সমাজ মাধ্যমে বন্দি কৈশোর কি মুক্তির আলো দেখবে?
social media addiction: স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যম কি আজকের কিশোর-কিশোরীদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে? ডিজিটাল দুনিয়ার অতিনির্ভরতা কি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, পড়াশোনা ও সামাজিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করছে? বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আনছে, তখন ভারতেও কি এমন নীতি প্রয়োজন?
এখনকার বাচ্চারা আর পাতার পর পাতা লিখতে চায় না, বরং তাঁরা কিবোর্ডে বেশি স্বচ্ছন্দ। তাঁদের বইয়ের আলমারিতে সারি সারি বইয়ের পরিবর্তে, মোবাইলের মেমোরিতে বা ক্লাউডে জমা থাকে অসংখ্য ই-বুক। ঠিক মতো খুঁজলে পছন্দের দু'চারখান অডিওবুক পাওয়া যেতেও পারে; বই খুলে পড়ার ঝক্কি আর কে পোহায়, তার চেয়ে কেউ যদি গড় গড় করে পড়ে দেয়, তাহলে শুনতে আপত্তি নেই। এসবের নেপথ্যে রয়েছে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট। আজ, প্রায় প্রতিটি বাচ্চার হাতেই কোনো না কোনো ডিজিটাল যন্ত্র হাজির। সম্প্রতি, ‘রুকাম ক্যাপিটাল’ নামক একটি সংস্থার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৯ থেকে ১৬ বছর বয়সি ভারতীয় শিশুদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের (৭৩.৫%) নিজস্ব স্মার্টফোন রয়েছে, এবং তাতে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ; প্রায় ৬০ শতাংশের আবার ব্যক্তিগত কম্পিউটার রয়েছে। এদের স্বীয়ভাগ জেনারেশন আলফা, অর্থাৎ তাঁদের জন্ম হয়েছে ২০১০ সালের পর, এরা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তি সচেতন।
এই প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সমাজমাধ্যম, গেমিং, ভিডিও স্ট্রিমিং এবং মেসেজিং অ্যাপগুলির মাধ্যমে নিজেদের সঙ্গে সর্বক্ষণ সংযুক্ত থাকে; বারবার মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করে দেখতে থাকে নতুন কোনো নির্দেশিকা এল কিনা। ডিজিটাল দুনিয়ায় মুহূর্তের অনুপস্থিতিতে, অনেকসময় নিজেদের কেমন যেন একঘরে লাগতে থাকে; মনে হয় এই বুঝি হারিয়ে যাব। সেই জায়গায় শিশু কিশোরদের অবস্থা কি হবে তা সহজেই অনুমেয়। আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে এর প্রভাব চোখে পড়ে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১১-১২ বছর বয়সি বেশিরভাগ শিশুর কাছে স্মার্টফোন রয়েছে। সেই রিপোর্ট আরও বলছে যে ২ বছরের কম বয়সি প্রায় ৮৫% শিশু ইউটিউবে ভিডিও দেখে, যেখানে তাদের নিজস্ব কোনো স্মার্টফোন নেই। আগেকার দিনে, শিশুরা যেমন প্রকৃতির কোলে, নির্মল আলো বাতাসে বেড়ে উঠত, এখনকার বাচ্চারা জন্ম থেকেই ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ঘেরাটোপে বড় হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের আচরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যে; ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে তা স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে। কথা বলতে না চাওয়া বা দেরি করে কথা বলতে শেখা, এখন প্রায় প্রতিটা ঘরের সমস্যা। সম্প্রতি, পেডিয়াট্রিক্স নামক জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব শিশুদের ১২ বছর বয়সের আগেই নিজস্ব স্মার্টফোন রয়েছে, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতা, স্থূলতা, এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব দেখা যাচ্ছে।
তবে, ‘রুকাম ক্যাপিটালের’ প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতীয় পিতামাতারা এই সমস্যার ব্যাপারে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল; সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ৫৪% পিতামাতা, তাঁদের সন্তানদের ডিজিটাল দুনিয়ায় রীতিমতো নজর রাখে এবং ২৯.৬% অভিভাবক মাঝেমধ্যেই উঁকি দেন বাচ্চাদের কর্মকাণ্ডে।
বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি এতটাই করুণ আকার ধারণ করেছে, প্রথম সারির বেশকিছু দেশ, আইন করে শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া, সর্বপ্রথম ১৬ বছরের কম বয়সি শিশুদের জন্য সমাজ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলি যদি এই নির্দেশিকা মানতে না পারে, তবে তাদেরকে ৫০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানা দিতে হবে ।
একই পথে পা বাড়ায় ফ্রান্স; সেখানে আইন করে ১৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। অতি সম্প্রতি, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে; সেখানে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৮ থেকে ১১ বছর বয়সি স্কুল পড়ুয়াদের অধিকাংশই দিনে দু'ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে স্মার্টফোন ব্যবহার করে। সেজন্য সেখানকার সরকার ফোন করা বা ম্যাসেজ করার মতো কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত এক মোবাইল ফোন মার্কেটে নিয়ে আসার নীতি গ্রহণ করেছে, যাতে করে দেশের ভাবী প্রজন্মকে অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ও সমাজ মাধ্যমর কবল থেকে বাঁচানো যায়। কিশোর-কিশোরীদেরকে সামাজিক মাধ্যমের হাত থেকে রক্ষা করতে, ব্রিটেনেও ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে—প্রশাসন, দেশের প্রতিষ্ঠিত আইন ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে একটা সহজ ও সুন্দর নীতি প্রণয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
ভারতে, একমাত্র কর্নাটকই প্রশাসন প্রকাশ্যে ১৬ বছরের নিচে থাকা শিশুদের জন্য সমাজ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা শর্ত আরোপ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে; স্মার্টফোনের প্রতি শিশুদের সীমাহীন আসক্তি রুখতে সরকার যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, তা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট। এটা সত্যিই, শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে, পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশের পথে সামাজিক মাধ্যম ও স্মার্টফোনের আসক্তি প্রধান বাঁধা। আজকের দিনে, তরুণ প্রজন্ম ডিজিটাল দুনিয়ার প্রতি অতিনির্ভরতার দাম দিচ্ছে একাকীত্ব দিয়ে; জীবনের বিভিন্ন সমস্যায়, তাঁরা শরণাপন্ন হচ্ছেন কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা নির্ভর বিভিন্ন চ্যাটবটের।
সম্প্রতি, ১৬ বছরের এক কিশোরের চ্যাটজিপিটি-র সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন সামনে আসে, ছেলেটির মূল জিজ্ঞাস্য ছিল যে কীভাবে সে তাঁর জীবন শেষ করতে পারে। ছেলেটির দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর, তাঁর মা ৭০ পৃষ্ঠার সেই কথোপকথন খুঁজে পান; ভদ্রমহিলা অভিযোগ করেছিলেন ওই চ্যাটের প্রতিটি পাতায় তাঁর ছেলেকে এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছিল। এই তো ২০২৬ সালের মার্চে, সুরাটের একটি মন্দিরের শৌচালয়ে দুই ভারতীয় কলেজ ছাত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে ওই কিশোরীরা জীবন কীভাবে শেষ করা যায় সেজন্য যে এই চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হয়েছিল। ভাবা যায়!
আসলে এই অ্যালগরিদম ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলি শিশুদেরকে অনেকসময় বিপথে চালিত করছে; আর চ্যাটবটগুলি এমন ভাবে বানানো হয়েছে যে, শিশু ও কিশোরদের মনস্তত্বকে ক্রমশ নিজেদের আয়ত্ত্বে এনে তাঁদেরকে দীর্ঘমেয়াদি গ্রাহকে পরিণত করছে। এর ফল সাংঘাতিক হতে পারে। দেশের ভাবী প্রজন্মের কাছে এখন স্মার্টফোন রয়েছে, আর তাঁরা স্ক্রিনে মুখ গুঁজে রয়েছে সারাক্ষণ। এই পরিস্থিতি ঠেকাতে আমাদের দেশে কোনো নীতি প্রণয়ন হবে কি, নাকি অভিভাবকদের নজরদারিতেই সুরক্ষিত থাকবে আগামীর ভবিষ্যৎ? আশা করছি, আর পাঁচটি প্রশ্নের মতো এগুলি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে না।







