দৈনন্দিনের স্ট্রেস কমাতে পারে ভিডিও গেম! মানসিক স্বাস্থ্যোদ্ধারের পথে এক পা...

Madhurima Pattanayak
৩ মিনিট
দৈনন্দিনের স্ট্রেস কমাতে পারে ভিডিও গেম! মানসিক স্বাস্থ্যোদ্ধারের পথে এক পা...

ভিডিও গেমে মনের শুশ্রুষা! হ্যাঁ এমনটাও সম্ভব। এমন ভিডিওগেম আছে গেমবাজারে যা আমাদের দৈনন্দিন মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমাবে এবং আদতে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করবে। রোবলক্স, মাইনক্রাফট- এমন বেশ কয়েকটি ভিডিও গেমই এই তালিকায় রয়েছে।এই ভিডিও গেমগুলি কিন্তু শরীরচর্চা এবং মেডিটেশনের পরিপূরক নয়, বলতে পারি এগুলি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্যে সংযোজিত একটি পদ্ধতি মাত্র।

ঠিক কী কী উপসর্গ থাকে স্ট্রেসের, যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়? শুরুতেই বলা ভালো সকলেই কিন্তু স্ট্রেসের মধ্যে গেলে একই রকম ভাবে শারীরিক বা মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখান না। কে কেমন ব্যবহার করবে এটা তাঁর পারিপার্শ্বিক অবস্থা, শারীরিক অবস্থা, এমনকী জিনের উপর নির্ভর করে। স্ট্রেসের প্রাথমিক এবং অত্যন্ত সাধারণ উপসর্গগুলির মধ্যে দুঃশ্চিন্তা, ঘুমের ব্যাঘাত, খিদে কমে যাওয়া বা অত্যন্ত খিদে বেড়ে যাওয়ার মত ঘটনা দেখা যায়। এর পরবর্তী ধাপে অকারণ বিরক্ত হয়ে থাকা, অবসাদ, অল্পেই রাগ হওয়া, পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেওয়ার মত ঘটনা ঘটে। স্ট্রেসের ফলে স্মৃতিভ্রংশ এবং মনোযোগের অভাব খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

এই ভিডিও গেম দৈনন্দিন স্ট্রেস উপশমে কী ভাবে সাহায্য করে

জানা দরকার স্ট্রেসের স্বীকার আমরা কী ভাবে হই। প্রথমেই বলে রাখি স্ট্রেস মানেই সব সময়ে ক্ষতিকর নয়। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্ট্রেস বললে ক্ষতিকর বোঝানো হয়ে থাকে এবং এই প্রতিবেদনেও তাই-ই বোঝানো হচ্ছে। ধরা যাক, আপনাকে বলা হল দুই ঘন্টার মধ্যে আপনাকে একশোটা অঙ্কের সমাধান করতে হবে। এটি স্ট্রেস আপনার মস্তিষ্কের পক্ষে অবশ্যই, কিন্তু দেখা গেল আপনি ঘাবড়ে না গিয়ে অংকগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার দিকে জোর দিলেন। এতে কিন্তু খুব দ্রুত ভাবনা-চিন্তা বা গাণিতিক সমাধানের ক্ষমতা বাড়লো আপনার।

অন্য দিকে দেখা গেল, আপনি রোজ এক বা একাধিক প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন। শুরুতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে সেগুলি গ্রহণ করলেও, একদিন দেখলেন আপনারই ধৈর্যের সীমা হারাচ্ছে বা আপনার পক্ষে সেগুলো অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই আপনার খারাপ বা ‘ব্যাড’ স্ট্রেসের শুরু।

এবার আসা যাক এই বিশেষ ভিডিও গেমগুলি স্ট্রেস উপশম এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে কী ভাবে সাহায্য করে সেই প্রসঙ্গে। এই ভিডিও গেমগুলি প্লেয়ারদেরকে বেশ কয়েক ঘন্টা যেহেতু খেলার মধ্যেই মশগুল রাখে, গেমগুলি নিজেই মেডিটেশন বা ধ্যানের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘদিন এই ভিডিও গেম অভ্যাস করলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আরও সক্রিয় হয়। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মস্তিষ্কের একদম অগ্রভাগ, যা কপালের কাছাকাছি থাকে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের বৌদ্ধিক কাজকর্ম, ব্যক্তিত্ব নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সামাজিক আচার-আচরণ, এমনকি সাম্প্রতিকতম স্মৃতি ধারণে সাহায্য করে। স্ট্রেসের সম্মুখীন হলে কিন্তু প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং এর ফলে আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়।

এদিকে এই ভিডিও গেমগুলি সাময়িক খেললেই দেখা গেছে সেরোটোনিন এবং মেলাটোনিন নামের দুটি নিউরোট্রান্সমিটারের মাত্রা বাড়তে থাকে। সেরোটোনিন আমাদের আচার-ব্যবহার, মানসিক অবস্থার উন্নতি, খিদে বাড়ানো ইত্যাদির সাথে সরাসরি যুক্ত। আর অন্যদিকে মেলাটোনিন আমাদের ঠিক সময় ঘুম হওয়া এবং জেগে ওঠার রুটিনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

-

এদিকে এই ভিডিও গেমগুলিতে আপনি ছোটো-ছোটো লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারবেন নিজের জন্যে। দৈনন্দিনে এরকম অনেক লক্ষ্যমাত্রাই আমরা ঠিক করি নিজেদের জন্যে, কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি না সবসময়। এতে আত্মবিশ্বাস কমে, নিজেকে অনেক সময়ে নিজের কাছে ছোটো লাগে। কিন্তু এই বিশেষ ভিডিও গেমগুলিতে ছোটো ছোটো লক্ষ্যে পৌঁছলে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এদিকে এর ফলে বাড়তে থাকে ডোপামিন, যাকে চলতি কথায় বলে কি-না "হ্যাপি হরমোন"। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে ডোপামাইন বাড়লে যে আপনার মন ভালো হবে, আপনার সব কিছু আবার ভালো লাগবে।

দীর্ঘক্ষণ এক মনে ভিডিও গেমে ডুবে থাকায় সিঙ্গুলেটেড গাইরাস নামে কর্টেক্সের মধ্যবর্তী একটি অংশও বিশেষ ভাবে কার্যকরী হয়ে আমাদের স্মৃতিশক্তি এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা বাড়ায়। এর পাশাপাশি কার্যক্ষমতা বাড়তে থাকে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস, আমিগডালা, এবং ইন্টেরিয়র সিঙ্গুলেটারের; আর সেই কারণেই আবার বাড়তে থাকে স্মৃতিশক্তি ও অনুভূতি বাড়ায় এবং দৈনন্দিন জীবনে অণুপ্রেরণা জোগায়।

পাশাপাশি এই বিশেষ ভাবে তৈরি ভিডিও গেমগুলি খেলার ফলে আমাদের প্যারাসিম্প্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্র আরও কার্যকরী হয়। আর এই স্নায়ুতন্ত্র সরাসরি যুক্ত থাকে হার্টরেট, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং অক্সিজেন সরবরাহে। ফলে স্ট্রেসের ফলে আমাদের হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হয় ও রক্তচাপ বাড়তে থাকে, সেই অবস্থার আবার উন্নতি হতে থাকে।

সবশেষে বলা যায়, যে কোনো ধরণের ভিডিও গেম কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তার থেকেও বড় কথা, এই সমস্ত ভিডিও গেমের উদ্দ্যেশ্য কিন্তু কোনো ভাবেই আপনার স্ক্রিনটাইম বাড়ানো নয়। মহামারীর সময় যখন সারা পৃথিবী লকডাউনে কাটিয়ে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজাচ্ছিলো, বিশেষত সেই পরিস্থিতির কথা ভেবেই এই ভিডিও গেম তৈরি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।