এআই গিলে খাচ্ছে জেন-জির ভাবনা!
AI impact on brain: এশিয়ান মিডিয়া ল্যাবের সাম্প্রতিকতম গবেষণা 'Your Brain on ChatGPT' র সমীক্ষা বলছে, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের সৃজনশীলতায় থাবা বসাচ্ছে।
নব্য প্রযুক্তির মায়াজালে আবদ্ধ ‘জেন জি’। ক্রমাগত ai এর ব্যবহার তাঁদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডের গতি দ্রুততর করলেও, কমাচ্ছে মস্তিষ্ক প্রসূত সৃজনশীলতা, নিজস্বতা। এশিয়ান মিডিয়া ল্যাবের সাম্প্রতিকতম গবেষণা 'Your Brain on ChatGPT' র সমীক্ষা বলছে, এআই-এর অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের সৃজনশীলতায় থাবা বসাচ্ছে। এই গবেষণায় ৫৪ জন জেন জি, যাঁরা অহর্নিশ চ্যাটজিপিটি ব্যাবহারে অভ্যস্ত, তাঁদের মস্তিষ্কের ইইজি স্ক্যান করে দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের ফলে তাঁদের ফ্রন্টাল ও প্যারিয়েটাল লোবে ব্রেন অ্যাকটিভিটি অনেকাংশে কমেছে। মস্তিষ্কের এই অংশটি আমাদের মেমরি, রিজনিং আর অ্যাটেনশন নিয়ন্ত্রণ করে। ফল, সাধারণ আচার আচরণে ছন্দপতন। অন্যদিকে, দেখা গেছে যাঁরা নিজের মাথা খাটিয়ে কাজ করেন, তাঁদের নিউরাল কানেকটিভিটি অনেক বেশি শক্তিশালী।
এআই কমাচ্ছে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা
আমাদের মস্তিষ্ক খানিকটা পেশির মতো, যত ব্যবহার তত সরস। কিন্তু বর্তমানের 'এক ক্লিকে সমাধান' পাওয়ার সংস্কৃতি, মাথা খাটানোর চিরাচরিত পন্থা থেকে আমাদের বিমুখ করেছে। ফলে, এখন এআই-ই শেষ কথা। বিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে চিহ্নিত করেছেন 'কগনিটিভ ডেট' (Cognitive Debt) হিসেবে। সহজ কথায়, আমরা যখন কোনো কাজ নিজে না করে এআই-কে দিয়ে করাই, তখন আমাদের নিউরাল কানেকশনগুলো অলস হয়ে পড়ে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, এই উদ্দেশ্যের ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি হতে থাকলে একসময় দেখা যাবে আমাদের ব্রেনের মাসলগুলি দীর্ঘদিনের অব্যবহারে শিথিল হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এআই স্রেফ আপনার কাজের সময়ই কমাচ্ছে না বরং কমাচ্ছে আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাও।
এই সংকটের ব্যাপ্তি কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের হোয়ার্টন (Wharton) সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৭৯ শতাংশেরই 'ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং' বা সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। একই তথ্য উঠে এসেছে মাইক্রোসফট-কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ স্টাডিতেও। তারা বলছে, জটিল সমস্যা সমাধানের চেয়ে শর্টকাট খোঁজার প্রবণতা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মেধাগতভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gen Z Switiching jobs: বিদেশেও অফিস পলিটিক্স আছে, কিন্তু সেখানে শক্তিশালী নীতি, আইনি সুরক্ষা ও স্বচ্ছ পারফরম্যান্স ভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।
উনেস্কোর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই-এর প্রভাবে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে উত্তর বা কন্টেন্ট তৈরি করে, তা একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়া (Pattern-based)। ফলে মানুষের সৃজনশীলতা এখন আর অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে না, বরং অ্যালগরিদমের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. জ্যারেড কুনি হরভথ মনে করেন, জেন জি-ই হয়তো মানব ইতিহাসের প্রথম প্রজন্ম, যাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের (Millennials) তুলনায় অনেক কম হতে পারে। এআই-এর কারণে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কমছে এবং মানুষের সৃজনশীলতাও একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন,
এআই-কে পার্টনার হিসেবে ব্যবহার করুন, রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে নয়। এটি আপনার ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং কমায়, আপনাকে অলস করে।
সুতরাং এআই কখনোই আপনার স্ব-মস্তিষ্ক প্রসূত সৃজনশীলতার পরিপূরক হতে পারে না। এটি আপনার কর্মক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে ঠিকই কিন্তু বদলে আপনার অস্তিত্ব ও মৌলিকত্বকেই ম্লান করে দেয়। 'আর্টিফিশিয়াল' যখন 'অরিজিনালিটি' বা মৌলিকত্বের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে, তখন সমাজ ও সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়।
পরিশেষে, যন্ত্র কেবল উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন করার এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা আজও একান্তই মানুষের। কৃত্রিমতাকে মৌলিকত্বের হন্তারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আগে আমাদের থামতে হবে। চিন্তা করার এবং গভীরভাবে ভাবার অভ্যাস পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রযুক্তির দাস নয়, বরং একে নিয়ন্ত্রণ করার যোগ্য হয়ে ওঠাই হোক এই প্রজন্মের লক্ষ্য।
অগত্যা, আর্টিফিশিয়ালকে অরিজিনালিটির মারক করে তোলার আগে থামুন।
ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন।






