ভারতে কমছে জন্মহার, কেন চিন্তায় বিশেষজ্ঞরা?
India fertility rate: ভারতের মোট প্রজনন হার প্রথমবারের মতো রিপ্লেসমেন্ট লেভেল ২.১-এর নিচে নেমে এসেছে। একসময় জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশ এখন কেন জন্মহার কমে যাওয়ায় চিন্তিত?
একসময় বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া ভারতকে নিয়ে প্রধান উদ্বেগ ছিল জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া। পরিবার পরিকল্পনা, ছোট পরিবার গড়ার প্রচার এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের নানা কর্মসূচি ছিল সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায়। সময় বদলেছে। এখন নতুন উদ্বেগ—ভারতে জন্মহার কমে যাচ্ছে।
ভারত সরকারের সাম্প্রতিক স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (SRS) রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (TFR) নেমে এসেছে ১.৯-এ। অর্থাৎ একজন ভারতীয় নারী তাঁর জীবদ্দশায় গড়ে ১.৯টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। অথচ একটি দেশের জনসংখ্যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন হয় ২.১-এর প্রজনন হার। এই সীমাকেই বলা হয় ‘রিপ্লেসমেন্ট লেভেল’। ভারতের ক্ষেত্রে সেই সীমার নিচে নেমে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
মাত্র কয়েক দশক আগেও চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সত্তরের দশকে ভারতের TFR ছিল ৫-এরও বেশি। নব্বইয়ের দশকে তা ৩.৬-এ নেমে আসে। আর এখন তা ১.৯। অর্থাৎ প্রায় অর্ধশতকে ভারতের পরিবার কাঠামো এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, নারীদের শিক্ষার হার বেড়েছে, শহুরে জীবনযাত্রা বিস্তৃত হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নত হয়েছে এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। পাশাপাশি সন্তান লালন-পালনের ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। ফলে অনেক দম্পতি এখন কম সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি সর্বজনস্বীকৃত, তামাকের বহুল ও ব্যাপক ব্যবহারই এই অ-সংক্রামক রোগগুলির প্রধান কারণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—ভারতবর্ষে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যানসারের মূল কারণ হলো তামাকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
তবে প্রশ্ন হলো, জন্মহার কমে যাওয়া কি খারাপ খবর?
কম জনসংখ্যা মানেই কম চাপ। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর চাপ কমবে। পরিবেশের উপরও কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ এবং জনসংখ্যাবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এর উল্টো প্রভাবও দেখা দিতে পারে।
ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল তার বিপুল কর্মক্ষম জনসংখ্যা। বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধাই গত দুই দশকে ভারতের উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু জন্মহার যদি দীর্ঘদিন ধরে কম থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করবে।
এর ফলে শ্রমবাজারে কর্মীর অভাব দেখা দিতে পারে। শিল্প, পরিষেবা এবং কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়বে, যাঁদের দেখভাল ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য সরকারের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Japan Disappered Prime Minister Worry : জাপান দেশটারই হয়তো অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু হঠাৎ কী এমন সংকট দেখা দিল পূর্ব এশিয়ার এই দেশে?
এই পরিস্থিতির উদাহরণ ইতোমধ্যেই দেখা গিয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের একাধিক দেশে। সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এতটাই কমে গিয়েছে যে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারত অবশ্য এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কারণ দেশের মোট জনসংখ্যা এখনও বিপুল এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাতও অনেক বেশি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী কয়েক দশকে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে ভারতও।
তবে, ভারতের সব রাজ্যে পরিস্থিতি এক নয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড এবং ছত্তীসগঢ় এখনও রিপ্লেসমেন্ট লেভেলের উপরে রয়েছে। অন্যদিকে দিল্লির মতো অঞ্চলে প্রজনন হার মাত্র ১.২। অর্থাৎ দেশের ভেতরেই জনসংখ্যাগত বৈষম্য ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
শহর ও গ্রামের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। শহরাঞ্চলে ছোট পরিবার এখন প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে। কর্মজীবী দম্পতিদের মধ্যে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক বেশি পরিকল্পিত। অনেক ক্ষেত্রে একটি সন্তানের বেশি নেওয়ার ইচ্ছাও দেখা যায় না। গ্রামাঞ্চলেও একই প্রবণতা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন প্রশ্ন উঠে আসছে। যদি ভবিষ্যতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরও কমে যায়, তাহলে অর্থনীতি সচল রাখার জন্য কী করা হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তখন উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, দক্ষ কর্মী তৈরি করা এবং নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উপর জোর দিতে হবে। কারণ কর্মক্ষমতাই হবে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।
অনেক গবেষক আরও মনে করেন, জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, সামাজিক কারণও রয়েছে। উচ্চশিক্ষা, কর্মজীবনের চাপ, বাড়তি জীবনযাত্রার খরচ এবং সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের পরিবার পরিকল্পনার ধরন বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত এবং শহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
ভারতের সামনে তাই এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কয়েক দশক আগে যে দেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্বিগ্ন ছিল, আজ সেই দেশকে ভাবতে হচ্ছে জনসংখ্যা হ্রাসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে। অবশ্যই এটি তাৎক্ষণিক সংকট নয়। ভারতের বিশাল জনসংখ্যা এবং তরুণ কর্মশক্তি এখনও দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। কিন্তু জন্মহারের ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।






