শুধু বন্ড নয়, বিজেপির রক্ষক নির্বাচনী ট্রাস্টও! কোটি কোটি টাকার অনুদান কে দিল মোদিকে?
Electoral Trust BJP Fund: ২০১৯ আর ২০২২ সালের মধ্যে ১৮টি এমন লেনদেন চিহ্নিত করা যাচ্ছে যেখানে আটটি কর্পোরেট গ্রুপ ট্রাস্টকে বড় অনুদান দিয়েছে।

নয়াদিল্লির বুকে ছোট্ট একটা অফিস। ঝাঁ চকচকে তো নয়ই, ওই জায়গায় যে অফিস থাকতে পারে তা ভাবাও দুষ্কর। সেইখানেই একটি নির্বাচনী ট্রাস্টের সদর দফতর অবস্থিত। এই নির্বাচনী ট্রাস্ট চালায় মাত্র দুই জন ব্যক্তি। আর এই নির্বাচনী ট্রাস্টই ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন শাসক ভারতীয় জনতা পার্টিকে সবচেয়ে বেশি টাকা দিয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, প্রুডেন্ট ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট ২০১৩ সালে তৈরি হয়। তারপর থেকে ২৭২ মিলিয়ন ডলার টাকা তুলেছে যার প্রায় ৭৫ শতাংশই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দলকে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী কংগ্রেস দলকে দেওয়া ২০.৬ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে বিজেপিকে এই ট্রাস্টের অনুদান মোট ১০ গুণ বেশি।
এর আগের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১৩ সালে নির্বাচনী ট্রাস্ট চালু করেছিল যাতে দলগুলিকে কর-মুক্ত অনুদানের অনুমতি দেওয়া হয়। বলা হয়, নগদে টাকা দিলে তার হদিশ রাখা মুশকিল। কিন্তু নির্বাচনী ট্রাস্টের মাধ্যমে করলে তা রাজনৈতিক প্রচারাভিযানের অর্থ দানকে আরও স্বচ্ছ করে তুলবে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, এই ট্রাস্টগুলি ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির অনুদানকে আরও অস্বচ্ছ করেছে৷
প্রুডেন্ট ব্যক্তিগত কর্পোরেট অর্থদাতাদের দেওয়া এই অনুদান কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলিকে বিতরণ করা হয়েছে তার বিশদ তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে রয়টার্স ২০১৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ভারতের কিছু বড় কোম্পানির তথ্য খতিয়ে দেখে বিশ্লেষণ করেছে, ভারতের আটটি বৃহত্তম ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মোট ৫০ মিলিয়ন ডলার এই ট্রাস্টকে অনুদান দিয়েছে। পরে এই ট্রাস্ট বিজেপিকে এই একই পরিমাণ অর্থের চেক দিয়েছে। চারটি কোম্পানি - আর্সেলরমিত্তাল নিপ্পন স্টিল, টেলকো ভারতী এয়ারটেল, GMR এবং Essar - সরাসরি দলকে টাকা দেয়নি এবং দাতাদের তালিকায় নামও নেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Electoral Bonds Scam: ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলির তহবিলে ঢুকেছে। আর তার সিংহভাগ ঢুকেছে বিজেপির তহবিলে।
GMR এবং ভারতী এয়ারটেল জানাচ্ছে, তাদের অনুদান কীভাবে বিতরণ করা হবে তা নির্ধারণ করে প্রুডেন্টই। প্রুডেন্টই নিজেদের অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকা অনুসারে কাজ করে। প্রুডেন্ট কিন্তু তৈরি করেছিল ভারতী এয়ারটেলই। ২০১৪ সালে অডিটর মুকুল গয়াল এবং ভেঙ্কটাচালাম গণেশের কাছে প্রুডেন্টের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু প্রুডেন্ট কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে জনগণের জন্য প্রকাশ্যে তথ্য নেই কোনও। প্রুডেন্ট ভারতের ১৮টি নির্বাচনী ট্রাস্টের মধ্যে বৃহত্তম। আইনত এটি প্রতি দাতার কাছ থেকে কতটা টাকা সংগ্রহ করেছে এবং কোন দলকে কত টাকা দিয়েছে তা ঘোষণা করতে বাধ্য৷ ভারতের চারটি বৃহত্তম নির্বাচনী ট্রাস্টের মধ্যে এটিই একমাত্র একাধিক কর্পোরেট গ্রুপ থেকে অনুদান গ্রহণ করে।
ভারতে এই ধরনের রাজনৈতিক-কর্পোরেট অনুদানকে অস্বচ্ছ হিসাবেই দেখা হয়। ভারতে বেশিরভাগ রাজনৈতিক অনুদানের নেপথ্যে কে আছে তা জানাও যায় না। বিজেপি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে জানিয়েছিল তাদের মোট সম্পত্তির পরিমাণ ৭০.৪ বিলিয়ন টাকা। কংগ্রেসের সম্পত্তি ছিল ৭.৭৫ বিলিয়ন টাকা। তবে তথ্য বলছে, প্রুডেন্ট ২০২৩ সালের মার্চ থেকে কংগ্রেসকেও বড় অনুদান দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট ফেব্রুয়ারি মাসেই বলেছিল, কর্পোরেট এই অনুদানগুলি স্পষ্টতই ব্যবসায়িক লেনদেন। টাকার বদলে সুবিধা নিশ্চিত করতেই অনুদান দেওয়া হয়। এই রাজনৈতিক দলগুলো কি জানে কারা ট্রাস্টের মাধ্যমে টাকা দিচ্ছে? নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলি এই অর্থদাতাদের পরিচয় জানে৷
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Electoral Bond : আমরা কি জানি লোকসভা নির্বাচনে লড়তে গেলে একজন প্রার্থীকে সর্বোচ্চ ৯৫ লাখ টাকা খরচ করার অনুমতি দিয়ে রেখেছে নির্বাচন কমিশন?
প্রুডেন্টের পরেই বিজেপির অন্যতম বড় দাতা হল টাটা গ্রুপের প্রগ্রেসিভ ইলেক্টোরাল ট্রাস্ট। এটি বিজেপিকে ৩.৬ বিলিয়ন টাকা দিয়েছে। কংগ্রেসের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় দাতাও তারাই। ৬৫৫ মিলিয়ন টাকা দিয়েছে তারা কংগ্রেসকে।
এই ট্রাস্টগুলিকে বার্ষিক পরিচালনার ব্যয়ের জন্য সর্বাধিক ৩ লক্ষ টাকা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। প্রুডেন্ট নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের কাছে যে অনুদানের প্রতিবেদন দাখিল করেছে তা থেকে ২০১৯ আর ২০২২ সালের মধ্যে ১৮টি এমন লেনদেন চিহ্নিত করা যাচ্ছে যেখানে আটটি কর্পোরেট গ্রুপ ট্রাস্টকে বড় অনুদান দিয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে, প্রুডেন্ট বিজেপিকে ওই একই পরিমাণ টাকার চেক দিয়েছে। যেমন, ২০২১ সালের ১২ জুলাই আর্সেলর মিত্তল ডিজাইন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্টার প্রাইভেট লিমিটেড প্রুডেন্টকে ৫০০ মিলিয়ন টাকার চেক দিয়েছে। পরের দিন, প্রুডেন্ট একই পরিমাণ টাকার একটি চেক বিজেপিকে দিয়েছে। আর্সেলর মিত্তল নিপ্পন স্টিল ইন্ডিয়াও ২০২১ সালের ১ নভেম্বর প্রুডেন্টকে ২০০ মিলিয়ন এবং ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর ৫০০ মিলিয়ন টাকা দিয়েছে৷ ঠিক সেই পরিমাণ টাকাই ২০২১ সালের ৫ নভেম্বর এবং ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর বিজেপিকে পাঠানো হয়েছিল৷
ভারতী এয়ারটেল ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রুডেন্টকে ২৫০ মিলিয়ন এবং ২০২১ সালের ২৫ মার্চ ১৫০ মিলিয়ন টাকা দিয়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ জানুয়ারি এবং ২০২১ সালের ২৫ মার্চ ট্রাস্ট বিজেপিকে সেই একই পরিমাণের টাকা দিয়েছে। আরপি-সঞ্জীব গোয়েঙ্কা গ্রুপের তিনটি কোম্পানি - হলদিয়া এনার্জি ইন্ডিয়া, ফিলিপস কার্বন ব্ল্যাক এবং ক্রিসেন্ট পাওয়ার - যথাক্রমে ২৫০ মিলিয়ন টাকা, ২০০ মিলিয়ন টাকা এবং ৫০ মিলিয়ন টাকার চেক দিয়েছে ২০২১ সালের ১৫, ১৬ মার্চ এবং ১৯ মার্চ। ১৭ মার্চ বিজেপি প্রুডেন্টের কাছ থেকে ৪৫০-মিলিয়ন টাকার চেক পেয়েছে; ২০ মার্চ একটি ৫০-মিলিয়ন টাকার চেক পেয়েছে।
২০১৪ সালে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বিজেপির তহবিল ফুলেফেঁপে উঠেছে। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে বিজেপির তহবিল ৭.৮ বিলিয়ন টাকা থেকে বেড়ে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে হয় ৭০.৪ বিলিয়ন টাকা। এই একই সময়ে কংগ্রেসের তহবিল ৫.৩৮ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৭.৭৫ বিলিয়ন টাকা হয়েছে।






