এআই গিলে খাচ্ছে জেন-জির ভাবনা!

AI impact on brain: এশিয়ান মিডিয়া ল্যাবের সাম্প্রতিকতম গবেষণা 'Your Brain on ChatGPT' র সমীক্ষা বলছে, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের সৃজনশীলতায় থাবা বসাচ্ছে।

inscript
৪ মিনিট
 এআই গিলে খাচ্ছে জেন-জির ভাবনা!

নব্য প্রযুক্তির মায়াজালে আবদ্ধ ‘জেন জি’। ক্রমাগত ai এর ব্যবহার তাঁদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডের গতি দ্রুততর করলেও, কমাচ্ছে মস্তিষ্ক প্রসূত সৃজনশীলতা, নিজস্বতা। এশিয়ান মিডিয়া ল্যাবের সাম্প্রতিকতম গবেষণা 'Your Brain on ChatGPT' র সমীক্ষা বলছে, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের সৃজনশীলতায় থাবা বসাচ্ছে। এই গবেষণায় ৫৪ জন জেন জি, যাঁরা অহর্নিশ চ্যাটজিপিটি ব্যাবহারে অভ্যস্ত, তাঁদের মস্তিষ্কের ইইজি স্ক্যান করে দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ফলে তাঁদের ফ্রন্টাল ও প্যারিয়েটাল লোবে ব্রেন অ্যাকটিভিটি অনেকাংশে কমেছে। মস্তিষ্কের এই অংশটি আমাদের মেমরি, রিজনিং আর অ্যাটেনশন নিয়ন্ত্রণ করে। ফল, সাধারণ আচার আচরণে ছন্দপতন। অন্যদিকে, দেখা গেছে যাঁরা নিজের মাথা খাটিয়ে কাজ করেন, তাঁদের নিউরাল কানেকটিভিটি অনেক বেশি শক্তিশালী।

এআই কমাচ্ছে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা

আমাদের মস্তিষ্ক খানিকটা পেশির মতো, যত ব্যবহার তত সরস। কিন্তু বর্তমানের 'এক ক্লিকে সমাধান' পাওয়ার সংস্কৃতি, মাথা খাটানোর চিরাচরিত পন্থা থেকে আমাদের বিমুখ করেছে। ফলে, এখন এআই-ই শেষ কথা। বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে চিহ্নিত করেছেন 'কগনিটিভ ডেট' (Cognitive Debt) হিসেবে। সহজ কথায়, আমরা যখন কোনো কাজ নিজে না করে এআই-কে দিয়ে করাই, তখন আমাদের নিউরাল কানেকশনগুলো অলস হয়ে পড়ে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই উদ্দেশ্যের ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে একসময় দেখা যাবে আমাদের ব্রেনের মাসলগুলি দীর্ঘদিনের অব্যবহারে শিথিল হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এআই স্রেফ আপনার কাজের সময়ই কমাচ্ছে না বরং কমাচ্ছে আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাও।

এই সংকটের ব্যাপ্তি কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের হোয়ার্টন (Wharton) সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৭৯ শতাংশেরই 'ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং' বা সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই তথ্য উঠে এসেছে মাইক্রোসফট-কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ স্টাডিতেও। তারা বলছে, জটিল সমস্যা সমাধানের চেয়ে শর্টকাট খোঁজার প্রবণতা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মেধাগতভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন তরুণ প্রজন্ম বারবার পেশা বদলাচ্ছে? দায়ী কে?

Gen Z Switiching jobs: বিদেশেও অফিস পলিটিক্স আছে, কিন্তু সেখানে শক্তিশালী নীতি, আইনি সুরক্ষা ও স্বচ্ছ পারফরম্যান্স ভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।

উনেস্কোর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই-এর প্রভাবে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে উত্তর বা কন্টেন্ট তৈরি করে, তা একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়া (Pattern-based)। ফলে মানুষের সৃজনশীলতা এখন আর অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে না, বরং অ্যালগরিদমের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. জ্যারেড কুনি হরভথ মনে করেন, জেন জি-ই হয়তো মানব ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম, যাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের (Millennials) তুলনায় অনেক কম হতে পারে। এআই-এর কারণে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কমছে এবং মানুষের সৃজনশীলতাও একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন,

এআই-কে পার্টনার হিসেবে ব্যবহার করুন, রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে নয়। এটি আপনার ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং কমায়, আপনাকে অলস করে।

সুতরাং এআই কখনোই আপনার স্ব-মস্তিষ্ক প্রসূত সৃজনশীলতার পরিপূরক হতে পারে না। এটি আপনার কর্মক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে ঠিকই কিন্তু বদলে আপনার অস্তিত্ব ও মৌলিকত্বকেই ম্লান করে দেয়। 'আর্টিফিশিয়াল' যখন 'অরিজিনালিটি' বা মৌলিকত্বের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন সমাজ ও সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

পরিশেষে, যন্ত্র কেবল উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করার এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা আজও একান্তই মানুষের। কৃত্রিমতাকে মৌলিকত্বের হন্তারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে আমাদের থামতে হবে। চিন্তা করার এবং গভীরভাবে ভাবার অভ্যাস পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তির দাস নয়, বরং একে নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্য হয়ে ওঠাই হোক এই প্রজন্মের লক্ষ্য।

অগত্যা, আর্টিফিশিয়ালকে অরিজিনালিটির মারক করে তোলার আগে থামুন।

ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।