মনিদার বানানো সিনেমাগুলো দেখতেই পেল না নতুন প্রজন্ম

মনিদার করা সেলুলয়েডের কিছুই কি সত্যিই কখনও নতুন প্রজন্ম দেখতে পাবে না? ভাগ্যের ওপর কোনওদিন আস্থা রাখিনি, কিন্তু 'দুর্ভাগ্য' শব্দটিকেও অভিধানের বাইরে রাখতে পারিনি। মনিদার ক্ষেত্রে 'দুর্ভাগ্য' শব্দটা প্রায়ই ইতিউতি ঘুরে-ফিরে আসে। বড় মন খারাপ করে দেয়।

Ladly Mukhopadhaya
৩ মিনিট
মনিদার বানানো সিনেমাগুলো দেখতেই পেল না নতুন প্রজন্ম

যে কোনও মানুষকে কাছ থেকে দেখার যেমন কিছু সুবিধা আছে তেমন অসুবিধাও আছে। কাছ থেকে দেখার প্রথম সুবিধাটা হলো যে, তা পুরোটাই আমার ব্যক্তিগত জানা-বোঝা। সেখানে ভালো-মন্দ নিক্তি দিয়ে মাপতে হবে না। উল্টো দিকে, এই কাছ থেকে দেখার বিপদ হলো, তা নিয়ে যদি বলতে বা লিখতে যাই, তাহলে আবার সকলের সঙ্গে একমত হওয়া যাবে না। সেখানে তখন চলে আসবে একেক জনের একেকরকম দেখা। একেক জনের একেকরকম শোনা।

ওপরের কথাগুলো নিজের খেয়ালেই লিখে ফেললাম। প্রায় তেইশ বছর আগে এই দিনে চলে গিয়েছিল গৌতম চট্টোপাধ্যায়। অনেক বলেছি, অনেক লিখেছি তাকে নিয়ে। তবু আজ দিশেহারা লাগে। কী লিখব তাকে নিয়ে?

'মহীনের ঘোড়াগুলি' ব্যান্ডের আরব্যঘোটক গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে লোকে মূলত চিনেছিল একজন যুগান্তকারী সংগীতজ্ঞ হিসেবে, আর কেউ কেউ চলচ্চিত্রকার হিসেবেও। আমরা প্রথম চিনেছিলাম পাড়ার 'মনিদা' হিসেবে।

সেই জানা-বোঝার সলতে পাকাতে পাকাতে কেমন যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকার মেখে তার আলোকোজ্জ্বল উপস্থিতি আজও টের পাই। আজ সে কিংবদন্তি! আজ সে সংগীতজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র! কিন্তু এমন তো শুরু থেকেই ছিল না। সেইসব বেলা-অবেলার দিনরাত্রির আখ্যান হয়তো আরও পরে লিখিত হবে। কিন্তু যখন একটা মানুষ মিথ হয়ে যায় কিংবা মিথ করে দেওয়া হয়, তখন গজিয়ে ওঠে বেখাপ্পা গল্প। এই যে বলছি 'গল্প', তার পিছনে মূলত কাজ করেছে, না দেখা, না বোঝা।

একটা আপসহীন লড়াই, সমাজের মধ্যে থেকে সমাজের এগিয়ে থাকা কথাগুলো বলে ফেলা আর পরীক্ষামূলক যে কোনও চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছিল মনিদার অন্যতম চর্যাচর্য। অসম্ভব পরিশ্রম করতে পারার ক্ষেত্রে যেমন সুনির্দিষ্ট , আবার আড্ডাবাজিতে তার তুলনা মেলা ভার। পরিচালককে প্রথমত একজন দক্ষ সংগঠক হতে হবে, সেকথা অনেক আগেই পড়ে ফেলেছি। কিন্তু চাক্ষুষ করেছি মনিদাকে দেখে। অসম্ভব সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল তার। সেই কারণে মনিদার প্রতি আকর্ষিত হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আমাদের বয়সের মধ্যে ছিল দেড় দশকের ফারাক। কিন্তু ভাবটি হলো বন্ধুর, কখনও দাদার মতো, শিক্ষকের মতো। সেই কারণেই যখন শুনি, মনিদার নেশা ও বিশৃঙ্খল জীবনের গল্প, তখন বলতে ইচ্ছে করে যে, এসব বলা বন্ধ করো। নেশা মনিদা করত, কিন্তু তা অপর্যাপ্ত নয় কখনও। মনিদা কখনওই বিশৃঙ্খল ছিল না। তা হলে মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এত কাজ করতে পারত না। আরও কাজ করে যাওয়া উচিত ছিল বলে যারা মনে করে, তাদের কথায় আমি জুড়ে দেব যে আমাদের সংস্কৃতি সে সুযোগ মনিদাকে দেয়নি। মনিদার কাছ থেকে বারবার শুনেছি যে, "প্রত্যেকটি শিল্পচর্চায় একটি সুসংহত বোধ থাকা দরকার। তবেই তুমি তোমার কাজকে ভাঙতে পারবে। নতুন কিছু তৈরি করতে পারবে, সৃষ্টি করতে পারবে।" এই বলাটা শুধু বলা নয়, করে দেখানো। অর্থাৎ শুধু জ্ঞান নয়, হাতে-কলমে উদ্বুদ্ধ করা। সে গানই হোক অথবা সিনেমা, কিংবা ভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান।

এই ভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান বলতে আসলে সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা কিছু শিল্পকর্ম। একটা সময় মনিদা স্প্যানিশ কবি লোরকা পড়তে শুরু করে। সেখানে তার আবিষ্কার হল 'দুয়েন্দে', যা কিনা স্প্যনিশ লোকঐতিহ্য থেকে লোরকা তুলে এনেছিলেন। এই আঙ্গিকের মধ্যে নানা ধরনের মাধ্যম ব্যবহার করার চল আছে।

তো মনিদা তার নিজস্ব মিউজিকাল স্কোর তৈরি করে তার সঙ্গে কোরিওগ্রাফিকে জুড়ে নিয়ে অসাধারণ একটা পারফরম্যান্স বা অনুষ্ঠান করেছিল। যেমন যেমন লোকজন দরকার, তা জুটিয়ে এই কাজটির মধ্যে ঢুকে পড়ল একটার পর একটা রিহার্সালের মধ্যে দিয়ে।

একটি শো হয়েছিল কলকাতার শিশির মঞ্চে।

ব্যস, ওই পর্যন্তই। ওই যে বলছিলাম, আমরা তৈরি ছিলাম না। সেই সন্ধ্যায় যারা এই অনুষ্ঠান দেখেছে, তারা প্রত্যেকেই একটা অন্য গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে আবিষ্কার করেছে। কাবেরীর নাচ নিয়ে এটা ছিল তার অন্যতম কাজ 'ইন সার্চ ফর দুয়েন্দে'। এরও পরে 'সময়' ছবিটি আটকে যাবে আর আমরা মনিদার কোরিওগ্রাফি নিয়ে কাজ দেখার থেকে বঞ্চিত হব।

একেকটি কাজের পিছনে শুধু পরিশ্রম নয়, তার জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ। অর্থ জোগান থেকে কলাকুশলীদের চিহ্নিত করা থেকে সমগ্র কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেওয়া একজন প্রকৃত ডিরেক্টর হয়ে। আমরা সেসময় দেখেছি, এবং তার তাবৎ কার্যপ্রণালী কিন্তু কখনোই গাম্ভীর্যপূর্ণ বা বিরক্তিকর ছিল না। ছিল না তার কারণ, মনিদার রসবোধ আর তার মানুষ চেনা, কর্মী চেনা মন।

আসলে যেকথা লিখব, বলে শুরু করেছিলাম তা তো উত্থাপনই করতে পারিনি। তা হলো, মনিদার করা সেলুলয়েডের কিছুই কি সত্যিই কখনও নতুন প্রজন্ম দেখতে পাবে না? ভাগ্যের ওপর কোনওদিন আস্থা রাখিনি, কিন্তু 'দুর্ভাগ্য' শব্দটিকেও অভিধানের বাইরে রাখতে পারিনি। মনিদার ক্ষেত্রে 'দুর্ভাগ্য' শব্দটা প্রায়ই ইতিউতি ঘুরে-ফিরে আসে। বড় মন খারাপ করে দেয়। 'নাগমতী' থেকে 'সময়' হয়ে দূরদর্শনের জন্য করা 'লেটার টু মম' কিংবা কার্বিদের নিয়ে ছবি- সবই বিভিন্ন বিভ্রাটে জড়িয়ে আছে। কোথাও দ্বন্দ, কোথাও মোকদ্দমা। গত তেত্রিশ বছর ধরে একথা কেউ বলেনি।

একটা না-দেখা সেলুলয়েডের ইতিহাস শেষ হয়ে গেল?

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?