যত দূরেই যাই, মণিদা থেকে যাই না

গৌতমের নাম কিন্তু 'মণি' নয়। অথচ অনেকেই তাকে 'মণি' বলে উদ্ধৃত করেছে। সর্বোপরি তাঁর সম্পর্কে লেখা একটি রচনায় দেখলাম মণিদার গানের লাইনকে ভেঙে শিরোনাম করা হয়েছে 'মণি ছাড়া শূন্য লাগে'। অবাক কান্ড! আসলে 'মণি' শব্দটির এখানে একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে।

Ladly Mukhopadhaya
৪ মিনিট
যত দূরেই যাই, মণিদা থেকে যাই না

পয়লা জুন তাঁর জন্মদিন। আর ঠিক জুনেই কেন লিখতে শুরু করলাম? জানি না। আমরা তথাকথিত 'জুন বয়েজ' বলে? তাও জানি না। এমনকী বরিশালিয়া কারণে কি না, তাও জানি না। বিগত পাঁচটি দশক ধরে তাঁর ব্যতিক্রমী জীবন ও কর্মের ছায়া আমাকে ঘিরে আছে বলে? না, তাও জানি না।

আসলে বহু বছর ধরে শুধু জন্মদিন নয়, প্রতিটি দিন-প্রতিদিন আমার কাছে রাগ বিস্তারে ধীর লয়ের বন্দিশের মতো বেজে চলেছে ক্রমাগত, অবিরত। তাঁকে কিছুতেই উপেক্ষা করা যায়নি, হয়তো চেষ্টাও করিনি। সে সঙ্গসুখ শুধু যে আনন্দময় তা নয়; এ যেন আত্মজৈবনিক শিক্ষার প্রকৃতিকে এক অমোঘ নিয়ন্ত্রণে বেঁধে রেখেছে—শৈশব থেকে বার্ধক্যের সিঁড়ি পর্যন্ত।

তাঁকে নিয়ে তো লিখতেই হবে। লিখতে হবে তাঁর সমান্তরাল জীবন আর আমার বেড়ে ওঠা নিয়ে। এর মধ্যে কোনো পাথুরে তথ্য বা তত্ত্ব নেই। গল্প আছে, আছে দিনযাপনের বর্ণমালা। তাঁকে নিয়েই এই লেখার আয়োজন যাঁর জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতার ঠিক দু বছর পরে (১৯৪৯)। এই ধারাবাহিকের মূল প্রতিপাদ্য মায় কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলো কিংবদন্তি কথাকার, সুরকার, গায়ক ও চলচ্চিত্রকার গৌতম চট্টোপাধ্যায়। আমরা অনেকেই তাঁকে মণিদা বলে সম্বোধন করতাম।

এই প্রস্তাবিত ধারাবাহিক রচনায় এই সম্বোধনই আসবে ঘুরেফিরে। এখানে জানানো দরকার গৌতমের নাম কিন্তু 'মণি' নয়। অথচ অনেকেই তাকে 'মণি' বলে উদ্ধৃত করেছে। সর্বোপরি তাঁর সম্পর্কে লেখা একটি রচনায় দেখলাম মণিদার গানের লাইনকে ভেঙে শিরোনাম করা হয়েছে 'মনি ছাড়া শূন্য লাগে'। অবাক কান্ড! আসলে 'মণি' শব্দটির এখানে একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে। তা হলো, আমাদের পূর্ববঙ্গের পারিবারিক সম্পর্কে অনেক ভাইদের মধ্যে চিহ্নিত করা হয় বড়দা, মেজদা, মণিদা, সোনাদা, নদা ইত্যাদির ডাকনামে। এখানে সেভাবেই মণিদা এসেছে। এসেছে ওঁর পরিবার থেকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মনিদার বানানো সিনেমাগুলো দেখতেই পেল না নতুন প্রজন্ম

মনিদার করা সেলুলয়েডের কিছুই কি সত্যিই কখনও নতুন প্রজন্ম দেখতে পাবে না? ভাগ্যের ওপর কোনওদিন আস্থা রাখিনি, কিন্তু 'দুর্ভাগ্য' শব্দটিকেও অভিধানের বাইরে রাখতে পারিনি। মনিদার ক্ষেত্রে 'দুর্ভাগ্য' শব্দটা প্রায়ই ইতিউতি ঘুরে-ফিরে আসে। বড় মন খারাপ করে দেয়।

প্রকৃতপক্ষে না জেনে কথালাপ ও অজস্র অজ্ঞান শব্দপ্রপাত ক্রমে মণিদার প্রকৃত পরিচয় থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

হয়তো সমস্ত বিখ্যাত মানুষজনের ক্ষেত্রেই এই গুরুচণ্ডালী দোষ কমবেশি হয়েই থাকে। কিন্তু মণিদা আজও এক মস্ত ইতিহাস। আর তা কি তাঁর মৃত্যুর সাতাশ বছর কাটতে না কাটতেই নিদারুণ এক অনৈতিহাসিক চর্চার চোরাস্রোত আর বাঁকা পথে ধস্ত হবে, মিথ্যাচর্চার শামিল হবে? তা তো হতে পারে না। হতে পারে না বলেই একটা আন্তরিক দায় থেকে লিখতে শুরু করেছি।

তবে এটাও লিখে রাখা ভালো যে, আমি কোনো ইতিহাসকার নই। কোনো জীবনী লেখার তেমন দায়ও আমার নেই। আমি শুধু জানাতে চাই তাঁর সঙ্গে দশকের পর দশক এক প্রগাঢ় সম্পর্কের হিরন্ময় অভিজ্ঞতার কথা। প্রত্যক্ষ যোগাযোগের ভিত্তিতে গানবাজনা ও সিনেমার খুঁটিনাটি শেখার রাত কিবা দিনমান বা বলা যায় সবিস্তারে প্রায়োগিক এক ভিন্ন ধরনের জীবনকে দেখা, শেখা। প্রাথমিকভাবে এইটুকুই; আর হ্যাঁ, এই সম্পর্কের নিমিত্ত কিছু অসাধারণ ভালোমন্দের গল্প বিস্তার।

এখানে প্রশ্নাকারে আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে লিখতে গেলে কি মূল্যায়নের নামে শুধুই প্রশংসা আর ব্যাজস্তুতি লিখতে হবে? ভালো-মন্দের মানুষ, সঠিক-বেঠিক মানুষ নিয়ে কি কিছু লেখা যাবে না? আপৃথ্বির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দেখা গিয়েছে মহামতি চার্লি চ্যাপলিন থেকে মাক্সিম গোর্কি, মধুসুদন দত্ত থেকে বোদলেয়্যর, রবীন্দ্রনাথ থেকে জাঁ জেনে, রবসন থেকে জিম মারিসন—সমস্ত ব্যক্তিত্বের মধ্যেই আলো আর কালো দুই-ই আছে।। তবে? না, কেউ লিখতে বারণ করেনি। কিন্তু আমরা যে আমোদগেঁড়ে বাঙালি।

ভিন্ন কথা, বাঁকা কথা শুনতেই চাই না। বলে ফেললেই 'গেল গেল' রব। জামাকাপড় যেন নষ্ট হয়ে গেল। গেল তো যাক। সেক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই। তোমরা যা বলো তাই বলো,

আমি আমার কথা লিখব।

আসলে এই দুনিয়ার কোনো ইতিহাসই শুধু অগ্রগতি আর জয়ের পথে সুনিশ্চিত হয়নি। সে পথে যেমন অনিশ্চয়তার কালো মেঘ থাকে, থাকে চমক-চমকানির বক্র দৃষ্টি, এমনকী থাকে পিছন থেকে ল্যাঙ মারার মারপ্যাঁচও। তার সমস্তটাই গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে না হলেও,তাঁর এই ইতিহাস হয়ে ওঠা বা নিজেকে গড়ে তোলা খুব সোজা-সরল ছিল না। আর তা না থাকারই কথা। কারণ নন-কনফর্মিস্ট জীবন, ব্যতিক্রমী বাংলা গান আর ভিন্নধর্মী সিনেমাকে যিনি যাপনের চালিকাশক্তি হিসেবে জীবনের শেষতক বাজি রেখেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিক লড়াই তো সহজ-সরল না হওয়ারই কথা।

মণিদা যেমন বামপন্থার আলোকিত সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে রাজনীতিকেই প্রথম জীবনে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তেমনই ভারতীয় মূল ধারার বামপন্থী রাজনীতির চরম বিরোধী ছিলেন। একটা সময় মণিদা রহস্যবাদী দার্শনিক গুরু ও সুরকার গুর্জিয়েফের ভক্ত হয়ে পড়েন। যা আমার কাছে শুধু বিস্ময়কর নয়, বেশ খানিকটা চৈতন্যের স্বমূলে ধাক্কা ছিল বলা যেতে পারে। এমন একজন নৈরাজ্যবাদী দার্শনিককে গুরু মানা নিয়ে কথা হয়েছে, তর্কও হয়েছে। তবে এই মায়াময় বিস্মৃতিলেকে পৌঁছাতে চাইলেও মণিদা রাজনীতির সমসাময়িকতার প্রেরণায় সব সময়েই উজ্জীবিত ছিলেন। সে বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় ছিল না।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কাবুলিওয়ালার ঋণ থেকে জন্ম মহীনের ঘোড়াগুলির

Gautam Chattopadhyay: মনে পড়ছে মহীনের ঘোড়াগুলির প্রথম রেকর্ডের সময়ের কথা। গল্প নয়, তথ্য লিখি। রেকর্ড নির্মাণ তখন অসম্ভব ব্যয়সাপেক্ষ। এদিকে প্রায় বেকারের একটা দল গান বাঁধছে, দল করছে। তো রেকর্ডিংয়ের সেই অর্থ আসবে কোথা থেকে?

মহীনের ঘোড়াগুলির গল্প: যেভাবে বদলে গিয়েছিল বাংলা গানের ধারা

Gautam Chattopadhyay: বাউল, ফকির, ছাদপেটার গান, কল কিংবা পাইপ বসানোর সুর, যাত্রাপালা থেকে রামায়ণের ভাব, বাঁদর নাচানোর গান আর ডুগডুগির তাল থেকে প্রার্থনা সংগীত কিংবা হিজড়েদের গান—সব, সব ঢুকে পড়েছিল মণিদার সৃষ্টিতে।

বাংলা গানকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে পৌঁছে দিয়েছিলেন মণিদা

Gautam Chattopadhyay: মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে মণিদা বেহালা স্কুলের বাংলা মিডিয়াম থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ হয়ে সারা পৃথিবীর সংগীত ভুবনের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। এটা বলার কারণ স্বদেশ ও বিদেশ মিলিয়ে একজন সংগীত নির্মাতা হিসেবে সংগীত বিশেষজ্ঞদের কাছে লাগাতার তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর থাকত।

মণিদা: যে মানুষটি ভাঙতে শিখিয়েছিলেন সব প্রচলিত নিয়ম

Gautam Chattopadhyay: আর এন মুখার্জি রোডের এক জায়গায় একটা করে টোস্ট খেয়ে আবার ট্যাক্সি ধরার চেষ্টা চলছে। এমন সময় একটা ট্যাক্সি পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। আমি আর মণিদা দুজনেই হাঁক পাড়লাম। সে গ্রাহ্য না করে এগিয়ে যেতেই মণিদা চিৎকার করে বলে উঠল, “এই শুয়োরের বাচ্চা!” ট্যাক্সিটা ফুটকয়েক এগিয়ে বিরাট শব্দে ব্রেক কষল।

মাঝরাতে ট্যাক্সি নিয়ে বন্ধুদের বাড়িতে পৌঁছে যেতেন মণিদা

Gautam Chattopadhyay: যত রাত্রিই হোক, মণিদা কিন্তু বাড়ি ফিরে যেতেন। অনেকেই তাঁকে বোহেমিয়ান বা ভবঘুরে বলে ইদানীং শনাক্ত করতে চান। তা কোনোমতেই ঠিক নয়। যথেষ্ট রোজগার না থাকা সত্ত্বেও মণিদা সংসার ও পরিবারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিলেন। বলতেন, "গান করতে হলে বা সিনেমা করতে হলে একটা ডিসিপ্লিনের দরকার। যেভাবে প্রতিটি মাধ্যমের নিজস্ব একটা শৃঙ্খলা আছে, আছে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন।"

গানের নতুন ব্যাকরণ লিখেছিল মহীনের ঘোড়াগুলি, বুঝতে লেগেছে অর্ধশতাব্দী

Gautam Chattopadhyay: একথা স্বীকার করতেই হবে যে, সলিল চৌধুরী-পরবর্তী এই গান এমন একটা অবস্থা ক্রমে তৈরি করেছে, যা অনেকানেক গায়কদের উদ্বুদ্ধ করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে। কয়েক যুগ পরেও ব্যান্ডের দল মঞ্চে উঠে ঘোড়াগুলির গান গাইছে অহরহ। হয়তো সময় লেগেছে, সময় লাগছে।

'গান করে অর্থের আশা করিস না'— মহীনের ঘোড়াগুলিকে বলেছিলেন মোহিনী মোহন চৌধুরী

Mohiner Ghoraguli Gautam Chattopadhyay: এক আড্ডায় জেনেছিলাম প্রখ্যাত গীতিকার মোহিনী মোহন চৌধুরী ছিলেন মণিদার সম্পর্কে মেসোমশাই। ইনি সেই মোহিনী চৌধুরী যিনি 'মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান' বা 'পৃথিবী আমারে চায়'-এর মতো কালজয়ী গান লিখেছিলেন। এক ঘরোয়া আলোচনায় মোহিনীবাবু মণিদাদের (মহীনের ঘোড়াগুলি) নাকি বলেছিলেন যে, 'গান করে অর্থ প্রত্যাশা করিস না। ভবিষ্যতে যদি বিনিময়ে কিছু আসে তা হবে উপরি পাওনা।'

যেখানে সাহিত্য মিশেছিল সুরে: মণিদার ‘ইন সার্চ অফ দুয়েন্দে’

Gautam Chattopadhyay: একটা-দুটো কথার পর মণিদা বলল, "একটা নতুন প্রজেক্ট ভাবছি। ভাবছি দুয়েন্দে নিয়ে একটা কাজ করব।" আমি শুনে তো ছিটকে গেলাম! দুয়েন্দে নিয়ে কাজ—কী সংঘাতিক বিষয়! বিষয়টা মণিদা তার মতো করে বুঝিয়ে বলল।