জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের সংক্রমণে আতঙ্কে অসম, কী এই রোগ?

Japanese encephalitis: কোনো রকম অবেহেলা করবেন না এই রোগের ক্ষেত্রে। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ না পেলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

Piya Saha
৩ মিনিট
জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের সংক্রমণে আতঙ্কে অসম, কী এই রোগ?

ক্রমশ আতঙ্ক ধরাচ্ছে দেশে জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের সংক্রমণ। অসম জুড়ে থাবা বসাতে শুরু করেছে এই রোগ। ইতিমধ্যেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে অসমে।গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার মিজোরামে জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের প্রথম কেস ধরা পড়েছে।অসমের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির পরেই সে রাজ্যে জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের প্রকোপ আরও বাড়তে শুরু করে। মিজোরামের ইন্টিগ্রেটেড ডিজিজ সার্ভিলেন্স কন্ট্রোলার রাজ্য নোডাল অফিসার ও চিকিৎসক পাচুয়াউ লালমালসাওমা একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন যে আইজলের এক রোগীর দেহে এই রোগ শনাক্ত করা হয়েছে। জাপানি এনসেফ্যালাইটিস ভাইরাস ভাইরাল এনসেফ্যালাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার(হু) মতে, প্রতি বছর এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত দেশগুলি মিলিয়ে প্রায় ৬৮ হাজারেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন।

অসম রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে,অসমের উপরিভাগ অর্থাৎ গোলাঘাট, জোরহাট, মাজুলি, শিবসাগর, লখিমপুরে হু হু করে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। কিন্তু কী রোগ যা কেড়ে নিলো ৭৭ জন মানুষের জীবন? বিশদে জেনে নেওয়া যাক এই রোগের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি -

জাপানি এনসেফ্যালাইটিস কী?

জাপানি এনসেফ্যালাইটিস মশার দ্বারা সংক্রমিত একটি জুনোটিক রোগ। এই রোগের কারক ভাইরাসটি হল জাপানি এনসেফ্যালাইটিস ভাইরাস(JEV) । মানুষ এবং পশু উভয়েই সংক্রামিত হয় এই ভাইরাসে। জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের জন্য দায়ী ভাইরাস ডেঙ্গু, পীত জ্বর ভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ফ্ল্যাভিভাইরাস। বিরল রোগ জাপানি এনসেফ্যালাইটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৩০% পর্যন্ত হতে পারে।

হু-এর মতে,এশিয়ার বেশিরভাগ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন সময় এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা যেতে পারে। সারা বছরই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও প্রায়শই বর্ষাকালে মানুষ জাপানি এনসেফ্যালাইটিসে বেশি আক্রান্ত হন।

রোগের উপসর্গ কী?

যদি কোনো এডিস মশা জাপানি এনসেফ্যালাইটিসে আক্রান্ত শুয়োর বা পাখিকে কামড়ায়, তখন ওই মশা রোগের বাহক হয়ে যায়। সেই মশা কোনো সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ালে তিনি এই রোগে আক্রান্ত হন। তবে ভাইরাস সংক্রমণের ৫ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এই রোগের প্রধান উপসর্গ হল জ্বর ও গায়ে ব্যথা। সঙ্গে মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং খিঁচুনি হতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনালে ব্যথা এবং বমি হয়। তবে শিশু ও প্রাপ্ত বয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রেই এই রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে ঘন ঘন জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, কোমা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুও হতে পারে।

জাপানি এনসেফ্যালাইটিস কীভাবে শরীরের ক্ষতি করে?

কোনো ব্যক্তিকে যদি জেইভি সম্পন্ন এডিস মশা কামড়ায় তবে ভাইরাস প্রথমে ত্বকে সংক্রমণ ঘটায়। এরপর ত্বক থেকে তা পৌঁছায় দেহের কোষে। কোষের লসিকা গ্রন্থিতে সংক্রমণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। তবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো কাজ করলে ব্যক্তির রোগের মাত্রা কমে যায়। প্রায় এক সপ্তাহ স্থায়ী হয় এই সংক্রমণ। রক্তের মাধ্যমেই মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে এই রোগ। অন্ত্রের কার্যকারিতাও পরিবর্তন করে ফেলতে পারে এই রোগের ভাইরাস।

চিকিৎসা

জাপানি এনসেফ্যালাইটিস রোগের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। কেবলমাত্র বাহ্যিক উপসর্গগুলি নির্মূল করার প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয় আক্রান্ত ব্যক্তিকে।তবে এই রোগ কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে অন্য সুস্থ লোকের দেহে ছড়ায় না।

কীভাবে সুরক্ষিত থাকবেন?

এই রোগের কোনো সঠিক চিকিৎসা না থাকলেও ভ্যাকসিন রয়েছে। তাই শিশুর জন্মের পরেই চেষ্টা করুন জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের ভ্যাকসিন দিয়ে নিতে। এছাড়া যে সময় মশার উপদ্রব বেড়ে যায় সেই সময়ে বাড়িতে থাকার চেষ্টা করুন। মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য একাধিক মস্কুইটো রিপেলেন্ট ক্রিম বাজারে পাওয়া যায় সেগুলি ব্যবহার করতে পারেন। রাতের বেলা মশারি টানিয়ে ঘুমান। এরপরেও জ্বর হলে ফেলে না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন দ্রুত।

কোনো রকম অবেহেলা করবেন না এই রোগের ক্ষেত্রে। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ না পেলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গতবছরে অসমে ৬৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে এই রোগে।২০১৫ সালে জাপানি এনসেফ্যালাইটিসে ১৩৫ জনের মৃত্যু হয়।২০১৬ সালে ৯৬ জন,২০১৭ সালে ৮৭ জন, ২০১৮ সালে ৯৪ জন এবং ২০১৯ সালে ১৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে এই রোগের কারণে। বন্যা পরিস্থিতির কারণে অসমে জাপানি এনসেফ্যালাইটিসের সংক্রমণ নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।