ভারতে কমছে জন্মহার, কেন চিন্তায় বিশেষজ্ঞরা?

India fertility rate: ভারতের মোট প্রজনন হার প্রথমবারের মতো রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ২.১-এর নিচে নেমে এসেছে। একসময় জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশ এখন কেন জন্মহার কমে যাওয়ায় চিন্তিত?

inscript
৩ মিনিট
ভারতে কমছে জন্মহার, কেন চিন্তায় বিশেষজ্ঞরা?

একসময় বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া ভারতকে নিয়ে প্রধান উদ্বেগ ছিল জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া। পরিবার পরিকল্পনা, ছোট পরিবার গড়ার প্রচার এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নানা কর্মসূচি ছিল সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায়। সময় বদলেছে। এখন নতুন উদ্বেগ—ভারতে জন্মহার কমে যাচ্ছে।

ভারত সরকারের সাম্প্রতিক স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS) রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (TFR) নেমে এসেছে ১.৯-এ। অর্থাৎ একজন ভারতীয় নারী তাঁর জীবদ্দশায় গড়ে ১.৯টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। অথচ একটি দেশের জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন হয় ২.১-এর প্রজনন হার। এই সীমাকেই বলা হয় ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’। ভারতের ক্ষেত্রে সেই সীমার নিচে নেমে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

মাত্র কয়েক দশক আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সত্তরের দশকে ভারতের TFR ছিল ৫-এরও বেশি। নব্বইয়ের দশকে তা ৩.৬-এ নেমে আসে। আর এখন তা ১.৯। অর্থাৎ প্রায় অর্ধশতকে ভারতের পরিবার কাঠামো এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, নারীদের শিক্ষার হার বেড়েছে, শহুরে জীবনযাত্রা বিস্তৃত হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নত হয়েছে এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। পাশাপাশি সন্তান লালন-পালনের ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। ফলে অনেক দম্পতি এখন কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তামাকের জন্য বছরে লাখ লাখ মৃত্যু, তবু কেন কমছে না আসক্তি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি সর্বজনস্বীকৃত, তামাকের বহুল ও ব্যাপক ব্যবহারই এই অ-সংক্রামক রোগগুলির প্রধান কারণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—ভারতবর্ষে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যানসারের মূল কারণ হলো তামাকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

তবে প্রশ্ন হলো, জন্মহার কমে যাওয়া কি খারাপ খবর?

কম জনসংখ্যা মানেই কম চাপ। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর চাপ কমবে। পরিবেশের উপরও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ এবং জনসংখ্যাবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এর উল্টো প্রভাবও দেখা দিতে পারে।

ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল তার বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধাই গত দুই দশকে ভারতের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু জন্মহার যদি দীর্ঘদিন ধরে কম থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করবে।

এর ফলে শ্রমবাজারে কর্মীর অভাব দেখা দিতে পারে। শিল্প, পরিষেবা এবং কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে, যাঁদের দেখভাল ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য সরকারের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জাপানের অস্তিত্বই মুছে যাবে পৃথিবী থেকে! কেন এমন আশঙ্কার কথা শোনালেন প্রধানমন্ত্রী?

Japan Disappered Prime Minister Worry : জাপান দেশটারই হয়তো অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু হঠাৎ কী এমন সংকট দেখা দিল পূর্ব এশিয়ার এই দেশে?

এই পরিস্থিতির উদাহরণ ইতোমধ্যেই দেখা গিয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের একাধিক দেশে। সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এতটাই কমে গিয়েছে যে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভারত অবশ্য এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কারণ দেশের মোট জনসংখ্যা এখনও বিপুল এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাতও অনেক বেশি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী কয়েক দশকে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে ভারতও।

তবে, ভারতের সব রাজ্যে পরিস্থিতি এক নয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড এবং ছত্তীসগঢ় এখনও রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের উপরে রয়েছে। অন্যদিকে দিল্লির মতো অঞ্চলে প্রজনন হার মাত্র ১.২। অর্থাৎ দেশের ভেতরেই জনসংখ্যাগত বৈষম্য ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

শহর ও গ্রামের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। শহরাঞ্চলে ছোট পরিবার এখন প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। কর্মজীবী দম্পতিদের মধ্যে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক বেশি পরিকল্পিত। অনেক ক্ষেত্রে একটি সন্তানের বেশি নেওয়ার ইচ্ছাও দেখা যায় না। গ্রামাঞ্চলেও একই প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন প্রশ্ন উঠে আসছে। যদি ভবিষ্যতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরও কমে যায়, তাহলে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য কী করা হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখন উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, দক্ষ কর্মী তৈরি করা এবং নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উপর জোর দিতে হবে। কারণ কর্মক্ষমতাই হবে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।

অনেক গবেষক আরও মনে করেন, জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, সামাজিক কারণও রয়েছে। উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবনের চাপ, বাড়তি জীবনযাত্রার খরচ এবং সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের পরিবার পরিকল্পনার ধরন বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত এবং শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

ভারতের সামনে তাই এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক আগে যে দেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্বিগ্ন ছিল, আজ সেই দেশকে ভাবতে হচ্ছে জনসংখ্যা হ্রাসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে। অবশ্যই এটি তাৎক্ষণিক সংকট নয়। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা এবং তরুণ কর্মশক্তি এখনও দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু জন্মহারের ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।

সুপারমার্কেটের শাকে নয়, বুনোশাকেই রয়েছে বেশি পুষ্টিগুণ

Wild leafy greens: Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ।