ওজন মাত্র ৪০০ গ্রাম! হাতের তালুর থেকেও ছোট এই শিশুকে যেভাবে বাঁচালেন ভারতের চিকিৎসকরা
Premature Baby Survive Pune : ধকল সামলে সুস্থ হয়ে উঠেছে ভারতের ক্ষুদ্রতম সেই শিশু। আশ্চর্য এই মিরাকলের সাক্ষী থাকল ২০২৩-এর ভারত।

মায়ের গর্ভে ছিল মাত্র ২৪টি সপ্তাহ। কিন্তু ‘ছটফটে শিশুটির’ কি যে এত তাড়া! তার মা গর্ভধারণ করার মাত্র ছ’মাসের মধ্যেই ভূমিষ্ঠ হয় সে। ওজন মাত্র ৪০০ গ্রাম! প্রি ম্যাচিওর এই শিশুটির কোনওভাবেই বেঁচে থাকার কথা নয়। তার মা-বাবাও আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তবুও হাল ছাড়েননি ডাক্তাররা। মনের জোরে, আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ওপর ভরসা করে লড়ে গিয়েছিলেন তাঁরা। শেষমেশ সফলও হয়েছেন। বিস্তর ধকল সামলে সুস্থ হয়ে উঠেছে ভারতের ক্ষুদ্রতম সেই শিশু। এক কথায় অলৌকিক, আশ্চর্য, মিরাকলের সাক্ষী থাকল ২০২৩-এর ভারত।
ঘটনাটি ঘটেছে মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে। ২০২২ সালের মে মাসে সেখানকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সন্তানসম্ভবা উজ্জ্বলা পাওয়ার। সেখানেই জন্ম নেয় ছোট্ট শিবন্যা। কিন্তু এতটা ছোট, দেখে ঘাবড়ে যান ডাক্তাররা। মাত্র ২৪ সপ্তাহেই শিবন্যা ভূমিষ্ঠ হয়। সাধারণত ৪০ সপ্তাহ বাদে সুস্থ স্বাভাবিক একজন শিশু জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকটাই আগে জন্ম হওয়ায় ডাক্তাররা শঙ্কিত হয়েছিলেন। কারণ? শিবন্যা ছিল এক্সট্রিমলি প্রি ম্যাচিওর বেবি। শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ভালোভাবে গঠন হয় না এই সময়। এরকম ‘অকাল বোধন’ নিয়েই ভয় পাচ্ছিলেন পুনের সূর্য মাদার অ্যান্ড চাইল্ড সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
অবশ্য তাঁদের এই ভয় একেবারে ফেলনার ছিল না। সুস্থ একজন শিশুর ওজন হয় প্রায় আড়াই কেজি। কিন্তু শিবন্যার ওজন ছিল মাত্র ৪০০ গ্রাম! দৈর্ঘ্য মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার! হাতের তালুর মধ্যেই চলে আসে এই নবজাতক শিশু! শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের গঠন তখনও স্বাভাবিক হয়নি। তার ওপর জন্মের পরই শুরু হয় প্রবল শ্বাসকষ্ট। সেইসঙ্গে দেখা যায় অ্যানিমিয়া, ঠিকভাবে বাঁচতেও পারছে না ছোট্ট মেয়েটি। বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। আত্মীয়, পরিজন আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন।
কিন্তু আশা ছাড়েননি পুনের ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা। প্রত্যেকে শপথ নেন, ছোট্ট শিবন্যাকে যে করেই হোক বাঁচাতেই হবে। তাকে সুস্থ সবল করে, হাসিমুখে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবেই সার্থক হবে এত পরিশ্রম। সেই মে মাস থেকেই শুরু হল এক লড়াই। যমে-মানুষে টানাটানির এই যুদ্ধে সমস্ত অস্ত্র নিয়ে নেমেছিলেন ডাক্তাররা। নিওনেটাল কেয়ার ইউনিটই হয়ে গিয়েছিল শিবন্যার ঘরবাড়ি। হাজার একটা পরীক্ষা, ওষুধ, যন্ত্রের ভিড়ে ওই ছোট্ট প্রাণটিও লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। ঋত্বিক ঘটক তাঁর সিনেমায় বলে গিয়েছেন, ‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই’। সেই বাঁচতে চাওয়ার আকুতি ওই একরত্তি মেয়েটির মধ্যেও সমানভাবে ছিল। চিকিৎসকরা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন।
ভেন্টিলেশন, নন-ইনভ্যাসিভ রেসপিরেটরি সাপোর্ট – কোনও চেষ্টাই বাকি থাকেনি। সেই ফলও মিলতে শুরু করল একটু একটু করে। শিবন্যার ওজন একটু একটু করে বাড়তে থাকে। তার অঙ্গ সচল হয়, শ্বাসকষ্ট কমতে থাকে। শরীরের ভেতরের অন্যান্য অঙ্গও একটু একটু করে নিজের চেহারা নিতে শুরু করে। যে শিবন্যাকে পেটের ভেতর বিশেষ ক্যাথিটার ঢুকিয়ে তরল খাবার খাওয়াতে হতো, সে নিজেই নিজেই খেতে শুরু করে! ওজনও ৪০০ গ্রাম থেকে বেড়ে দুই কেজি ছাড়িয়ে যায়! মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধে শেষমেশ জিতে যায় জীবন।
শিবন্যা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। হাসপাতালে এখন নেই আর; ফিরে গিয়েছে মায়ের কোলে। পৃথিবীর জল হাওয়ায় দিব্যি বেড়ে উঠছে সে। ফুটফুটে চোখে দেখছে যুদ্ধ জেতার কারিগরদের। এমন খবর সামনে আসার পরই হতবাক হয়ে গিয়েছেন সবাই। গোটা ভারত একডাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে ওই চিকিৎসকদের। এভাবেও জিতে আসা যায়!






