এইডস থেকে সারা জীবনের মতো মুক্তি! যে অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটালেন এই চিকিৎসকরা
Patient Free from HIV AIDS : মারণ ভাইরাস এইচআইভি আর তাঁর শরীরে বাসা বেঁধে নেই! অবিশ্বাস্য, অলৌকিক এই ঘটনাটি হল কী করে?

অ্যাকুয়ার্ড ইমিউনো ডেফিসিয়েনসি সিনড্রোম, সংক্ষেপে এইডস (AIDS)। নামটি শুনলেই অনেকের চলে আসে ভয়, উৎকণ্ঠা। যার শরীরে একবার এই রোগটি বাসা বাঁধে, তার নাকি আর মুক্তি নেই। এইডস বা এইচআইভি (HIV) নিয়ে আমাদের সমাজেও নানারকম ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে আছে। দুরারোগ্য এই ব্যাধি মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়, প্রতিরোধ ক্ষমতাকে একেবারে ধ্বংস করে দেয়। এর হাত থেকে বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব – এমন ভাবনাই এতদিন ছিল গোটা পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই চিরাচরিত ধারণার গায়ে আঘাত হেনেছে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসার পর অবশেষে এইডস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছেন এক ব্যক্তি! মারণ ভাইরাস এইচআইভি আর তাঁর শরীরে বাসা বেঁধে নেই! অবিশ্বাস্য এই ঘটনাটি হল কী করে?
ফ্রান্সের বিখ্যাত পাস্তুর ইনস্টিটিউটের দাবি, জার্মানির এই মধ্যবয়স্ক রোগী সম্প্রতি এইডস থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁকে নিয়ে গোটা বিশ্বে মোট তিনজন রোগী এই মারণ রোগ থেকে মুক্ত হলেন। কিন্তু এমন অসম্ভব ব্যাপারটি সম্ভব হল কী করে? ডাক্তারদের বক্তব্য, অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নাকি এই কাজটি সম্ভব হয়েছে।
আরেকটু বিস্তারিত জানা যাক। ২০০৮ সাল, অর্থাৎ ১৪ বছর আগে জার্মানির ডুসেলডর্ফের এই বাসিন্দার এইডস ধরা পড়ে। তারপরই তাঁর অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি বা ART-র প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটি কী? সাধারণত এইচআইভি আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা করা হয়। এই চিকিৎসার ফলে রোগী হয়তো সবসময় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন না; কিন্তু তাঁর রোগ যন্ত্রণা, রোগের আক্রমণ কিছুটা হলেও কমানো যায়। রোগী আরও বেশিদিন বাঁচতে পারেন। ঠিক সেই চিকিৎসাটিই শুরু হয়েছিল ওই জার্মান রোগীর ক্ষেত্রে।
ঠিক তিন বছর পর, ২০১১ সালে ওই রোগীর ক্যানসার ধরা পড়ে। যে সে ক্যানসার নয়, অ্যাকিউট মায়লয়েড লিউকেমিয়া। এটি এক ধরনের রক্তের ক্যানসার। এইডসের সঙ্গেই তাঁর ক্যানসারের চিকিৎসাও শুরু হয়। দু’বছর পর, ২০১৩ সালে ডাক্তাররা ঠিক করেন, ওই রোগীর বোন ম্যারো অর্থাৎ অস্থি মজ্জা স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করা হবে। উপযুক্ত দাতাও পাওয়া গেল। অপারেশনও সফল হল। পরবর্তীকালে দেখাগেল, ক্যানসারের পাশাপাশি তার শরীরে এইচআইভি-র প্রকোপও কমতে শুরু করেছে। আর এখন, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জার্মানির ওই ভদ্রলোক একেবারে সুস্থ! ক্যানসার, এইডস দুটোই একেবারে উধাও!
কিন্তু, কী করে এমনটা সম্ভব হল?
ডাক্তাররা এই ঘটনায় অত্যন্ত হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এ যেন নিরাকল, অলৌকিক কাণ্ড! তারপর শুরু হয় গবেষণা। তখনই দেখা যায়, আসল কাণ্ডটি ঘটেছে স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের সময়। যিনি দাতা হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁর শরীরে এক বিশেষ প্রজাতির জিন ছিল – CCR5-Delta32 মিউটেশন জিন। এই বিশেষ জিনটি অত্যন্ত বিরল। মধ্য ও উত্তর ইউরোপে বসবাসকারী একাংশের শরীরে এর উপস্থিতি দেখা যায়। পরবর্তীকালে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই বিশেষ জিনটি মানব কোষে এইচআইভি ভাইরাসকে প্রবেশ করতে দেয় না। তাছাড়াও ওই দাতার শরীর থেকে নেওয়া কোষগুলি ওই ব্যক্তির শরীরে নতুন করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলেছে। এসবের জন্যই একটু একটু করে এইডস থেকে সেরে উঠেছেন ওই ব্যক্তি। এই গোটা সময়টায় অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি চলছিল। ২০১৮ সাল থেকে সেই থেরাপি নেওয়া বন্ধ করা হয়। এখন সেই রোগী একেবারে সুস্থ!
আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘নেচার’-এ এই গোটা গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। তারপরই গোটা চিকিৎসা জগত নড়েচড়ে বসেছে। ডাক্তার ও গবেষকদের ধারণা, অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি, স্টেম সেল আর ওই বিশেষ বিরল জিন – এসবের মধ্যে দিয়েই এইডস মুক্তির আসল রাস্তা বেরিয়ে যাবে। আপাতত একটা আলোর রাস্তা দেখা গিয়েছে। সেখানেই গবেষণা জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।






