চোখের নিমেষে শেষ হচ্ছে জলাভূমি: আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব?
World Wetlands Day: বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর মোট জলাভূমির প্রায় ৩৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বনাঞ্চলের তুলনায় জলাভূমি ধ্বংসের হার তিন গুণ বেশি।
প্রতি বছর ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব জলাভূমি দিবস এলেই কিছু আলোচনা আর কিছু আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নজরে আসে। এরপর বছরের বাকি দিনগুলোতে জলাভূমি থাকে অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং প্রায় বিস্মৃত। অথচ রূঢ় বাস্তবতা হলো, জলাভূমি ছাড়া মানবসভ্যতা টিকতে পারে না। জলাভূমি কেবল একটি সাধারণ জলজ পরিবেশ নয়; এটি প্রকৃতির এমন এক নীরব প্রহরী, যা আমাদের জল, খাদ্য, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যকে আগলে রাখে।
১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে স্বাক্ষরিত ‘রামসার কনভেনশন’-এর মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক স্তরে জলাভূমির গুরুত্ব প্রথম স্বীকৃতি পায়। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করেই ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব জলাভূমি দিবস হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে আজ প্রশ্ন উঠছে—এই স্বীকৃতি কি বাস্তবে সংরক্ষণের রূপ পেয়েছে?
পরিসংখ্যান বলছে, উত্তরটি নেতিবাচক। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, গত পঞ্চাশ বছরে পৃথিবীর মোট জলাভূমির প্রায় ৩৫ শতাংশ হারিয়ে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বনাঞ্চলের তুলনায় জলাভূমি ধ্বংসের হার তিন গুণ বেশি। পৃথিবীর মাত্র ৬ শতাংশ ভূমি জুড়ে থাকা এই বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিশ্বের মোট জীববৈচিত্র্যের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। এই বৈপরীত্যই আজকের সংকটের মূল কারণ।
জলাভূমি কেন অপরিহার্য, বিজ্ঞান বহু আগেই তার উত্তর দিয়েছে। জলাভূমি হলো প্রকৃতির নিজস্ব জলাধার। অতিবৃষ্টির সময় এটি স্পঞ্জের মতো অতিরিক্ত জল শুষে নিয়ে বন্যার তীব্রতা কমায়। আবার খরার সময় ধীরে ধীরে সেই জল ছেড়ে দিয়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে সজীব রাখে। একই সঙ্গে জলাভূমি কাজ করে প্রাকৃতিক ফিল্টার বা ছাঁকনি হিসেবে—নদী বা শহরের দূষিত জলকে প্রাকৃতিকভাবেই অনেকটা পরিশোধিত করে দেয়। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এটি এক শক্তিশালী ঢাল। ম্যানগ্রোভ, পিটল্যান্ড কিংবা উপকূলীয় জলাভূমি বিপুল পরিমাণ কার্বন দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে রাখতে সক্ষম, যে কারণে এদের ‘ব্লু কার্বন ইকোসিস্টেম’ বলা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Himalayan Climate Change: হিমালয় এখন বরফশূন্য, বিগত অক্টোবরের কয়েকটা দিন ছাড়া গোটা পশ্চিম ও মধ্য হিমালয় তুষারপাতের মুখ দেখেনি।
অথচ তথাকথিত উন্নয়নের নামে আজ সবচেয়ে বেশি আঘাত আসছে এই জলাভূমির উপরই। অপরিকল্পিত নগরায়ন, রিয়েল এস্টেট, শিল্পায়ন, অনিয়ন্ত্রিত কৃষি, বর্জ্য নিক্ষেপ এবং নদী শাসনের নামে প্রাকৃতিক প্রবাহ বদলে দেওয়ায় জলাভূমি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়া মানে শুধু জল হারানো নয়, বরং এতদিন ধরে সঞ্চিত কার্বন বায়ুমণ্ডলে মুক্ত হয়ে যাওয়া। ফলে বিশ্ব উষ্ণায়ন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। সহজ কথায়, জলাভূমি ধ্বংস করা মানে নিজ হাতে জলবায়ু সংকটকে ডেকে আনা।
বিশ্বজুড়ে এই বাস্তবতা অনুধাবন করে নতুন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণের চেষ্টা চলছে। রামসার কনভেনশন আজ আর নামমাত্র চুক্তি নয়। এর আওতায় ১৭০টিরও বেশি দেশ প্রায় আড়াই হাজার জলাভূমিকে আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ২০৩০ ও ২০৪০ সালের জলবায়ু লক্ষ্যের সঙ্গে জলাভূমি পুনরুদ্ধারকে যুক্ত করেছে। চিন ২০২২ সালে সরাসরি ‘ওয়েটল্যান্ড প্রোটেকশন ল’ কার্যকর করেছে, যেখানে জলাভূমি ধ্বংসকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতেও জলভূমি সংরক্ষণে নির্দিষ্ট তহবিল ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Climate Change: বিগত কয়েক বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। সে জোশিমঠ হোক, হিমাচল হোক কিংবা পাঞ্জাব। উওর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র এক ঘটনা এবং তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
শহর পরিকল্পনাতেও জলাভূমিকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রামসারের ‘ওয়েটল্যান্ড সিটি অ্যাক্রেডিটেশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে শহরগুলিকে বোঝানো হচ্ছে যে, জলাভূমি শহরের বোঝা নয়, বরং শহরের ‘প্রাকৃতিক পরিকাঠামো’ (Natural Infrastructure)।
এবারের বিশ্ব জলাভূমি দিবসের থিম বা প্রতিপাদ্যটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—‘জলাভূমি ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান’। আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জলাভূমির সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত। মৎস্য আহরণ, কৃষি ও জলব্যবস্থাপনায় তাদের প্রথাগত জ্ঞান আজকের আধুনিক পরিবেশনীতির কাছে এক অমূল্য সম্পদ হতে পারে।
কিন্তু আতঙ্কের বিষয় হলো, আজও অধিকাংশ ক্ষেত্রে জলাভূমিকে উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে দেখা হয়। কংক্রিটের অট্টালিকা, আবাসন প্রকল্প কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির জন্য জলাভূমি ভরাট করলে প্রথমেই ধ্বংস হয় এলাকার স্বাভাবিক জলনিকাশি ব্যবস্থা। এর ফলস্বরূপ সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের রাস্তায় জল জমে, বাড়ে নগর-বন্যার (Urban Flood) ঝুঁকি। ভূগর্ভস্থ জলস্তর দ্রুত নিচে নেমে গিয়ে তৈরি হয় তীব্র পানীয় জলের সংকট। একই সঙ্গে হারিয়ে যায় অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ, মাছ, পাখি ও অণুজীবের আবাসস্থল। প্রকৃতি যেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারসাম্য রক্ষা করছিল, মাত্র কয়েক বছরের অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ সেই ভারসাম্যকে চিরতরে ভেঙে দিচ্ছে।
অতএব, জলাভূমি সংরক্ষণ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি। শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সরকারি নীতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বিশ্ব জলাভূমি দিবস তাই কেবল উদযাপনের দিন নয়, এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমাদের কি প্রশ্ন করার সময় আসেনি—আমরা কি উন্নয়নের নামে আমাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ নিজেরাই ভেঙে ফেলছি? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতেই হবে।
জলাভূমি বাঁচানো মানে জল বাঁচানো, আর জল বাঁচানো মানে জীবন বাঁচানো। প্রকৃতির এই নীরব প্রহরীরা আজ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি তাদের ডাকে সাড়া দেব, নাকি কংক্রিটের কোলাহলে সেই ডাক চিরতরে চাপা পড়ে যাবে?






