AI-নির্ভর প্রযুক্তি বদলে দেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা?
AI in disaster management: ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা ভূমিকম্পে যখন মোবাইলের নেটওয়ার্ক চলে যায়, তখন উদ্ধারকারীরা কীভাবে জানতে পারবেন কোথায় মানুষ আটকে আছেন? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সহযোগী ক্যাশিং কি সেই সংকটে রিয়েল টাইম তথ্য পৌঁছে দিয়ে দ্রুত উদ্ধারকাজ সম্ভব করতে পারে? দুর্যোগ মোকাবিলার ভবিষ্যৎ কি তবে এই প্রযুক্তির হাতেই?
দু'বছর আগে কেরলের মুণ্ডক্কাই ও চুরালমালা এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধসের সাক্ষী ছিল সেখানকার মানুষজন; শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় সেই সময়। গতবছর, উত্তরাখন্ডের ধারালীতে মেঘভাঙা বৃষ্টির ফলে ভেসে যায় এক বিস্তীর্ণ জনপদ। ২০২৫ সালের বর্ষায় উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি জেরবার হয়ে গিয়েছিল লাগাতার বন্যায়। গত ১৩-১৪ মে, উত্তরপ্রদেশে প্রবল ঝড় ও বৃষ্টিতে প্রাণ গিয়েছে শতাধিক মানুষের। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও যে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা; জায়গায় জায়গায় মোবাইল টাওয়ার ভেঙ্গে পড়ে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়, এবং অনেক সময় তো গোটা এলাকা জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসন, উদ্ধারকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, চিকিৎসকরা যখন ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রকৃত তথ্য বা রিয়েল টাইম ডেটা—কোন এলাকায় মানুষ আটকে আছে, কোন রাস্তা দিয়ে সহজে যাওয়া সম্ভব, কোথায় জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা সহায়তা দরকার, কোন এলাকা জলে নিমগ্ন, কোন অঞ্চল মারাত্মক ভূমিধসের কবলে পড়েছে, এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরগুলি তখন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়, আর মানুষজনের জীবনহানি বাড়ে, এবং সময়ের ব্যবধানে ক্ষতির তালিকা আরও লম্বা হতে থাকে। কয়েকবছর আগে আমফানের সময়, আমরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
দুর্যোগপূর্ণ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট, এক দীর্ঘদিনের সমস্যা; আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তথ্যের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে কি কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব? সম্প্রতি, ‘আইইইই ট্রান্সাকশান্স অন সার্ভিসেস কম্পিউটিং’ এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে গবেষকরা একটা অভিনব পদ্ধতির সন্ধান দিয়েছেন; তাঁদের দাবি, নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকলেও সহযোগী ক্যাশিং পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় রিয়াল টাইম ডেটা পাওয়া সম্ভব। কী সেই প্রযুক্তি? জানব। তার আগে আমরা একবার চোখ বুলিয়ে নিই, অতীতে বা বর্তমানেও বিভিন্ন দেশে এই সমস্যা কী ভাবে মোকাবিলা করা হয়।
দুর্যোগের সময়ে প্রশাসনের হাতে প্রধানত তিনটি যোগাযোগের হাতিয়ার থাকে—স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ড্রোন বা মানব বিহীন আকাশযান (ইউএভি) ও স্থলভিত্তিক কোনো অ্যাড-হক নেটওয়ার্ক। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বসে, স্যাটেলাইট থেকে ডেটা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ডেটা লেটেন্সি বা তথ্য পেতে বিলম্ব হওয়া। কারণ দুর্যোগের সময় প্রতিটি মূহুর্ত খুব গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ব্যান্ডউইথের সমস্যা তো আছেই। বর্তমান সময়ে, ড্রোনের সাহায্যে আকাশ থেকে ছবি তোলা, লাইভ ভিডিও পাঠানো, এবং স্থলভাগে তথ্য আদানপ্রদান, ইত্যাদি সম্ভব, কিন্তু স্বল্প পাল্লার উড়ানের সীমাবদ্ধতা, ব্যাটারির সীমিত ক্ষমতা, সর্বোপরি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া স্থলভিত্তিক ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক গঠন করে স্থানীয় পরিসরে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব, কিন্তু সীমিত পাল্লার এই যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব বেশি ফলপ্রসূ হয় না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Earthquake: অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র সাতক্ষীরায় হলে কলকাতায় এত তীব্র কম্পন অনুভূত হলো কেন? অথবা এতক্ষণ ধরে কম্পন স্থায়ী হওয়ার কারণ কী? সেজন্য আমাদেরকে কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটির চরিত্র বুঝতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে সহযোগী ক্যাশিং, প্রশাসকদের কাছে নতুন এক আশার আলো। এটি ডিস্ট্রিবিউটেড সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের একটি কৌশল, যেখানে একাধিক কম্পিউটার বা নোড তাদের নিজস্ব ডেটা একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করে। সহজ কথায়, একটি কম্পিউটারের ক্যাশে, যে সব দরকারি তথ্য (যেমন মানচিত্র, লাইভ ভিডিও, আহতদের তালিকা, আবহাওয়ার আপডেট, রিয়েল-টাইম সেন্সর ডেটা) নেই, সেটি দূরবর্তী সার্ভার থেকে না এনে, যদি পাশের কোনো কম্পিউটারের ক্যাশে থাকে, তবে সেখান থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়। আর পুরো প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে স্যাটেলাইট, ড্রোন, যানবাহন এবং গ্রাউন্ড স্টেশন; নিজেদের স্টোরেজ ভাগ করে নেয়। ফলে, উদ্ধারকারীরা স্যাটেলাইটের পরিবর্তে স্থানীয় নোডের উপর নির্ভরশীল হওয়ায়, ডেটা অ্যাক্সেসের সময় খুব কম লাগে, এবং উদ্ধারকাজ দ্রুত হয়।
কিন্তু এই ক্যাশিং ব্যাবস্থা তৈরি করা সহজ নয়; দুর্যোগের সময় ড্রোন আকাশে উড়ছে, উদ্ধারকারী যানবাহন রাস্তায় চলমান, প্রতিনিয়ত স্যাটেলাইটের অবস্থান বদলাচ্ছে। কোন তথ্যটি কখন, কোথায় দরকার হবে, তা আগে থেকে বোঝা কঠিন। আর প্রতিটি ডিভাইসের স্টোরেজ সীমিত—সব ডেটা ধরে রাখাও সম্ভব নয়। তাই ক্যাশে ডেটার ব্যাপারে বুদ্ধিমানের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় গবেষকরা ব্যবহার করেছেন কনটেক্সটুয়াল মাল্টি-আর্মড ব্যান্ডিট (CMAB) নামক একটি পরিসংখ্যানগত মডেল; এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর এমন একটি মডেল, যা অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাশিং সিদ্ধান্তগুলি উন্নত করে। এই মডেল পূর্ববর্তী প্রতিটি সিদ্ধান্ত থেকে শেখে এবং এই সময় তিনটি বিষয় পর্যালোচনা করে: সদ্য কোন ডেটা পাওয়া গিয়েছে, কোন ডেটার চাহিদা বর্তমানে তুঙ্গে রয়েছে, আর তাদের জন্য ক্যাশেতে কী পরিমাণ মেমোরি দরকার হতে পারে। একটা উদাহরণ দিয়ে বললে বুঝতে সুবিধা হবে-বন্যা কবলিত এলাকার ১ ঘণ্টা আগে তোলা ছবির চেয়ে ১০ মিনিট আগে তোলা ছবি বন্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে বেশি সহায়ক। ধরা যাক, একটি ভিডিও ফুটেজ বা কোনো জায়গার ম্যাপ, অধিকাংশ উদ্ধারকারীরা চাইছেন, তার মানে সেই তথ্য অবিলম্বে ক্যাশ করা দরকার। অনেক সময় উচ্চ রেজুলেশনের ভিডিও (যেমন 4K ভিডিও) ক্যাশ করার পরিবর্তে, ছোটো টেক্সট অ্যালার্ট বা সতর্কতা বার্তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ, এবং সিস্টেমে কম জায়গা নেয়। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে মডেলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে কোন তথ্যটি ক্যাশে রাখা উচিত, কোনটি নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
World Wetlands Day: বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর মোট জলাভূমির প্রায় ৩৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বনাঞ্চলের তুলনায় জলাভূমি ধ্বংসের হার তিন গুণ বেশি।
এরই এক উন্নত মডেল, ফেডারেটেড মাল্টি-আর্মড ব্যান্ডিট (FMAB); এক্ষেত্রে প্রতিটি ডিভাইস নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে শেখে, কিন্তু সেই তথ্যগুলি শেয়ার না করে, কেবল শেখার ফলাফল গুলি নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়, সেজন্য ব্যাটারি বাঁচে, আবার দুর্যোগে আহতদের নাম বা ঠিকানার গোপনীয়তাও রক্ষা পায়। আর একটা মজার ব্যাপার হলো এই একসঙ্গে শেখার ফলে একটি নোডকে সব অভিজ্ঞতা নিজে অর্জন করতে হয় না; অন্য নোডের শিক্ষার ঝুলিতেও সে স্বচ্ছন্দে ভাগ বসাতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, স্থান-কালভিত্তিক পরিবর্তনশীল অবস্থায় এই FMAB, আগের মডেলটির তুলনায় প্রায় ১৫% বেশি দক্ষ।
ক্লার্কদের গবেষণায় একটি ত্রিস্তরীয় নেটওয়ার্কের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে মহাকাশ, বায়ু এবং স্থল একসঙ্গে কাজ করছে। এটি, ‘স্পেস এয়ার গ্রাউন্ড ইন্টিগ্রেটেড নেটওয়ার্ক’ বা SAGIN নামে বহুল পরিচিত। প্রতিটি স্তর একটি অনন্য ভূমিকা পালন করে, কিন্তু তাদের মধ্যে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ক্যাশিং এর কারণে অনেক কমে যায় এবং সিস্টেম আরও দক্ষ হয়ে ওঠে । ক্লার্কদের সিমুলেশনে তা স্পষ্ট।
দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তথ্যের আধিক্যের দিকে নজর না দিয়ে দেখা দরকার, কোন তথ্য বেশি কাজের। একটি আপডেটেড রাস্তার মানচিত্র আমাদেরকে জানাতে পারে যে কোন ব্রিজ এখনও ব্যবহারযোগ্য; একটি লাইভ ভিডিও আমাদেরকে এই বার্তা দিতে পারে যে, বন্যা কবলিত অঞ্চলের এই অংশে নৌকা পাঠানো আশু প্রয়োজন। একটি ছোট টেক্সট-অ্যালার্টও জানাতে পারে কোন এলাকায় চিকিৎসা-দল আগে পৌঁছনো দরকার। সেই কারণে, কনটেন্টকে কেবল ডেটা হিসেবে নয়, সময় নির্ভর কার্যকরী ডেটা হিসেবে দেখা উচিত। উন্নত ক্যাশিংয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত, সীমিত উপকরণের সাহায্যে কি করে সবচেয়ে মূল্যবান তথ্যটিকে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গায় সংরক্ষণ করা যায়।
SAGIN নামক ত্রিস্তরীয় নেটওয়ার্ক এই লক্ষ্য পূরণের বাহ্যিক অবকাঠামো তৈরি করে, CMAB গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে, আর FMAB সেই সিদ্ধান্তকে বহু নোডে ছড়ানোর মধ্যে দিয়ে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ের নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। তবে, সিমুলেশন ভিত্তিক এই গবেষণার ফলাফল কখনও কখনও বদলে যেতেও পারে; বাস্তবের আবহাওয়া, ড্রোনের উড়ান, শক্তি ব্যবস্থাপনা, হার্ডওয়্যারের ত্রুটি, সাইবার নিরাপত্তা এবং বাস্তবে উদ্ধারকারীদের আচরণ—সবই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, কোন কনটেন্ট মূল্যবান, বা অগ্রাধিকারযোগ্য, তা সব সময় প্রযুক্তিগতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়; অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা, বা মানবিক বিবেচনাও জরুরি প্রভাব ফেলতে পারে ।






