ফ্রেন্ডফ্লেশন: পকেটের টানে বন্ধুত্বের অবসান!
friendflation: 'ফ্রেন্ডফ্লেশন' মজার শব্দ নয়। মুদ্রাস্ফীতি কীভাবে বন্ধুত্বের উপর প্রভাব ফেলে এই শব্দটি মূলত আমাদের সেটিই বোঝায়।
"আমার ভীষণ খারাপ লাগছে রে কিন্তু শরীরটা ভীষণ খারাপ তাই রেস্তোরাঁয় যেতে পারব না" ফোনের এপাশ থেকে শুভ্রা বললেন। আর এভাবেই আরও একটি পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হলেন তিনি। তিনি জানেন এই এক একটা প্ল্যান ক্যান্সেল মানেই হলো বন্ধুত্বে ফাটল। কিন্তু কী উপায়! দামী রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া তাঁর পকেটের জন্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। দিনের শেষে ইনস্টাগ্রাম স্টোরিগুলো দেখার সময় শুভ্রা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বন্ধুরা সবাই মিলে আড্ডা দিল। তিনি থাকতে পারলেন না। ধীরে ধীরে মনে 'বাদ পড়ে যাওয়ার ভয়' (FOMO) জেঁকে বসল। তৈরি হলো মানসিক দূরত্ব।
এভাবেই ২৫ বছর বয়সি আইটি পেশাজীবী শুভ্রা 'ফ্রেন্ডফ্লেশন' (Friendflation) বা 'বন্ধুমূল্যস্ফীতি'র যুগে প্রবেশ করলেন। কলকাতায় আসার দু'বছর পরেও খুব একটা কাছের বন্ধু তৈরি করতে পারেননি তিনি। 'ফ্রেন্ডফ্লেশন' মজার শব্দ নয়। মুদ্রাস্ফীতি কীভাবে বন্ধুত্বের উপর প্রভাব ফেলে এই শব্দটি মূলত আমাদের সেটিই বোঝায়। প্রতিদিনের খরচ বেড়েই চলেছে— ঘরভাড়ার চাপ, বাজারের লম্বা বিল, দেনা এবং ঋণের কিস্তি (EMI), এই সবকিছু মিটিয়ে এখন সকলের কাছে সামাজিক জীবনের জন্য খুব সামান্য অর্থই অবশিষ্ট থাকে। ফলে, সকলে বাধ্য হচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দিতে। এবং একাকিত্বে ভুগছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম।
শব্দটা শুনতে একটু খটমটে লাগলেও, এর প্রভাব আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কমবেশি পড়ছে। শুভ্রার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সব জায়গাতেই এখন একই ধরনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ৩৭% মানুষ জীবনযাত্রার বাড়তি খরচের কারণে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দিয়েছেন। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন স্বীকার করেছেন—বন্ধুত্ব বজায় রাখাটা বড্ড ব্যয়বহুল হয়ে যাওয়ায় তাঁরা সেই সম্পর্কই ভেঙে দিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের (UK) অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৭% মিলেনিয়াল (যাঁদের জন্ম ১৯৮১-৯৬ এর মধ্যে) এবং ৪২% জেন-জি (যাঁদের জন্ম ১৯৯৭-২০১২ এর মধ্যে) মনে করেন, তাঁদের আর্থিক অবস্থা সামাজিক মেলামেশার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের মতো দামি শহরগুলোতে যাঁরা থাকেন, তাঁদের জন্য এই সমস্যা আরও বেশি। ভারতের ক্ষেত্রেও মুম্বই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, কলকাতা ইত্যাদি বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়।
বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা এখন এক ধরনের বিলাসিতা। শহুরে জীবনে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে মানুষকে যে আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়, তা মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এর ফলে নিজের প্রতি হীনম্মন্যতা, লজ্জা, হিংসে বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে।
আর কেউ যখন বারবার বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বন্ধুদের আড্ডা এড়িয়ে যেতে থাকে, তখন সেই কারণগুলোকে অনেকেই অজুহাত হিসেবে ধরে নেন। তারা মনে করেন ওই ব্যক্তিটি হয়তো আর মিশতে চাইছেন না। এতে বন্ধুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে এবং মানুষ আরও বেশি একাকী হয়ে পড়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI impact on brain: এশিয়ান মিডিয়া ল্যাবের সাম্প্রতিকতম গবেষণা 'Your Brain on ChatGPT' র সমীক্ষা বলছে, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের সৃজনশীলতায় থাবা বসাচ্ছে।
তাই আপনিও যদি আপনার বন্ধুদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করেন বা মাঝেমধ্যে একাকিত্ব বোধ করেন, তবে এর জন্য এই আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতিকেও খানিকটা দোষ দেওয়া যেতে পারে।
বড় হওয়ার পরের বন্ধুত্ব মানে হলো আপনার প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন ধাপ পার করে এসেছেন। আপনার হয়তো স্কুলের এমন কিছু বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে বাইরে ঘুরতে বা কোনো কাজে মেতে থাকতে ভালো লাগে। আবার কলেজের দিনগুলোর সেই বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে একসময় ক্লাস ফাঁকি দিতেন, তারাই এখন হয়তো আপনার সঙ্গে দামী রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া বা ক্লাবে আড্ডা দিতে যান।
এরপর আসে কর্মজীবনের বন্ধুরা। তারা হয়ে ওঠেন আপনার অফিসের সবথেকে কাছের মানুষ বা 'অফিস স্পাউস'। কাজের চাপ বা বিরক্তি নিয়ে তাদের সঙ্গেই চলে এক কাপ দামী কফিতে চুমুক দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা—যদিও মাঝে মাঝে সেই কফিটা অত দামী হওয়ার যোগ্যই থাকে না!
আজকাল ভ্রমণের নেশা বা 'ট্র্যাভেল কালচার' যে হারে বাড়ছে, তাতে জেন-জি এবং মিলেনিয়ালরা সব সময় সেই বিশেষ ট্রিপটার অপেক্ষায় থাকে, যা শেষ পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ চ্যাট থেকে বাস্তবে রূপ নেবে। একঘেয়েমি কাটাতে বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছেটা এখন বেশ জোরালো, কিন্তু অনেক সময় পকেটের টান বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বন্ধুরা প্রায়ই হুটহাট কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং থাকার জন্য সাধারণত পাঁচতারা হোটেল বেছে নেন।
যখন বাজারে সবকিছুর দাম বাড়ে, তখন আমরা জানি যে চাল-ডাল, ঘরভাড়া বা গাড়ির তেলের খরচ আমাদের উপর চাপ তৈরি করবে। কিন্তু আমরা এটা আশা করি না যে আমাদের পরম প্রিয় বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলোও এক সময় দামী বা ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। দুর্ভাগ্যবশত, এখন ঠিক তেমনটাই ঘটছে। সঞ্চয় করার কথা ভাবলে মানুষ সাধারণত সবার আগে সামাজিক মেলামেশার খরচেই কোপ দেয়—আর এটাই খুব স্বাভাবিক।
এর কোপ শুধুমাত্র বন্ধুত্বে নয়, পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যেও। আজকের জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের ভাষায় বলতে গেলে—আপনি যদি ভাবেন যে বন্ধুদের আড্ডার ছবিতে নিজেকে না দেখে আপনার একটুও খারাপ লাগছে না, তবে আপনি আসলে 'ভুল ধারণার' (delulu) মধ্যে আছেন। বন্ধুদের সেই হাসাহাসিতে মেতে ওঠা, মনখোলা আড্ডা বা পেটে খিল ধরা মজার মুহূর্তগুলো বাদ যাওয়া কিন্তু মোটেও তুচ্ছ কোনো ক্ষতি নয়। এগুলো আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এমনভাবে প্রভাব ফেলে যা আপনি হয়তো ভাবতেও পারেন না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Reels Addiction: অতিরিক্ত রিলস দেখার প্রবণতা মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটায়। ফল, অমনোযোগী, ঘুমে সমস্যা, মানসিক অবসাদ, শর্ট টার্ম মেমোরি লস বা স্বল্পমেয়াদী স্মৃতিশক্তি হ্রাস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৫ সালের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে যে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজন একাকিত্বে ভুগেছেন। এই সমস্যাটি তরুণ প্রজন্ম এবং দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের উপর সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
রিপোর্টটিতে একাকিত্বের ভয়াবহতা তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৮,৭১,০০০ মানুষের মৃত্যুর নেপথ্যে এই একাকিত্বের যোগসূত্র ছিল। বিশ্বজুড়ে ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে একাকিত্বের মাত্রা সবথেকে বেশি দেখা গেছে। ধনী দেশগুলোর তুলনায় (যেখানে হার ১১%) নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই সমস্যা অনেক বেশি ছিল, সেখানে প্রায় ২৪% মানুষ একাকিত্বের শিকার হয়েছেন।
একটি সুস্থ সামাজিক জীবন মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। একাকিত্ব মানে সবসময় এমনটা নয় যে আপনার কথা বলার মতো কেউ নেই—মাঝে মাঝে এটি হলো সবার মাঝে থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করা। টানা কয়েক মাস বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা এড়িয়ে যাওয়ার পর, যখন শেষ পর্যন্ত আপনি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করবেন, তখনও আপনি এই বিচ্ছিন্নতা অনুভব করবেন।
বারবার বিনয়ের সঙ্গে বন্ধুদের আমন্ত্রণে 'না' বলার যে লজ্জা, তা বন্ধুত্বের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আমাদের সমাজে, যেখানে অনেক সময় মানুষের আর্থিক অবস্থাকেই তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বারবার আড্ডা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াটা আর অলক্ষ্যে থাকে না, সবার চোখে পড়তে শুরু করে।আপনার বন্ধুরা আপনার অনুপস্থিতিতে আপনাকে নিয়ে কী কথা বলছে, তা আপনাকে মানসিকভাবে অস্থির করে তুলবেই।
এই সমস্যার সমাধান কী?
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্বের শুরুতেই টাকা-পয়সার বিষয়ে খোলামেলা কথা বলা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে অপরাধবোধ, একে অপরের প্রতি ক্ষোভ বা ঋণের বোঝা এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়। ঠিক যেমন আমরা 'ফ্রেন্ডস' (Friends) -এ দেখেছিলাম—র্যাচেল, জোয়ি এবং ফিবি যখন অস্বস্তিতে পড়েছিলেন কারণ রস, মনিকা আর চ্যান্ডলার বারবার দামী দামী রেস্তোরাঁয় খাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রথমে তাঁরা বলতে দ্বিধা বোধ করলেও, পরে যখন খোলামেলা কথা বলে, তখন তাঁদের সমস্যা মিটে যায়।
'ফ্রেন্ডস' (friends)-এর একটি দৃশ্য
কাজেই কথাগুলো বলতে হবে খুব নম্রভাবে এবং কোনো ক্ষমা না চেয়েই—যাতে নিজের প্রতি হীনম্মন্যতা বা অতিরিক্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুর না থাকে। দামী আড্ডার বদলে পার্কে হাঁটা, বাড়িতে সবাই মিলে দেখা করা বা খাবার ভাগ করে খাওয়ার অভ্যেস গড়ে তোলা যেতে পারে। এমনকী মাসের শেষের দিকে একটু কম খরচের ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা করাও বেশ কার্যকর হতে পারে।
ঠিক একইভাবে, বন্ধুদের জন্যও এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁরা যেন তাঁদের বন্ধুকে বিচার না করে তাঁর পরিস্থিতি বোঝেন। যখন টাকা-পয়সা নিয়ে আলোচনাগুলো সম্মান ও আন্তরিকতার সঙ্গে করা হয়, তখন তা সম্পর্ক নষ্ট করার বদলে একে অপরের প্রতি ভরসা আরও বাড়িয়ে দেয়। সত্যিকারের বন্ধুরা সবটাই বোঝেন, তাই এই সম্পর্কগুলোকে সযত্নে আগলে রাখা প্রয়োজন। কারণ
'হর এক ফ্রেন্ড জরুরি হোতা হ্যায়'







