কুৎসিততম বিশ্বকাপ, শ্রমিকের মৃত্যু থেকে নানা ফতোয়া, যে নরক দেখাল কাতার
Fifa WorldCup, Qatar : বিশ্বকাপের এই এত আলোর তলায় রয়েছে ভয়ানক অন্ধকার

জ্বর সারছে ক্রমশ। আর মাত্র দুটো ডোজ, তার পরই মুক্তি। ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে চূড়ান্ত পর্বে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে চলেছে কোন দুই দল। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। প্লেয়াররা শেষবেলায় ঝালিয়ে নিচ্ছে সবটুকু ত্রুটি। সামনে ১৮ তারিখ লড়াই হবে জানকবুল। বিশ্বকাপ শব্দটির ব্যাখ্যা বোধ হয় অসম্ভব। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ঘোরতর এক আবেগ। গত এই এক মাস জুড়ে শিরোনাম দখল করে রাজ করেছে ফুটবল। প্রতিটি খেলার ওঠা নামা, সিদ্ধান্তের ঠিক ভুল, সাউন্ড, লাইট, মাঠ, বিশ্বকাপের বল, এমনকী রেফারি হাতের ওই ঘড়িটিকে নিয়েও আলোচনা হয়েছে প্রচুর।
মেসি, লুকা, রোনাল্ডোর মতো হেভি ওয়েট খেলোয়াড়দের শেষ বিশ্বকাপ এটিই। তাই প্রথম থেকে এ নিয়ে গুঞ্জন। বিশ্বকাপের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল সাংবাদিক কলাম। ম্যাচ শুরুর পর তাতে আরও বাড়তি সংযোজন হবে এটা তো কাম্যই ছিল। কাতার বিশ্বকাপের পরতে পরতে বিতর্ক। রক্ষণশীল আইন থেকে শুরু করে খেলার নিয়মাবলী, আয়োজন থেকে শুরু করে শাস্তি সবকিছুই উঠে এসেছে শিরোনামে। ইভানা নলের পোশাক নিয়ে তোলপাড় কিংবা ম্যাচ চলাকালীন সাংবাদিকের মৃত্যু, কী না দেখলো কাতারের ময়দান।
তবে এ সব নিয়েই কমবেশি আলোচনা হয়েছে, হচ্ছেও। বিশ্বকাপের কোনও ঘটনাই তো তুচ্ছ নয়। তাই যেখানে যতটুকু ফিকির মিলেছে সব নিয়ে পর্যালোচনার ঝড় উঠেছে নিয়ত। আসলে একবার ওই খেলা শুরুর বাঁশি বেজে যাওয়া মানেই সিনেমা শুরু। তখন প্রতিটা মুহূর্তই আলোর খুব কাছাকাছি। তখন পান থেকে চুন খসা মাত্রই প্রচার পেয়েছে সবকিছু। কিন্তু যে একটা বিশ্বকাপ, এত উচ্ছাস, এত আবেগ, এত আলো, এই এত এত আয়োজন তার ভিড়ে কোথাও চাপা পড়ে যাচ্ছে না তো নির্মম অতীত?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
World Cup Football Final 2022: আর্জেন্টিনা নিয়ে তিনি বলে রেখেছিলেন, প্রথম দিকে ভালো না খেললেও এবারের বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলবেই আর্জেন্টিনা। আর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে ফ্রান্স!
কিছুদিন আগেই গ্রান্ট ওয়াল নামের এক মার্কিন সাংবাদিকের আকস্মিক মৃত্য নিয়ে রহস্য জট পাকে কাতারের ময়দানে। কাতারের মতো রক্ষণশীল একটু দেশে সমকামিতাকে সমর্থন করে রামধনু রঙের জামা পড়া নিয়ে তার আগে থেকেই বিতর্কে জড়িয়েছিলেন সাংবাদিক। সেই বিতর্ক স্তিমিত হয়ে না হতেই হঠাৎ আর্জেন্টিনা বনাম নেদারল্যান্ডসের ম্যাচ চলাকালীন লুসাইল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। এ মৃত্য ঘিরে জল্পনা এখনও কাটেনি। গ্রান্ট ওয়ালের ভাই এরিক ওয়াল তো সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্টই দাবি করেছেন তাঁর দাদার মৃত্যুর জন্য দায়ী খোদ কাতার সরকার।
এই ঘটনার ঘা শুকোতে না শুকোতে আবারও এক আকস্মিকতায় সাক্ষী হল কাতারের ময়দান। গ্রান্ট ওয়ালের পর মৃত্যু হল আরও এক সাংবাদিকের। বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়েই মৃত্যু হয় তাঁর। কাতারের আল কাস নামের একটি টিভি চ্যানেলের চিত্র সাংবাদিক ছিলেন এই খালিদ আল-মিসলাম। তাঁর মৃত্যুর কোনও কারণ এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনা গ্রান্ট ওয়ালের মৃত্যু রহস্যকে আবারও উস্কে দিয়েছে।
তবে এ তো নতুন কিছু নয়, বিতর্ক ছিল অনেক আগে থেকেই। গত কয়েক বছরে হাজার হাজার মজুরের রক্তের হিসেব কি ইতিমধ্যেই কষেনি সারা বিশ্ব? কবি নজরুল ইসলামের তাঁর কবিতায় আগেই বলে গিয়েছিলেন, “তোমার অট্টালিকা,/কার খুনে রাঙা? ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লেখা”। কাতার বিশ্বকাপের এই এট জাঁকজমকের আড়ালে হাজার হাজার শ্রমিক মৃত্যুর নির্মম যে সত্যি তা যেন আবার জীবন্ত করে দেয় পংক্তিটিকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Fifa World Cup : ক্রোয়েশিয়া জিততে পারেনি ম্যাচে কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে ইভানা নামক দাগটি রয়েছে স্পষ্ট
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্যা গার্ডিয়ান’ -এর একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে ভয়াবহ সমীকরণ। তাদের দাবি, গত দশ বছরে কাতার বিশ্বকাপের প্রস্তুতির কাজে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি প্রবাসীর। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১২ জনের মৃত্যু। সব মিলিয়ে এ বিশ্বকাপের খরচ প্রায় ২২ হাজার কোটি ডলার। খরচের হিসেবে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে কাতার। অংশগ্রহনকারী ৩২টি দেশের জন্যই বিশাল আয়োজন। উপচে পড়া পুরস্কারের হিড়িক। লাখ লাখ টাকার ঘড়ি, বুট, জার্সি, কী নেই! টাকা যেন খোলা ময়দানে উড়ছে, কেবল ধরতে পারছে না ছাপোষা খেটে খাওয়া মানুষের দল।বিশ্বকাপে প্রাচুর্যের এমন ঝলসানি থাকলেও এই শ্রমিকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের ন্যায্য মজুরিটুকুও পাননি। জাঁকজমকের নিচে চাপা পড়ে গেছে শ্রমিকদের মৃত্যু ও অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি। ২০১১ থেকে ২০২০ সাল, গত এই এক দশক জুড়ে নির্মম সত্যের সম্মুখীন হয়েছেন বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, ফিলিপাইনি ও কেনিয়ার মতো দেশের হাজার হাজার শ্রমিক। সার্বিক তথ্য ঘেঁটে বলা যায়, এই দশ বছরে শুধু বাংলাদেশি শ্রমিকই মারা গেছেন প্রায় ১০১৮ জন।
আসন্ন বিশ্বকাপকে সামনে রেখে একগাদা প্রকল্পের পরিকল্পনা করে কাতার সরকার। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আটটি স্টেডিয়াম নির্মাণ, বিমানবন্দর পরিবর্ধন এবং একশোটির মতো নতুন হোটেল তৈরি করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে নতুন মেট্রো ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে ভেন্যু সংলগ্ন সড়ক ও রেলপথেরও উন্নয়ন করা হয়েছে। চূড়ান্ত ম্যাচের স্টেডিয়াম ঘিরে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি নতুন শহর। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৩ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থ। এরপরও তাক লাগানো এই আয়োজনকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আখ্যা দিয়েছে ‘উত্তেজনাপূর্ণ, প্রাচুর্যময় এবং মারাত্মক’ হিসেবে। প্রথম দুটি বিশেষণের কারণ সহজেই অনুমেয় হলেও শেষের বিশেষণটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Fifa World cup 2022 : বিশ্বকাপের ময়দানই যেন অতিসাধারণ এক ফুটবলকে নিমেষের মধ্যে করে দিলো হাইটেক
এই নতুন স্টেডিয়াম, নতুন বিমানবন্দর, ঝাঁ চকচকে রাস্তা, আলো, সড়ক, হোটেল, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সব কিছু নিয়ে যে মহাযজ্ঞ, তা সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হাজার হাজার শ্রমিক শ্রেণীর। যাদের কাঁধে ভর দিয়েই সম্ভব এমন ইমারত। কিন্তু তাদেরই এমন নির্মম পরিণতি?
২৩ লক্ষ কোটি টাকার সিংহভাগ অর্থই কাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে, কেউ ফিরেও তাকায়নি শ্রমিক শ্রেণীর দিকে। আজকের ময়দানের এই এতো জৌলুস তো দুম করে আসেনি। কিন্তু স্থাপত্যের পেছনে থাকা এই হাজার হাজার শ্রমিক এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকা হাজার হাজার পরিবারের দায় কি নিয়েছে সরকার? আজ যখন কাতারের ময়দানে এতো আলো তখন তো অন্ধকারের নির্যাসটুকু বিয়ে বেড়াচ্ছে কেবল ওরাই। অথচ এমন শ্রেণীর মানুষদের নিয়ে আলোচনাই হচ্ছে কই? কাতার সরকার পারেনি তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে। এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানবেতর আবাসন ব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক চুক্তি, এবং সর্বোপরি শ্রমিকদের অধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।
কাতারে শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আগেই, ভোট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও ছিল আগে থেকেই, সঙ্গে ছিল আজকের সময়ে দাঁড়িয়েও এমন পিছিয়ে পড়া রক্ষণশীল মনোভাব এবং তার নিরিখে কঠোর শাস্তির ফতোয়া। এর ওপর যেন ঘৃতাহুতির মতো এসে দাঁড়ায় শ্রমিক মৃত্যুর নির্মম সমীক্ষাটি।
ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে যখন গোটা বিশ্ব এখন প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছে, যখন উচ্ছাসার উন্মাদনায় ফেটে পড়ছে দুনিয়া তখনই হয়তো চোখের জল মুছছে একটি শ্রমিক পরিবার। এমন আয়োজনের জাঁকজমকের কাছে তাদের স্বজন হারানোর কান্না কি এতটাই মেকি ঠেকছে?







