পূর্ব লাদাখ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ভারত ও চিনের, কী ইঙ্গিত মিলল বৈঠকে?
India China border tension: গালওয়ান সংঘর্ষের পর দীর্ঘ টানাপোড়েনের মাঝেও ফের আলোচনার টেবিলে ভারত ও চিন। এলএসি পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের আলোচনা সত্যিই সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করবে?
ভারত ও চিনের সীমান্ত উত্তেজনা গত কয়েক বছরে দু'দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি ঘিরে সংঘাতের পর পরিস্থিতি একাধিকবার জটিল হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বৈঠক নিয়ে দু'দেশের বক্তব্যে কিছুটা হলেও ইতিবাচক সুর শোনা যাচ্ছে। ভারত ও চিন জানিয়েছে, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মধ্যে 'গঠনমূলক আলোচনা' হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও কূটনৈতিক ও সামরিক স্তরে যোগাযোগ বজায় থাকবে।
সম্প্রতি দিল্লিতে ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত বিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয় সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে দু'দেশের কূটনীতিক এবং সামরিক আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। মূলত এলএসি বরাবর বর্তমান পরিস্থিতি, সেনা মোতায়েন, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং সীমান্তে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানায়, আলোচনা ছিল গঠনমূলক। চিনের বিদেশ মন্ত্রকও একই ধরনের মন্তব্য করেছে।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্ক কার্যত নতুন মোড় নিয়েছিল। সেই সংঘর্ষে ভারতীয় সেনাদের মৃত্যু হয়, চিনেরও হতাহতের খবর সামনে আসে। এরপর থেকেই দু'দেশের মধ্যে সীমান্তে সেনা মোতায়েন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। একাধিক দফায় সামরিক কমান্ডার স্তরের বৈঠক হলেও সব সমস্যার সমাধান হয়নি। কিছু এলাকায় সেনা প্রত্যাহার হলেও এখনও কয়েকটি স্পর্শকাতর অঞ্চলে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। কারণ, দু'দেশই বুঝতে পারছে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তাদের অর্থনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানের উপর প্রভাব ফেলছে। ভারত একদিকে যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে, তেমনই চিনও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের প্রভাব ধরে রাখতে আগ্রহী। ফলে সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন উভয় দেশের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের বক্তব্যে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সীমান্তে শান্তি বজায় না থাকলে দু'দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না। গত কয়েক বছর ধরে নয়াদিল্লি এই অবস্থানেই অনড় রয়েছে। বাণিজ্য বা কূটনৈতিক সম্পর্ক এগোলেও সীমান্ত সমস্যার সমাধান ছাড়া পূর্ণ আস্থা ফিরবে না। চিন যদিও বারবার বলেছে, সীমান্ত ইস্যুকে দু'দেশের সম্পর্কের একমাত্র নির্ধারক হিসেবে দেখা উচিত নয়। কিন্তু ভারতীয় কূটনৈতিক মহল মনে করে, গালওয়ানের পর পুরনো সম্পর্কের কাঠামো আর আগের মতো নেই।
এই বৈঠকে সীমান্তে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার এবং উত্তেজনা কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দু'পক্ষই সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tibetan refugees in Ladakh: লাদাখ ও কার্গিলে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল পুরখি/পুরক্সি/পুরিখ সম্প্রদায়ের ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই যাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে আমার সামনে তিব্বতী স্মৃতির এক জানালা খুলে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও চিনের মধ্যে এই ধরনের বৈঠক কেবল সীমান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য নয়, বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় সংঘাত এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার আবহে এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ব্রিকস, এসসিও-র মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত ও চিন একসঙ্গে কাজ করে। ফলে সীমান্ত উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই সহযোগিতাতেও প্রভাব পড়ে।
এছাড়া বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও দু'দেশের সম্পর্ক জটিল হলেও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও ভারত ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ কমেনি। বরং বহু ক্ষেত্রে তা বেড়েছে। ভারতীয় বাজারে এখনও বিপুল পরিমাণ চিনা পণ্য আসে। আবার ভারতও বিভিন্ন কাঁচামাল ও শিল্প উপকরণের জন্য চিনের উপর নির্ভরশীল। ফলে সম্পর্ক পুরোপুরি খারাপ হওয়া দু'দেশের পক্ষেই সুবিধাজনক নয়।
তবে আশার কথা শোনা গেলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। সীমান্তে সেনা মোতায়েন আগের তুলনায় অনেক বেশি। অবকাঠামো নির্মাণও দু'পক্ষই দ্রুত গতিতে চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত লাদাখ ও অরুণাচল সীমান্তে রাস্তা, সেতু ও সামরিক ঘাঁটি মজবুত করছে। চিনও তিব্বত অঞ্চলে সামরিক পরিকাঠামো বাড়িয়েছে। ফলে আলোচনা চললেও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনও কাটেনি।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশই সরাসরি সংঘর্ষ এড়াতে চাইছে। কারণ যুদ্ধ বা বড় ধরনের সংঘাতের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার সময়ে নতুন করে উত্তেজনা কেউই বাড়াতে চাইবে না। তাই আপাতত আলোচনার পথই বেছে নেওয়া হয়েছে।








