বিশ্বসেরা ছাত্র ছিলেন বিবেকানন্দ: মানতেন শিক্ষকরা
Swami Vivekananda: পুনায় পান্ডুরঙ্গ রাওয়ের কাছে ফরাসি ভাষা শেখেন স্বামীজি। স্বামীজির লেখা যে চিঠিগুলি (৫০০ টির বেশি) পাওয়া যায়, তার মধ্যে দুটি ফরাসি ভাষায় লেখা।
একটি দোতলা বাড়ি। বাড়িটির চারিদিক জঙ্গলে ভরা। দারিদ্রতা বাড়িটির বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। একটা বড় গামলাতে তেলাকুচো পাতার ঝোল আছে, আর একটা থালাতে ভাত রান্না করে রাখা আছে। গামলাতে বুড়ো আঙুল চুবিয়ে ঝোল খাওয়া হচ্ছে সঙ্গে এক গরাস ভাত। ঘর বন্ধ করে সাধনা চলছে। আর সঙ্গে চলছে অবিরাম পঠন পাঠন।
শ্রীরামকৃষ্ণ চলে গেলেন ১৮৮৬ সালের ১৬ অগাস্ট। যে যুবকেরা তাঁকে ঘিরে থাকত তাদের মাথায় বাজ পড়ল। কী করবেন কোথায় গিয়ে থাকবেন কেউ জানে না। সেই যুবক দলের নেতা নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৮৮৪ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন, আর ১৮৮৬-তে ২৩ বছর বয়সে গুরুকে হারালেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহীভক্তদের অর্থানুকূল্যে বরানগরে একটি পোড়ো বাড়ি ভাড়া করা হয়। সেই বাড়ির বাসিন্দা নরেন্দ্রনাথ ও কালীপ্রসাদ পরবর্তীকালে যারা হন স্বামী বিবেকানন্দ ও স্বামী অভেদানন্দ, তাঁদের মধ্যে বেদান্ত দর্শন নিয়ে তর্ক লেগেই থাকত। মাঝে মধ্যেই সেই তর্ক দুপুর গড়িয়ে চলত বিকেল পর্যন্ত। নরেন্দ্র ডুবে যেতেন তাঁর জ্ঞানচর্চায়।
স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন নরেন্দ্রনাথ। বিখ্যাত দার্শনিক হাবার্ট স্পেনসরকে চিঠি লেখেন সেই সময়। টমাস কেম্পিসের, ‘দি ইমিটেশন অব ক্রাইস্ট' বইটির অনুবাদ শুরু করেছিলেন তিনি কিন্তু শেষ করে উঠতে পারেননি। বন্ধু বৈষ্ণবচরণ বসাকের সঙ্গে যৌথ ভাবে লেখেন সঙ্গীত কল্পতরু। এটি ছ'শোটির বেশি গানের সংকলন গ্রন্থ। সেখানে প্রবীণ কবিদের সঙ্গে বৈরীতে স্থান পেলেন তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কীভাবে গলা সাধতে হয় সেটি বোঝাতে নরেন্দ্রনাথ ভৈরব রাগে রচিত রবীন্দ্রনাথের গানের দু'কলি ব্যবহার করেছেন। শুধু গান নয়, কী ভাবে বাদ্যযন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়, বইটিতে তা-ও বিশদে লেখা আছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rabindranath and Swami Vivekananda:
নরেন্দ্রনাথের বই পড়ার স্টাইল ছিল একেবারে নিজস্ব। গৃহ শিক্ষক পড়াতেন আর নরেন শুয়ে শুয়ে পড়তেন। কোনো মাস্টারমশাই তাঁর ছাত্র শুয়ে শুয়ে পড়ছে তা মেনে নেবেন না কোনোদিন, কিন্তু নরেন এতটাই মেধাবী ছিলেন যে মাস্টার মশাই অনুমতি দিতেন।
বিখ্যাত দার্শনিক উইলিয়াম কেয়ার্ডের ছাত্র, স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টি খুব স্নেহ করতেন নরেন্দ্রকে। স্কটিশ চার্চ ছেড়ে অধ্যাপক হেস্টি অক্সফোর্ডে ফিরে যান। তিনি মানতেন, ইংল্যান্ড বা জার্মানির শ্রেষ্ঠ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নরেনের মতো ছাত্র পাওয়া যাবে না। নরেন্দ্রর মৌলিক চিন্তা জয় করেছিল মাস্টারমশাইদের স্নেহ, ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা। নরেনের বন্ধু বিখ্যাত দার্শনিক ব্রজেন্দ্র নাথ শীল বন্ধু নরেনের সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছেন,
বন্ধুদের প্রাণ, সামাজিক সম্মেলনের মধ্যমণি, নিঃসন্দেহে প্রতিভা ঝলকিত এক প্রেরণাদিব্য বোহেমিয়ান।
ছোট থেকেই নরেনের বই পড়ার প্রতি তীব্র আকর্ষণ ছিল। পাঠ্য বইয়ের মধ্যে তিনি নিজেকে কখনও আটকে রাখেননি। পাঠ্য বই ছাড়াও অন্যান্য বইও পড়তেন।
নরেন যখন ছোট, তখনই ইংরেজি শিখেছিলেন মা ভুবনেশ্বরী দেবীর কাছে। ভুবেনশ্বরী দেবী খুব সাবলীল ভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন। তিনজন বিদেশিনী ভুবনেশ্বরীর কাছে আসতেন ১৮৯৮ সালে। এই তিন জনের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্কা ওলি সারা ফুল। তিনি আমেরিকার নারীদের ভোটদানের অধিকার আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন। দ্বিতীয় জন আমেরিকার ধনী পরিবারের কন্যা জোসেফিন ম্যাকলাউড। তিনি ছিলেন মেধাবী এবং অত্যন্ত সাহসী। আর তৃতীয় জন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। তিনি ইংল্যান্ডে লেখিকা এবং শিক্ষিকা হিসেবে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন। পরবর্তী জীবনে মার্গারেট হয়ে উঠেছিলেন নিবেদিতা। ভুবনেশ্বরীর সঙ্গে তাঁরা দেখা করতে গেলে, ভুবনেশ্বরী তাঁদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথাবার্তা চালিয়ে যেতেন।
পরিব্রাজক বিবেকানন্দ এক গুরুভাইকে নিয়ে মিরাট বাহার এসেছিলেন। গুরুভাইটি তাঁর জন্য স্থানীয় লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে আসেন আর স্বামীজি মন দিয়ে সেই বই পড়ে ফেলেন। গুরুভাইটি বইটি নিয়ে যান লাইব্রেরিতে, ফেরত দিয়ে নতুন বই আনার জন্য। তখন, লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক বলেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Swami Vivekananda: বহু লোক এখনও বলেন যে, স্বামীজি 'কনট্রাডিক্টরি'। আসলে তারা কনটেক্সটকে পড়েন না। কনটেক্সট মাথায় রেখে যদি পড়া যায় তাহলে দেখা যাবে তিনি একেবারেই কন্ট্রাডিক্টরি নন।
যাঁর জন্য বই নিয়ে যাও, তিনি বইটি পড়েন নাকি শুধু নাড়াচাড়া করে তোমাকে দিয়ে আবার নতুন বই আনতে পাঠান।
এখনকার পরিভাষায় লাইব্রেরিয়ান জানতে চেয়েছিলেন তোমার বন্ধুটি কি blurb reader? অর্থাৎ বইয়ের মলাটে বইটির সম্বন্ধে যা লেখা আছে সেটি পড়েই পন্ডিত? গুরুভাইটি স্বামীজিকে নিয়ে লাইব্রেরিতে হাজির হলে, সেই লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকটি স্বামীজির কাছে জানতে চাইলেন, তিনি যে বইগুলি পড়েছেন তা তাঁর মনে আছে কিনা। স্বামীজি বিনীত ভাবে বললেন আপনি জিজ্ঞেস করুন। পড়া ধরতে শুরু করলেন লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক আর বিবেকানন্দ উত্তর দিচ্ছেন। বই পড়ার নানা ধরনের স্টাইল আছে। বিবেকানন্দ তাঁর পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শুষে নিতেন বইগুলির বিষয় আর তাই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বই পড়া শেষ করতে পারতেন।
তারপর পরিব্রাজক বিবেকানন্দ এসে পৌঁছন পুনাতে। পুনা সেই সময় ভারতের জ্ঞানচর্চা, বিশেষত ভারতীয় দর্শন চর্চার পীঠস্থান। এখনকার নালন্দা বলা যায়। আমেরিকাতে পণ্ডিতেরা স্বামীজিকে বলেছিলেন ইউরোপে কাজ করতে হলে তাঁকে ফরাসি বা জার্মান জানতে হবে। স্বামীজি ফরাসি ভাষা খুব ভালোবাসতেন। তাই, পুনায় পান্ডুরঙ্গ রাওয়ের কাছে ফরাসি ভাষা শেখেন স্বামীজি। স্বামীজির লেখা যে চিঠিগুলি (৫০০ টির বেশি) পাওয়া যায়, তার মধ্যে দুটি ফরাসি ভাষায় লেখা।
দ্বিতীয়বার তিনি যখন পাশ্চাত্যে যান ১৮৯৯ সালে, তখন স্বামীজি তাঁর ফরাসি চর্চা ঝালিয়ে নেন। ১৯০০ সালে প্যারিস বিজ্ঞান কংগ্রেসে স্বামীজি, দুটি বেদান্তের উপর বক্তৃতা দেন ফরাসি ভাষায়। তিনি জুলে বাওয়া বলে এক ফরাসি সাহিত্যিকের বাড়িতে থাকতেন শুধুমাত্র তাঁর সঙ্গে ফরাসি ভাষায় কথা বলবেন বলে। স্বামীজির খুব ভালো বন্ধু ছিলেন বিখ্যাত অপেরা গায়িকা মাদাম এমা কালভে। ইউরোপে তখন মাদামের বিশাল নাম ডাক। তিনি মহারানি ভিক্টোরিয়াকেও গান শুনিয়েছিলেন। কালভের লেখা থেকে জানা যায় স্বামীজি শুধুমাত্র ফরাসি ভাষায় কথাই বলতে পারতেন না, ফরাসি ভাষায় গানও গাইতে পারতেন। বিবেকানন্দের মৃত্যুর পরে মাদাম কালভে কলকাতায় এসেছিলেন। বেলুড় মঠে স্বামীজির সমাধি মন্দিরের সামনে বসে ফরাসি ভাষায় সেই গানগুলি গিয়েছিলেন, যেগুলি স্বামীজি গাইতেন এবং পছন্দ করতেন।
পরিব্রাজক স্বামীজি কাশিও যান। সেখানে ভারতীয় শাস্ত্র পড়েন প্রমদা দাস মিত্রের কাছে। তিনি শাস্ত্রে পন্ডিত ছিলেন। স্বামীজি, প্রমদা দাস বাবুকে বহু চিঠি লিখে শাস্ত্রের বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন স্বামীজির যে চিঠিপত্রের সংকলন পাওয়া যায়, তার প্রথম চিঠিটিই প্রমদা দাস বাবুকে লেখা, ১৮৮৮ সালে।
স্বামীজি খুব ভালো সংস্কৃত জানতেন। আমেরিকা থেকে গুরুভাইদের সংস্কৃত বই পাঠাতে বলতেন। ইংল্যান্ডে স্বামীজির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় বিখ্যাত জার্মান ইন্ডোলজিস্ট পল দয়েশনের। দয়েশন খুব ভালো সংস্কৃত জানতেন এবং দুজনের বন্ধুত্ব গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠেছিল তার কারণে। স্বামীজির সঙ্গে সংস্কৃতে কথা বলতেন দয়েশন এবং দুজনে লেক লুর্সানে বেড়াতেও গিয়েছিলেন।
স্বামীজি রাজযোগ ভক্তিযোগ জ্ঞানযোগ এবং কর্মযোগের উপর আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে বক্তৃতা দিয়েছেন। সেই বক্তৃতাগুলো শোনার জন্য অসম্ভব ভিড় হতো শ্রোতাদের। স্বামীজি রাজযোগের উপর বইও লিখেছিলেন কিন্তু সেই বইটি পাওয়া যায় না। কারণ তখনকার দিনে নিয়ম ছিল বইয়ের মালিকানা থাকবে শুধুমাত্র প্রকাশকের কাছে। স্বামীজি ইংল্যান্ডে নিয়মিত ছাপাখানাতে যেতেন। যাতে বইগুলিতে ছাপার কোনোরকম ভুল না থাকে। ফলে, বইগুলি দেখতে বেশ আকর্ষণীয়ও হতো।
স্বামীজি বুঝেছিলেন বুদ্ধিকে যদি ইতিবাচক চিন্তা অর্থাৎ positive thought দিয়ে ভরিয়ে না দেওয়া যায় তাহলে নেতিবাচক চিন্তায় বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে যায়। ১৮৯৯ সালের ১লা মাঘ প্রকাশিত হলো উদ্বোধন পত্রিকা। রামকৃষ্ণ মিশনের বাংলা মুখপত্র। স্বামীজির ইচ্ছা ছিল তিনটি ভাষায় দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করার এবং সেই খবরের কাগজ বিনা পয়সায় বিতরণ করার।
বাংলা ভাষায় চারটি বই লিখেছিলেন স্বামীজি। 'প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য', 'বর্তমান ভারত', 'ভাববার কথা' এবং 'পরিব্রাজক'। রবীন্দ্রনাথ 'পরিব্রাজক' পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। দীনেশ চন্দ্র সেনকে বলেন চলিত ভাষার কী জোর বিবেকানন্দ স্বামী আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। পূর্ব-পশ্চিমের মিলনের কী গভীর বোধ না পড়লে বিশ্বাস হতে চায় না।
স্বামীজি দ্বিতীয়বার পাশ্চাত্যে গিয়েছিলেন ১৮৯৯ সালে। সঙ্গে ছিলেন নিবেদিতা এবং গুরুভাই স্বামী তুরিয়ানন্দ। 'পরিব্রাজক' গ্রন্থে সেই সমুদ্রযাত্রার বর্ণনা তিনি লিখেছিলেন। চলিত ভাষায় বিভিন্ন দেশের কথা, তার ইতিহাস এবং নানা সময়ের নানা রসিকতা রয়েছে সেই গ্রন্থে। 'পরিব্রাজক' বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণ বৃত্তান্ত লেখার একটি পথিকৃৎ গ্রন্থ।







