যত দূরেই যাই, মণিদা থেকে যাই না
গৌতমের নাম কিন্তু 'মণি' নয়। অথচ অনেকেই তাকে 'মণি' বলে উদ্ধৃত করেছে। সর্বোপরি তাঁর সম্পর্কে লেখা একটি রচনায় দেখলাম মণিদার গানের লাইনকে ভেঙে শিরোনাম করা হয়েছে 'মণি ছাড়া শূন্য লাগে'। অবাক কান্ড! আসলে 'মণি' শব্দটির এখানে একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে।
পয়লা জুন তাঁর জন্মদিন। আর ঠিক জুনেই কেন লিখতে শুরু করলাম? জানি না। আমরা তথাকথিত 'জুন বয়েজ' বলে? তাও জানি না। এমনকী বরিশালিয়া কারণে কি না, তাও জানি না। বিগত পাঁচটি দশক ধরে তাঁর ব্যতিক্রমী জীবন ও কর্মের ছায়া আমাকে ঘিরে আছে বলে? না, তাও জানি না।
আসলে বহু বছর ধরে শুধু জন্মদিন নয়, প্রতিটি দিন-প্রতিদিন আমার কাছে রাগ বিস্তারে ধীর লয়ের বন্দিশের মতো বেজে চলেছে ক্রমাগত, অবিরত। তাঁকে কিছুতেই উপেক্ষা করা যায়নি, হয়তো চেষ্টাও করিনি। সে সঙ্গসুখ শুধু যে আনন্দময় তা নয়; এ যেন আত্মজৈবনিক শিক্ষার প্রকৃতিকে এক অমোঘ নিয়ন্ত্রণে বেঁধে রেখেছে—শৈশব থেকে বার্ধক্যের সিঁড়ি পর্যন্ত।
তাঁকে নিয়ে তো লিখতেই হবে। লিখতে হবে তাঁর সমান্তরাল জীবন আর আমার বেড়ে ওঠা নিয়ে। এর মধ্যে কোনো পাথুরে তথ্য বা তত্ত্ব নেই। গল্প আছে, আছে দিনযাপনের বর্ণমালা। তাঁকে নিয়েই এই লেখার আয়োজন যাঁর জন্ম হয়েছিল স্বাধীনতার ঠিক দু বছর পরে (১৯৪৯)। এই ধারাবাহিকের মূল প্রতিপাদ্য মায় কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হলো কিংবদন্তি কথাকার, সুরকার, গায়ক ও চলচ্চিত্রকার গৌতম চট্টোপাধ্যায়। আমরা অনেকেই তাঁকে মণিদা বলে সম্বোধন করতাম।
এই প্রস্তাবিত ধারাবাহিক রচনায় এই সম্বোধনই আসবে ঘুরেফিরে। এখানে জানানো দরকার গৌতমের নাম কিন্তু 'মণি' নয়। অথচ অনেকেই তাকে 'মণি' বলে উদ্ধৃত করেছে। সর্বোপরি তাঁর সম্পর্কে লেখা একটি রচনায় দেখলাম মণিদার গানের লাইনকে ভেঙে শিরোনাম করা হয়েছে 'মনি ছাড়া শূন্য লাগে'। অবাক কান্ড! আসলে 'মণি' শব্দটির এখানে একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে। তা হলো, আমাদের পূর্ববঙ্গের পারিবারিক সম্পর্কে অনেক ভাইদের মধ্যে চিহ্নিত করা হয় বড়দা, মেজদা, মণিদা, সোনাদা, নদা ইত্যাদির ডাকনামে। এখানে সেভাবেই মণিদা এসেছে। এসেছে ওঁর পরিবার থেকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মনিদার করা সেলুলয়েডের কিছুই কি সত্যিই কখনও নতুন প্রজন্ম দেখতে পাবে না? ভাগ্যের ওপর কোনওদিন আস্থা রাখিনি, কিন্তু 'দুর্ভাগ্য' শব্দটিকেও অভিধানের বাইরে রাখতে পারিনি। মনিদার ক্ষেত্রে 'দুর্ভাগ্য' শব্দটা প্রায়ই ইতিউতি ঘুরে-ফিরে আসে। বড় মন খারাপ করে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে না জেনে কথালাপ ও অজস্র অজ্ঞান শব্দপ্রপাত ক্রমে মণিদার প্রকৃত পরিচয় থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
হয়তো সমস্ত বিখ্যাত মানুষজনের ক্ষেত্রেই এই গুরুচণ্ডালী দোষ কমবেশি হয়েই থাকে। কিন্তু মণিদা আজও এক মস্ত ইতিহাস। আর তা কি তাঁর মৃত্যুর সাতাশ বছর কাটতে না কাটতেই নিদারুণ এক অনৈতিহাসিক চর্চার চোরাস্রোত আর বাঁকা পথে ধস্ত হবে, মিথ্যাচর্চার শামিল হবে? তা তো হতে পারে না। হতে পারে না বলেই একটা আন্তরিক দায় থেকে লিখতে শুরু করেছি।
তবে এটাও লিখে রাখা ভালো যে, আমি কোনো ইতিহাসকার নই। কোনো জীবনী লেখার তেমন দায়ও আমার নেই। আমি শুধু জানাতে চাই তাঁর সঙ্গে দশকের পর দশক এক প্রগাঢ় সম্পর্কের হিরন্ময় অভিজ্ঞতার কথা। প্রত্যক্ষ যোগাযোগের ভিত্তিতে গানবাজনা ও সিনেমার খুঁটিনাটি শেখার রাত কিবা দিনমান বা বলা যায় সবিস্তারে প্রায়োগিক এক ভিন্ন ধরনের জীবনকে দেখা, শেখা। প্রাথমিকভাবে এইটুকুই; আর হ্যাঁ, এই সম্পর্কের নিমিত্ত কিছু অসাধারণ ভালোমন্দের গল্প বিস্তার।
এখানে প্রশ্নাকারে আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে লিখতে গেলে কি মূল্যায়নের নামে শুধুই প্রশংসা আর ব্যাজস্তুতি লিখতে হবে? ভালো-মন্দের মানুষ, সঠিক-বেঠিক মানুষ নিয়ে কি কিছু লেখা যাবে না? আপৃথ্বির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দেখা গিয়েছে মহামতি চার্লি চ্যাপলিন থেকে মাক্সিম গোর্কি, মধুসুদন দত্ত থেকে বোদলেয়্যর, রবীন্দ্রনাথ থেকে জাঁ জেনে, রবসন থেকে জিম মারিসন—সমস্ত ব্যক্তিত্বের মধ্যেই আলো আর কালো দুই-ই আছে।। তবে? না, কেউ লিখতে বারণ করেনি। কিন্তু আমরা যে আমোদগেঁড়ে বাঙালি।
ভিন্ন কথা, বাঁকা কথা শুনতেই চাই না। বলে ফেললেই 'গেল গেল' রব। জামাকাপড় যেন নষ্ট হয়ে গেল। গেল তো যাক। সেক্ষেত্রে আমার কিছু করার নেই। তোমরা যা বলো তাই বলো,
আমি আমার কথা লিখব।
আসলে এই দুনিয়ার কোনো ইতিহাসই শুধু অগ্রগতি আর জয়ের পথে সুনিশ্চিত হয়নি। সে পথে যেমন অনিশ্চয়তার কালো মেঘ থাকে, থাকে চমক-চমকানির বক্র দৃষ্টি, এমনকী থাকে পিছন থেকে ল্যাঙ মারার মারপ্যাঁচও। তার সমস্তটাই গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে না হলেও,তাঁর এই ইতিহাস হয়ে ওঠা বা নিজেকে গড়ে তোলা খুব সোজা-সরল ছিল না। আর তা না থাকারই কথা। কারণ নন-কনফর্মিস্ট জীবন, ব্যতিক্রমী বাংলা গান আর ভিন্নধর্মী সিনেমাকে যিনি যাপনের চালিকাশক্তি হিসেবে জীবনের শেষতক বাজি রেখেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিক লড়াই তো সহজ-সরল না হওয়ারই কথা।
মণিদা যেমন বামপন্থার আলোকিত সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে রাজনীতিকেই প্রথম জীবনে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তেমনই ভারতীয় মূল ধারার বামপন্থী রাজনীতির চরম বিরোধী ছিলেন। একটা সময় মণিদা রহস্যবাদী দার্শনিক গুরু ও সুরকার গুর্জিয়েফের ভক্ত হয়ে পড়েন। যা আমার কাছে শুধু বিস্ময়কর নয়, বেশ খানিকটা চৈতন্যের স্বমূলে ধাক্কা ছিল বলা যেতে পারে। এমন একজন নৈরাজ্যবাদী দার্শনিককে গুরু মানা নিয়ে কথা হয়েছে, তর্কও হয়েছে। তবে এই মায়াময় বিস্মৃতিলেকে পৌঁছাতে চাইলেও মণিদা রাজনীতির সমসাময়িকতার প্রেরণায় সব সময়েই উজ্জীবিত ছিলেন। সে বিষয়ে আমাদের কোনো সংশয় ছিল না।





