হয়েছে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, বহু প্রকৃত ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ পড়ায় দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর অনেকের রেশন, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মতো সরকারি প্রকল্পের সুবিধা, সংরক্ষণের অধিকার এবং পাসপোর্ট সংক্রান্ত পরিষেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এর মাধ্যমে মানুষের নাগরিক অধিকার ধাপে ধাপে খর্ব করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নাম বাদ যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে 'ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট' নীতি কার্যকর করার চেষ্টা হতে পারে, যা মানবিক ও আইনি— উভয় দিক থেকেই উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতিতে ভোটাধিকার পুনর্বহাল, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং বেআইনি ডিপোর্টেশন বন্ধের দাবিতে দেশজুড়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনের আহ্বান জানান তিনি।
দলের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার বলেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ শব্দবন্ধই অযৌক্তিক। তাঁর অভিযোগ, এই অস্পষ্ট কারণ দেখিয়েই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ট্রাইবুনালের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু সেই ট্রাইবুনালের অবস্থান ও প্রক্রিয়া এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেখানে গিয়ে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক এলাকার কোনও মানুষকে যদি কলকাতার জোকায় এসে হাজিরা দিতে হয়, তাহলে সেই খরচ ও যাতায়াতের বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা কঠিন বলেও তিনি দাবি করেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
West Bengal Politics: পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সংরক্ষণ, সীমান্ত রাজনীতি, ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা ও ‘গুজরাট মডেল’-এর আলোচনার মধ্যে নতুন বাংলার ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোচ্ছে?
তাঁর কথায়, ভোটাধিকার যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি নাগরিক অধিকারও কার্যত খর্ব করা হচ্ছে।
দলের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং বিশেষভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। যদিও এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে কোনও সরকারি বা বিচারিক সত্যতা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
CPI(ML) Liberation জানিয়েছে, বাতিল ও বিচারাধীন ভোটারদের ভোটাধিকার পুনর্বহাল, ট্রাইবুনালের কার্যপ্রণালীর স্বচ্ছতা এবং দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে তারা জুলাই মাসের ৫ তারিকের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়েরের আবেদন করবে। পাশাপাশি, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত প্রায় ২০ হাজার স্বাক্ষরও আগামী জুলাই মাসে প্রধান বিচারপতির কাছে জমা দেওয়া হবে।
সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার, মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র, আইনজীবী রঘুনাথ চক্রবর্তী এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া একাধিক ব্যক্তি। তাঁদের বক্তব্য, এই লড়াই শুধুমাত্র ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য নয়, নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নেও।








