বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পর্বান্তরের মুখে দাঁড়িয়ে কয়েকটি জরুরি কথা

সাধারণভাবে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা ধারণা আছে যে আমরা এই কেসটাতে হেরে যাই। এমনকী যেদিন আমাদের আপিলটি হাইকোর্টে ডিসমিসড হয় সেদিন স্বরূপের নির্দেশে নানা শুটিং ফ্লোরে মিষ্টি বিতরণ হয়, যেন তারা মামলাটা জিতে গিয়েছেন। আদপে এরকম কিচ্ছু ঘটেনি।

Indranil Roychowdhury
২০ মিনিট
বাংলা ইন্ডাস্ট্রির পর্বান্তরের মুখে দাঁড়িয়ে কয়েকটি জরুরি কথা

বিধিবদ্ধ সতর্কবার্তা: লেখাটি লম্বা। কিঞ্চিৎ ডকুমেন্ট ধর্মী। বিষয় সম্বন্ধে উৎসাহী না হলে হাই ওঠার সম্ভাবনা আছে।

সম্প্রতি রাজ্যে পালাবদলের ফলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের জল্পনার অবতারণা হয়েছে। কে বা কারা দায়িত্ব নেবেন (পরিভাষায় সামলাবেন), তার ফলে ব্যবহারিক স্তরে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে, ইত্যাদি। সাধারণত গণপরিসরের চরিত্র অনুযায়ী এই ধরনের আলোচনা কিছু পরিচিত ব্যক্তিত্ব এবং তাদের ব্যক্তিগত সাম্প্রতিক অবস্থানের বাইরে বের হতে চায় না। ফলে মূল বিষয়গুলি আড়ালে থেকে যায়। সেগুলিতে ঢোকার আগে একটা সংক্ষিপ্ত সাম্প্রতিক ইতিহাস একটু ঝালিয়ে নিই।

২০২৪-এর শেষ থেকে ২০২৫-এর মাঝামাঝি অবধি টালিগঞ্জে ফেডারেশনের কর্ণধার ও তৃণমূল নেতা স্বরূপ বিশ্বাসের একাধিক তুঘলকি কাজকর্মের বিরুদ্ধে প্রথমে যে অসন্তোষ এবং তার পরবর্তীতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতে শুরুর দিকে বহু মানুষ থাকলেও ধীরে ধীরে সংখ্যাটা কমতে কমতে মাত্র ১২ জনে এসে ঠেকে।

বহু মানুষ কাজ হারানোর ভয়ে প্রথমে প্রতিবাদ করেও তারপরে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হন। যে ১২ জন শেষ অবধি ছিলেন, তারা প্রত্যেকে কেউ এক, কেউ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কর্মহীন থাকতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু কর্মহীন থাকা নয়, হাইকোর্টে একটি মামলা চালাতে গেলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লাগে, ভাগাভাগি করে সামর্থ্য মতো ওই অবস্থাতেও তারা ব্যক্তিগতভাবে তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। স্বরূপবাবু ও তার হাতে গোনা কিছু সমর্থক অবশ্য "এই আন্দোলনটি প্রযোজকদের টাকায় ও প্ররোচনায় হচ্ছে" এই রকম একটি সর্বৈব মিথ্যে মিডিয়া ও কোর্টের সামনে বারবার পেশ করে গিয়েছেন।

যারা ব্যক্তিগতভাবে এই মূল্য দিয়েছেন, তারা নিজেদের স্বার্থে লড়েননি। খালি চোখে দেখলেই বোঝা যায় তাঁদের এখানে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু পাওয়ার ছিল না। তারা বারবার কিছু সংস্কারের কথা বলেছেন, যে সংস্কার সার্বিকভাবে বাংলা ছবির বেঁচে থাকা এবং উন্নতির জন্য অতি আবশ্যক ছিল এবং এখনও আছে। দুঃখের বিষয়, সাধারণভাবে বাংলা ইন্ডাস্ট্রি থেকে তারা সেই সময় খুব একটা সাহায্য পাননি। যেটুকু পেয়েছেন, তা ব্যক্তিগত স্তরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

আমি ওই ১২ জনের মধ্যে একজন। গত দেড় থেকে দু-বছরে আমার ব্যক্তিগত ক্ষতির তালিকা পেশ করে এই নতুন জমানায় শহিদ-সম্মানের কোনো বাসনা আমার নেই। কিন্তু এই সময়টুকু আমি এই ইন্ডাস্ট্রির কর্মপদ্ধতি এবং তার সমস্যাগুলি খুব কাছ থেকে দেখা ও তা নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছি (অখণ্ড বেকারত্বের কারণেই হয়তো)। তখন নানা ভাবে যে কথাগুলি কোর্টে বা গণমাধ্যমের কাছে বলার চেষ্টা করেছিলাম তার তাৎপর্য এক বিন্দুও কমেনি। এই সন্ধিক্ষণে, সেগুলি পুনরাবৃত করার একটি সুযোগ এসেছে। সেইটুকু সদ্ব্যবহার করতে চাই। বারবার বললেও সাধারণভাবে সামাজিক মাধ্যমে আমাদের মূল কথাগুলি খুব বেশিদূর যায়নি। আলোচনাগুলি ব্যক্তিত্বের সংঘাত, ‘গট-আপ গেম’, কিছু পরিচিত মুখের ব্যান হওয়ায় বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ-এর মধ্যেই ঘোরাঘুরি করেছে। সমস্যা গভীর এবং সেটা বুঝতে চাইলে একটু শুরু থেকে শুরু করতে হবে।

[ফেডারেশন একটি ছাতা সংস্থা। একটি ট্রেড ইউনিয়ন, যা ইন্ডাস্ট্রির ২৬টি ওয়ার্কার্স গিল্ডের (তারাও ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতিনিধি দিয়ে তৈরি। অভিনেতাদের সংস্থা আর্টিস্টস’ ফোরাম, ফেডারেশনের অংশ নয়। এই শব্দগুলি বারবার ব্যবহার হবে। যারা বিষয়গুলির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন, তাদের বোঝার সুবিধার জন্য জানিয়ে রাখলাম]

১। স্বরূপ বিশ্বাস বাংলা ইন্ডাস্ট্রির মূল রোগ নন, উপসর্গ মাত্র।

তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে বিনোদন জগতের সম্পর্ক শুরু থেকেই বহুমুখী ও নানা স্তরীয়। সেখান থেকেই নিয়ন্ত্রণের একটা প্রয়োজন তৈরি হয়। সেই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে কাকে বাছা হলো? যিনি টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক, তার ভাইকে। এটাই তার একমাত্র যোগ্যতা। এই একই যুক্তিতে বিধাননগরের বিধায়কের শালাকে আইটি ইন্ডাস্ট্রি আর যাদবপুরের বিধায়কের ভগ্নিপতিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারত। ভাগ্যক্রমে দেওয়া হয়নি। কিন্তু ছবির ক্ষেত্রে যে এই দায়িত্বটা দেওয়া গেল, এটা কাকতালীয় নয়।

সাধারণভাবে সমাজ, এবং তার সূত্রে যে কোনো ক্ষমতার কেন্দ্র, সিনেমা শিল্পকে কী চোখে দেখে, এই সিদ্ধান্তে সেটাই প্রকট হয়। এই দেখাটা ‘রেজিম-নিরপেক্ষ’, এটা মাথায় রাখাটা জরুরি। কে আমাকে কীভাবে দেখবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমি নিজেকে কীভাবে দেখাতে চাইছি।

ফেডারেশনের সভাপতি হতে গেলে, বেশ কিছুদিন যাবৎ কোনো গিল্ডের সক্রিয় সদস্য হওয়ার প্রয়োজন। স্বরূপ বিশ্বাস জীবনে কোনো ছবিতে কাজ না করে, এক সন্ধ্যায় অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরস গিল্ডের সদস্যপদ পেয়ে গেলেন। বলে রাখা ভালো, বহু কৃতি সহকারী পরিচালক দীর্ঘ ১০–১৫ বছরের বেশি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার পরেও এই কার্ডটি পেতে আজও সফল হননি। কারণ গিল্ড কার্ড ইস্যু করে তার ইচ্ছামতো। সেই ইচ্ছা, নানাভাবে ব্যক্তি স্বার্থ ও স্থানীয় রাজনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

এখানে মজাটা হলো, তৃণমূলে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির অভাব ছিল না। স্বাভাবিক নিয়মেই তাদের ভিতরেই কাউকে কাজটা দেওয়া যেত। তাদের যোগ্যতা নিয়ে নানা মতামত থাকতে পারে, কিন্তু সরাসরি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত কোনো মানুষ, তিনি যে দলই করুন না কেন, ইন্ডাস্ট্রির প্রভূত ক্ষতি হয়, এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ৫০ বার ভাববেন। বা, যে কোনো সিদ্ধান্তের সময় সহকর্মীদের সঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মেই আলোচনায় বসবেন। স্বরূপের সেই বালাই ছিল না। তিনি ট্রেনিং পেয়েছিলেন রিয়েল এস্টেট সিন্ডিকেট থেকে। এবং শুরু থেকেই সেই মডেলেই বাংলা ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে গিয়েছেন। নিজের লাভ এবং ক্ষমতা ছাড়া তার কোনো এজেন্ডা থাকার কোনো কারণ কোনোদিনই ছিল না।

এই ধরনের মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ কখনোই একদিনে তৈরি হয় না। শুরুতে যাকে বলে বেবি স্টেপস, সেগুলি নিয়ে জল মাপা হয়। মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সেটা বুঝতে কিছুটা সময় লাগে। এই পুরো সময়টা টালিগঞ্জের গণ্যমান্যরা (দেখাদেখি ছোটরাও) স্বরূপ বিশ্বাসকে একটা খোলা মাঠ ছেড়ে দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ অবৈধ এই নিয়োগের তারা বিরোধ করলেন না, একবারের জন্যও বললেন না যে তাদের মধ্যেই অনেকেই আছেন যারা এই কাজটি অনেক ভালোভাবে করতে পারবেন। বরং প্রত্যেকটা অবাস্তব অলীক পদক্ষেপে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতি জানালেন। স্বরূপের দোষ নেই, অচিরেই তিনি ভাবতে শুরু করলেন যে এই ইন্ডাস্ট্রিটা তার ব্যক্তিগত জমিদারির অংশ। তার আচরণগুলিও সেই সাক্ষ্যই দিতে লাগল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টলি কেলেঙ্কারি: সিনেমাপাড়ায় থ্রেট কালচারই শেষ কথা?

Tollygunge Threat Culture: টালিগঞ্জে উপরে-নীচে, ডাইনে-বাঁয়ে বহিষ্কারের খাঁড়া ঝোলানো। যে খাঁড়ায় বলি হচ্ছেন সাধারণ টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে পরিচালক সকলেই। খাঁড়া কার হাতে?

পরবর্তীতে তৃণমূল নেতৃত্বের কাছে নিশ্চয়ই কিছু নালিশ ও আবেদন-নিবেদন হয়েছে, কিন্তু ততক্ষণে জল অনেক দূর গড়িয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজনীয়, স্বরূপ তার তরফ থেকে সেই কাজগুলি নিশ্চয়ই দক্ষতার সঙ্গে করে যেতে পারছিলেন। অন্যথায় তার এই সুদীর্ঘ রাজত্বের কোনো ব্যাখ্যা মেলে না।

স্বরূপের আচরণ যতই কুৎসিত হোক, তার পিছনে enabling-এর যে দীর্ঘ ইতিহাস আছে এটাকে বাদ দিয়ে বিষয়টা দেখলে সেই দেখাটা নেহাতই একপেশে হবে। এটা আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার, কারণ ক্ষমতা বদলালেও ক্ষমতাশালীর দৃষ্টিকোণ অধিকাংশ সময়ই খুব একটা পাল্টায় না। আর এক্ষেত্রে যেটা কৃষিভূমি বা substrate, সেটাও তার সর্বাঙ্গীণ চরিত্র নিয়ে একই থেকে যাচ্ছে। দুটি অনুঘটক এক থাকলে, সময়ে বিশেষে, ফলাফল আলাদা হয় কি না এই নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে।

২। ইন্ডাস্ট্রির ক্ষমতাশালীরা রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন। এটা বোধহয় আর বিতর্কের বিষয় নয়। কেন করেন? আগে তো এতটা করার প্রয়োজন হতো না। প্রাথমিকভাবে তৃণমূল সরকার বাংলা ইন্ডাস্ট্রির জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাতে যে একটা পরিষ্কার অলিখিত quid pro quo ছিল, এটা বোধহয় তখন আনাড়িরাও জানতো। তবু এই আত্মসমর্পণ কীভাবে সম্ভব হল? (এই আত্মসমর্পণ বা অতি উৎসাহের লক্ষণ নতুন জমানাতেও প্রতিদিন আরও প্রকট হচ্ছে, সেই কারণেই এটা আরও জোর দিয়ে বলা উচিত)।

মিডিয়ার প্রভাবেই হোক, ভোগবাদের সাধারণ বিস্ফোরণের ফলেই হোক, বা টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছাতেই হোক (এটা দীর্ঘ বিষয়, এখানে কারণগুলি নিয়ে আলোচনা না করাই শ্রেয়), সাদা চোখে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে জীবনযাত্রার যে প্রত্যাশা দেখি, তা অংকের সমস্ত নিয়মে অলীক লাগে। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসার স্বর্ণযুগের কুশীলবদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে এখনকার চূড়ান্ত দুর্দশায়, খুব সাধারণ উঠতি পরিচালক বা অভিনেতাদের জীবনযাত্রার মানের ফারাক দেখলেই এটা পরিষ্কার হয়।

সত্যি হলেও এটা মনে করিয়ে দিতে হয় যে সত্যজিৎ রায় সারা জীবন ভাড়াবাড়িতে থেকেছেন। মৃণাল সেন তার কেরিয়ারের তুঙ্গেও নিতান্তই এক মধ্যবিত্ত জীবন কাটিয়েছেন। তরুণ মজুমদার সমেত বহু বাণিজ্য সফল পরিচালকের জীবনও নেহাতই অনাড়ম্বর ছিল। এখনকার একজন উঠতি অ্যাসিস্ট্যান্টও এই ধরনের জীবনযাপনকে আর কোনো বাস্তব অপশন বলে মনে করেন না।

এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রত্যাশা মানুষকে নানাবিধ অবাস্তব কম্প্রোমাইজের দিকে নিরন্তর ধাবিত করে। সেই কম্প্রোমাইজ প্রতি স্তরে ইন্ডাস্ট্রির কার্যকলাপ, তার গতিপ্রকৃতি এবং ক্ষুদ্রস্তরে প্রত্যেকটা ছবি তৈরির প্রক্রিয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই বাস্তবতাকে চোখ ঠেরে একটা ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সম্ভব কি না আমার জানা নেই। এই প্রত্যাশার সংস্কৃতি এক সার্বিক মেনে নেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

একটা ক্ষয়িষ্ণু, মৃতপ্রায় অবস্থা থেকে কোনোক্রমে কিছু খুঁটে বাড়ি নিয়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছা থেকেই দিনের আলোয় ঘটে যাওয়া সমস্ত অন্যায়গুলির থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়। ছোটদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, তারা গুরুজনদের থেকেই শেখে।

৩। এই মুহূর্তে যে অবস্থায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তাতে প্রাথমিক যে প্রশ্নগুলি বারবার ঘুরেফিরে মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, তার মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে—নতুন সরকার আমাদের জন্য কী করবে? কী পাব আমরা? স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারব কী?

এই প্রশ্নগুলির বৈধতা নিয়ে কথা বলার আগে একটা জিনিস মাথায় রাখা বোধহয় জরুরি। পৃথিবীর কোনো সফল ইন্ডাস্ট্রি কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয়নি। তারা স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে হাঁটতে শিখলে স্বাভাবিকভাবেই সরকার তার সঙ্গে নানাভাবে এনগেজ করতে শুরু করে। তারাও তখন ঠিক স্বরে দাবি জানাতে পারে।

প্রথম দিনেই আমাদের স্বাধীনতার দায় যদি আমরা অন্য লোকের হাতে তুলে দিই, পরে আর নালিশ করার কোনো জায়গা থাকে না। গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সামান্য কিছু শিখে থাকলে আমাদের দাবি হওয়া উচিত—ফেডারেশনের দায়িত্ব ন্যস্ত হওয়া উচিত এমন মানুষদের হাতে যারা দীর্ঘদিন ইন্ডাস্ট্রিতে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং যারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা মুখপাত্র নন।

রাজনীতির লোক স্বাভাবিক নিয়মেই থাকবেন। কিন্তু তাদের প্রাথমিক পরিচয় হবে তারা ছবির জগতের লোক। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আলোচনায় বসলে যে প্যারাডাইম তৈরি হবে, তার থেকে ভবিষ্যতে নিস্তার পাওয়া কঠিন। তারা না চাইলেও শেষমেশ তারা ইন্ডাস্ট্রি ও সরকারের মাঝখানের সাঁকো হয়ে থাকবেন।

অবশ্যই প্রয়োজনে ক্ষমতাসীন দল বা সরকারের সঙ্গে নানা ধরনের আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনে বসতে হবে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির পরিচালনার ক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতির কোনো ভূমিকা বাঞ্ছনীয় নয়। এটা দল বা ইন্ডাস্ট্রি, কারোর জন্যই শেষমেষ ভালো ফল দেয় না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টলি কেলেঙ্কারি: স্বরূপ বিশ্বাসের উত্থান কখন, কীভাবে, কতটা?

Tollygunge Threat Culture: অন্যায্য ভাবে গিল্ডের কার্ড দখল, তোলাবাজি, সিন্ডিকেটে নাম জড়ানো, কীভাবে টালিগঞ্জের কেউকেটা হলেন স্বরূপ বিশ্বাস?

এই কথাটা লিখলাম বটে, কিন্তু লিখতে লিখতেই মনে হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় অংশ এটা আর ভিতর থেকে বিশ্বাস করেন কি না আমি জানি না। দীর্ঘদিন আনুগত্যের অভ্যাস থাকলে প্রভুর অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। অভ্যাস এক থাকে, প্রভু পাল্টে যায়। বন্দে মাতরম, জনগণমন—কোনোটাই নয়, আমাদের গোপন জাতীয় সংগীত বহুদিন আগে তরুণ মজুমদার উৎপল দত্তের মুখে বসিয়ে গিয়েছেন—

কৃপা করে করো মোরে রায় বাহাদুর…

এটা যদি ভুল ভেবে থাকি, সবচেয়ে খুশি আমিই হব।

৪। গোল গোল আলোচনা ছেড়ে এবার কিছু ফাংশানাল বিষয়ে আসা যাক। স্বরূপ বিশ্বাস ও তার সঙ্গীরা নানা সময় দাবি করেছেন যে ফেডারেশনের সদস্য সংখ্যা আট থেকে দশ হাজারের মধ্যে। এই সংখ্যাটির অস্পষ্টতার কারণ আছে। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে যেতে গেলে জটিল দুর্নীতি ও স্থানীয় রাজনীতির গল্পে যেতে হয়। সেটা এই মুহূর্তে আমাদের আলোচনার পরিসরের বাইরে।

সংখ্যাটা যাই হোক, আমরা বহুবার হিসাব করে দেখেছি, এই মুহূর্তে বাংলা ছবির প্রোডাকশনের বর্তমান যা সংখ্যা, তাতে এক হাজার থেকে দেড় হাজারের বেশি কলাকুশলীর কোনোভাবেই নিয়মিত কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ ঘোষিত কলাকুশলীদের ৮০ থেকে ৯০% কর্মহীন। তাদের গিল্ডের কার্ড আছে বটে, কিন্তু জীবিকা নির্বাহ অন্যভাবে করতে হয়।

ভয়ানকভাবে কাজ কমে যাওয়ার মধ্যে বৈশ্বিক ও জাতীয় নানা কারণ থাকলেও, কলকাতার ক্ষেত্রে স্বরূপ বিশ্বাস ও তার ফেডারেশনের করা অবাস্তব অলীক নিয়মাবলীও একটি অন্যতম কারণ। এই নিয়মাবলীর পক্ষে যুক্তি সাজাতে গিয়ে তারা সারাক্ষণই বলে গিয়েছেন যে এগুলি টেকনিশিয়ানদের স্বার্থ রক্ষার্থে অনিবার্য। বাস্তবে এই নিয়মগুলির কারণে স্থানীয় প্রোডাকশন যেমন বিনিয়োগ হারিয়েছে, তেমনই আগে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে বহু প্রযোজনা সংস্থা বাংলায় কাজ করতে আসতেন, তা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। উল্টে বিজ্ঞাপন ও কর্পোরেট জাতীয় নানা ছবির কাজকর্ম অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। হু হু করে কাজের সংখ্যা কমে গিয়েছে। আদতে সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কলাকুশলীরাই।

এই নিয়মের তালিকা লম্বা। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত প্রায় সমস্ত মানুষই এর সঙ্গে মোটামুটি অবহিত। যারা সরাসরি জড়িত নন তাদের বোঝার সুবিধার জন্য কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি। নিয়মগুলি কাগজে-কলমে এখনও বলবৎ আছে, যদিও ইলেকশনের পরে এই মুহূর্তে কে কী মানছেন আর মানছেন না, বলা মুশকিল।

ক) পরিচালক বা প্রযোজক তাদের পছন্দের সংখ্যার কলাকুশলী নিয়ে কোনো শুটিং করতে পারবেন না। ফেডারেশনের বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম টেকনিশিয়ানের সংখ্যা ছাড়া কোনো শুটিংয়ের অনুমতি তারা দেবেন না। করলে সেটাকে 'গুপি শুটিং' আখ্যায়িত করা হবে। এবং সুযোগ ও পাত্র বুঝে পরিচালক ও প্রযোজকের হাত মুচড়ে মূল্য ধরে জরিমানা আদায় করা হবে। বলাই বাহুল্য এই নিয়ম অবাস্তব এবং কর্মবিরোধী। একটা রোলের দোকানে ক'জন কর্মচারী কাজ করবেন সেটা নিতান্তই নির্ভর করে রোলের দোকানের বিক্রির উপর। ৫০টা বিক্রি হলে একরকম, ৫০০টা বিক্রি হলে আরেকরকম। যিনি দোকান চালান, একমাত্র তিনিই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী। এই নিয়ম রোলের দোকান থেকে অত্যাধুনিক গাড়ি তৈরির কারখানাতে একইভাবে বলবৎ। ব্যতিক্রম বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। আপনার পছন্দের টেকনিশিয়ান যদি ফেডারেশনের সদস্য না হয়, তাহলে ফেডারেশনের সদস্যদের নেওয়ার পরেই আপনি তাকে নিতে পারবেন। আবার উল্টোদিকে ফেডারেশন/গিল্ড তাদের ইচ্ছা ও সুবিধামতো লোকেদের সদস্যপদ দেবে। ফলে চাইলেই কোনো টেকনিশিয়ান সেই কার্ড পাবে না। বিশাল সংখ্যক কলাকুশলী দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও এই কারণে কাজ পান না। এমনকী রাজ্য সরকারের নিজস্ব ফিল্ম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রূপকলা বা কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরা ডিপ্লোমা পাওয়ার পরে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরও গিল্ডের কার্ড পান না।

খ) শুটিংয়ের আগে কলাকুশলীর লিস্ট পাঠিয়ে ফেডারেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ফেডারেশনের সদস্যরা আউটডোরে কোথাও গেলে তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তার তালিকা ফেডারেশনের কাছে থাকা উচিত। কিন্তু আউটডোর বা কলকাতা, যে কোনো শুটিং-এ এই পারমিশন নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এর আসল উদ্দেশ্য ছিল অন্য, যে পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা বা টেকনিশিয়ান ফেডারেশনের বশংবদ বা বাধ্য নয়, শুটিংয়ের একদিন আগে তাদের কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে ফেডারেশনের দেওয়া শর্তাবলী তাদেরকে মানতে বাধ্য করার এটা ছিল অন্যতম সহজ উপায়। আমাদের আন্দোলনের সময় স্বরূপ বিশ্বাস ও তার দলবল এই পদ্ধতি খুব দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে অনেককে তাদের আওতায় আসতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে আমাদের আন্দোলনে তোলা কিছু প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এই নিয়মকে আরও কড়া করে প্রি-প্রোডাকশনের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়। শেষমেষ বিষয়টা এমন জায়গায় দাঁড়ায়—যে কোনো কলাকুশলীকে লোকেশন দেখতে যাওয়ার আগেও ফেডারেশনের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।

গ) সিরিয়ালের নিয়ম ওটিটিতে চাপিয়ে, কোনো ওয়েব সিরিজকে দিনে ১৪ ঘণ্টার বেশি শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয় না। সিরিয়ালের দিনে ১৪ ঘণ্টার শুটিংয়ের নিয়ম বলবৎ। সেই নিয়ম সাধারণভাবে সমর্থনযোগ্য। কিন্তু কোনোদিন আধঘণ্টা বেশি লাগলেও ফেডারেশন থেকে অনুমতি ব্যতিরেকে তা করতে দেওয়া হয় না।

ঘ) ছোট ছবির (ত্রিশ লাখের বাজেটের নিচে—এটা ছোট ছবির বাজেট ওরা কী উপায়ে ঠিক করলেন ওরাই জানেন) ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হয় কলাকুশলীর সংখ্যার ক্ষেত্রে। তার বদলে তারা কোন ক্যামেরায় শুট করবেন, কোন ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করবেন সেটাও ফেডারেশন নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকার রাখে।

ঙ) ছবিতে ট্র্যাক ট্রলি ব্যবহার না থাকলেও দু'জন ট্রলি অপারেটর নেওয়া বাধ্যতামূলক। আউটডোর শুটে গেলেও, একজন catwalk technician-কে (যাকে শুধুমাত্র স্টুডিওতে প্রয়োজন) নিয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টলি কেলেঙ্কারি: বিস্ফোরক হিসাব খাতা ফাঁস! চরম দুর্নীতি সিনেমাপাড়াতেও?

Tollygunge Audit Scam: ফেডারেশনের জমা করা তিন বছরের (২০১৯ থেকে ২০২১) অডিট রিপোর্ট হাতে পেয়েছে ইনস্ক্রিপ্ট। ছত্রে ছত্রে আর্থিক তছরুপের চিহ্ন স্পষ্ট! এত টাকা যাচ্ছে কোথায়?

চ) ন্যূনতম ১৯ জন ফেডারেশনের কলাকুশলী না নিয়ে গেলে বিদেশে ইউনিট নিয়ে শুটিং করার অনুমতি পাওয়া যায় না।

ছ) বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ, বাংলা ছাড়া যে কোনো ভারতীয় ভাষার ছবির ক্ষেত্রে কলাকুশলীদের পারিশ্রমিক দ্বিগুণ, যে কোনো অভারতীয় ভাষার (এর মধ্যে ইংরেজিও আছে) ছবির জন্য পারিশ্রমিক চারগুণ।

এই ফিরিস্তি লম্বা। বলাই বাহুল্য ভারতবর্ষের কোথাও কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে এই ধরনের অলীক অবাস্তব নিয়ম-মালা চালু নেই। কিন্তু এর ফল সহজ এবং ছোট্ট। আমরা বেশ কয়েকবার হিসাব করে দেখেছি একটি এক কোটি টাকার ছবিতে, প্রায় লাখ বিশেক টাকা এই নিয়ম মানতে খরচ হয়ে যায়। বিনিয়োগকারী এই টাকাটাকে স্পিলেজ হিসেবেই দেখবে। কারণ এই টাকা কোনোভাবেই ছবিতে দেখা যাবে না।

এমনিতেই হল, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, স্যাটেলাইট সবকিছুই ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসার ফলে বাংলা ছবির বাজার অর্ধেকেরও কম হয়ে গিয়েছে। সেই রকম একটি বাজারে বিনিয়োগের ২০ শতাংশ যদি স্পিলেজ হয়, একজন বিনিয়োগকারী এই বাজারকে কী চোখে দেখবে এটা বোঝার জন্য অর্থনীতির ছাত্র হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এর সরাসরি ফল হয়েছে এই, শুটিংয়ের দিনের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। আগে যেখানে একটা বাংলা ছবিতে ২৫ থেকে ৩০ দিনের শিডিউল থাকত, সেই একই দৈর্ঘ্যের ছবি এখন বানানো হয় ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যে। এর ফল কী হয় তার বিষদ ব্যাখ্যায় যাওয়া নিষ্প্রয়োজন। বলছি ছবির কথা, কিন্তু এর প্রভাব সমস্ত ফরম্যাটের ক্ষেত্রেই সমান মাত্রায় ক্ষতিকারক হয়েছে। এর উপরে ফেডারেশনের মাফিয়া মনস্কতা—যেখানে ফেডারেশনের অ্যাপ্রুভাল ছাড়া শেষমেষ কোনো শুটিংই শুরু করা সম্ভব নয়—এই পরিবেশে কোনো শিক্ষিত, দক্ষ অথচ নতুন প্রযোজক যে বাংলায় কাজ করতে আসবেন না এটা বলা বাহুল্য। হয়েছেও তাই।

এর বাইরে একটা দীর্ঘ ভয় দেখানোর ইতিহাস আছে যেটা এখানে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন গিল্ডগুলিতে কোনো ন্যায্য নির্বাচন হয়নি। সেখানে স্বরূপের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই পদাধিকারী হয়েছেন। যারা আপত্তি জানিয়েছেন, তাদের বাড়িতে লোক গিয়েছে। মেনে নিলে তারা মাথা নিচু করে টিকে থাকতে পেরেছেন, না মানলে দীর্ঘদিনের সাসপেনশন বা ইন্ডাস্ট্রি থেকে সম্পূর্ণ বিতাড়িত হতে হয়েছে। বহুবিধ দুর্নীতির অভিযোগ বারবার তোলা হয়েছে, কিন্তু সেই নিয়ে প্রকাশ্যে জোর গলায় কেউ কথা বলার সাহস করেনি। ক্রমশ ক্ষোভ এতটাই বেড়ে যায় যে ইলেকশনের আগেই একাধিক গিল্ড স্বরূপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তা সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে আসে। যারা এই ইতিহাস একটু খুঁটিয়ে পড়তে চান, inscript.me-তে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে করা তাদের চার পর্বের অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনটি পড়ে দেখতে পারেন।

আরও একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রচুর প্রতারণা হয়। বিভিন্ন সময়ে বহু প্রযোজক এখানে এসেছেন এবং আসবেন যাদের উদ্দেশ্য ছবি তৈরি করা নয়। কেউ পায়রা ওড়াতে আসেন, কেউ কালো টাকা সাদা করার ইচ্ছায় আসেন, কারও অন্যান্য নানাবিধ অসাধু উদ্দেশ্য থাকে। বহু ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য সিদ্ধি হলেই ছবি আধখানা সম্পূর্ণ রেখে তারা নিশ্চিন্তে কেটে পড়েন। ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত সবার টাকা তো মারা যায়ই, বহু লোকের বহু মাসের পরিশ্রম পণ্ড হয়। এটা একটা বাস্তব সমস্যা এবং এর সমাধানে অবশ্যই কিছু কার্যকরী নিয়ম থাকা দরকার। কিন্তু তার জন্য একটি স্বচ্ছ এবং সমদৃষ্টিমূলক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

এই সমস্যার কথা স্বরূপ বারবার আওড়ে গিয়েছেন অবশ্যই, কিন্তু করেছেন একেবারেই নিজের সুবিধামতো। এটিকে তিনি মূলত টেকনিশিয়ানদের সমস্যা বলেই তুলে ধরেছেন। আমাদের করা মামলার সময় থেকেই তার ও তার দলবলের ন্যারেটিভ সেটিংটা এইরকম ছিল—এটা পরিচালক/প্রযোজকদের সঙ্গে টেকনিশিয়ানদের স্বার্থের সংঘাত। টেকনিশিয়ানরাও জানেন বিষয়টি আদপেই তা নয়। দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে সমস্ত বিভাগ নিজেদের মধ্যে কথা বলে সমস্যা মিটিয়েছেন। তার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সব সমস্যা সুচারুভাবে মিটেছে এটা একেবারেই নয়, কিন্তু দীর্ঘ সংঘাত নিজেদের স্বার্থেই এড়িয়ে চলা গিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি কোনো তীর্থস্থান নয়, কিন্তু মানুষকে ছেড়ে দিলে এবং তাদেরকে ভীতি-প্রদর্শন না করলে বা উস্কানি না দিলে, তারা নিজেদের স্বার্থেই নিজেদের সমস্যা আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়ারই পক্ষপাতী হয়। এই পরিবেশ গত ১০–১২ বছর ইন্ডাস্ট্রিতে একেবারেই ছিল না।

অজ্ঞতা অথবা নেহাতই সুবিধাজনক বলে, অথবা সম্ভবত দুটোর কারণেই স্বরূপ কিছুতেই বুঝতে চাননি তিনি একটি ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তা। ফেডারেশন শব্দটা ছিল বলে তার হয়তো একটা ধারণা হয় যে এটি একটি ইন্ডাস্ট্রির নিয়ামক সংস্থা। আমরা যে আইনি লড়াইটি লড়েছিলাম তার মূল প্রতিপাদ্য ছিল এই যে একটি ট্রেড ইউনিয়ন ভারতের কোনো আইনে নিজেদের নিয়ামক সংস্থায় (regulatory body) পরিণত করতে পারে না। এই যুক্তিটি আমরা আমাদের প্রতিপক্ষকে কখনোই বোঝাতে পারিনি। বা বলা ভালো, তারা বুঝেও বুঝতে চাননি।

সাধারণভাবে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা ধারণা আছে যে আমরা এই কেসটাতে হেরে যাই। এমনকী যেদিন আমাদের আপিলটি হাইকোর্টে ডিসমিসড হয় সেদিন স্বরূপের নির্দেশে নানা শুটিং ফ্লোরে মিষ্টি বিতরণ হয়, যেন তারা মামলাটা জিতে গিয়েছেন। আদপে এরকম কিচ্ছু ঘটেনি। আমাদের মামলার অন্যতম একটি দাবি ছিল সরকারের তত্ত্বাবধানে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গড়া, যে কমিটি বাংলা ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত নিয়ম পর্যালোচনা করে, সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রম আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি SOP নির্ধারণ করবে যা ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেককে মেনে চলতে হবে।

এই কমিটি করতে প্রথমে সরকার রাজি হলেও পরে তারা নানান চাপে পিছিয়ে যায়। একাধিক হিয়ারিং-এর পরেও যখন সরকার এই কমিটি তৈরি করার ব্যাপারে গড়িমসি করতেই থাকে, তখন বিরক্তি প্রকাশ করে, সরকারকে তিরস্কার করে জাস্টিস অমৃতা সিনহা এই কেসটি ডিসমিস করেন। তিনি পরিষ্কার জানান সরকার নিষ্ক্রিয় থাকলে তার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের উচ্চতর বেঞ্চে আপিল করার অপশন ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন এই লড়াই করার পর, আরও কিছুদিন হাইকোর্টে কেস লড়ার আর্থিক জোর আর মানসিক শক্তি আমাদের ছিল না।

৫। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস শুনলেন। এবার কিছু বাস্তব প্রস্তাব রাখি। কার কাজে লাগবে জানি না, আদৌ লাগবে কি না তা-ও জানি না, আপাতত এটাকে ‘টু হুম ইট মে কনসার্ন’ স্তরেই রাখছি।

যে কোনো ইন্ডাস্ট্রির অগ্রগতির অনেকগুলি ধাপ থাকে। আমাদের এই মুহূর্তে যা অবস্থা, একেবারে প্রাথমিক সংস্কারের স্তর থেকে শুরু না করলে গোড়ায় গণ্ডগোল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেইটুকুই এখানে উল্লেখ করছি। প্রাথমিক ধাপ উতরে গেলে পরবর্তীতে আরও নানান প্রস্তাব রাখা যেতে পারে। সেগুলি এখানে লিখে পাতা ভরাচ্ছি না।

ক) প্রথমেই আসি সেই বিষয় যেটা আমাদের আইনি লড়াইয়ের মূল বিষয় ছিল। বাংলা ইন্ডাস্ট্রির নিয়মের কোনো মাথা মুন্ডু নেই। তা ভারতের বা পৃথিবীর কোনো চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। দেশের শ্রম আইনের সঙ্গেও তার প্রভূত বিরোধ আছে। বাংলা ছবিতে কাজ বাড়ার প্রাথমিক শর্ত হলো, তার জমিকে বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। তার প্রথম এবং নন-নেগোশিয়েবল দিক হলো একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা। অর্থাৎ যিনি বিনিয়োগ করবেন, তিনি যদি এসে দেখেন, দক্ষিণে বা মুম্বইতে বা মারাঠি ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করা তার জন্য অনেক বেশি সুবিধাজনক, তার কিছু এসে যায় না। তিনি এক লহমায় ঠিকানা বদলে ফেলেন। তো এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবে কে? এটা করার সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য উপায় হচ্ছে, সরকার-নিযুক্ত একটি নিরপেক্ষ কমিটি। এর মাথায় একজন হাইকোর্টের রিটায়ার্ড জাজ থাকতে পারেন, মেম্বার হিসেবে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর ও শ্রম দপ্তরের প্রতিনিধি থাকতে পারেন। শ্রম আইন বোঝেন এমন কিছু আইনজীবীকেও নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এক থেকে দু মাসের সময়ের মধ্যে এরা যদি ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের সমস্যা ও দাবিগুলি খতিয়ে দেখেন ও তার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য সমস্ত ইন্ডাস্ট্রির নিয়মকানুনের তালিকার তুল্যমূল্য বিচার করেন, তাহলে একটি গ্রহণযোগ্য SOP তৈরি করা খুব সমস্যার হওয়ার কথা নয়। এতে সরকারের সিলমোহর থাকলে তার একটা আইনি মান্যতা তৈরি হয়। সেই নিয়ম ভাঙার আগে ক্ষমতাবান যে কোনো মানুষকে দশবার ভাবতে হয়। ইন্ডাস্ট্রির পরিস্থিতি নানা কারণে বদলাতে থাকে। কাজেই এই কমিটি এককালীন হওয়া উচিত নয়। প্রতি দুই কি তিন বছর অন্তর একটি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

খ) ইন্ডাস্ট্রিতে একটি ombudsman (ন্যায়রক্ষক জাতীয় কোনো পদ) অবশ্যই প্রয়োজন। তাকেও তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের নিয়োগ দেওয়া উচিত। ইন্ডাস্ট্রিতে যে নানাবিধ সংঘাত হয়—চুক্তির খেলাপ, পারিশ্রমিক না পাওয়া, কাজ করে ক্রেডিট না পাওয়া, কাজের ন্যূনতম পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি—এগুলি সমাধানের কোনো স্পষ্ট প্রক্রিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে এখনও তৈরি হয়নি। হয়নি বলেই যিনি ক্ষমতাবান তিনি সবসময় পার পেয়ে যান। এটিও একটি প্রাথমিক পর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা। এবং এটাও বলা দরকার যে এই ombudsman-এর অবশ্যই ক্ষেত্রবিশেষে আর্থিক শাস্তি এবং সাসপেনশনের আদেশ জারি করার ক্ষমতা থাকা উচিত। একমাত্র সরকার নিযুক্ত হলেই সেই আদেশের মান্যতা বাধ্যতামূলক হয়। শুধুমাত্র এই কমিটির উপস্থিতি বহু অন্যায়কে ঘটার আগেই আটকানোর ক্ষমতা রাখে। Deterrent হিসেবে কাজ করে।

গ) ইন্ডাস্ট্রিতে নারী, পুরুষ, অপ্রাপ্তবয়স্ক নির্বিশেষে একটি আচরণবিধির অবশ্যই প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি একটি সর্বক্ষণের বাস্তবতা। তাকে বাদ দিয়ে কোনো শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রির কল্পনা করা অসম্ভব। এক্ষেত্রেও সরকারের শিশু কল্যাণ ও নারী সুরক্ষা বিভাগ, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই আচরণবিধি এবং তার সঙ্গে যুক্ত যে সেনসিটাইজেশন প্রোগ্রাম, তার দায়িত্ব নিতে পারেন। এক্ষেত্রে একটি লিখিত কোড অফ কন্ডাক্ট থাকলে এবং ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকটি বিভাগ তার সম্বন্ধে অবগত হলে বহু অপ্রীতিকর ঘটনা ভবিষ্যতে এড়ানো যেতে পারে। তার সঙ্গে অবশ্যই একটি ICC (বিশাখা গাইডলাইনস দ্বারা তৈরি Internal Complaints Committee) থাকা অতি প্রয়োজন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে একটি নিরপেক্ষ কমিটি যদি তার বিচার করতে পারে, বহু ক্ষেত্রে অনেক অপরাধ আটকানো যায়।

ঘ) ইন্ডাস্ট্রিতে ফ্লাই-বাই-নাইট প্রযোজকদের কথা আগেই বলেছি। তাদের হাতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এক্ষেত্রে একটি প্রস্তাব রাখা যেতে পারে। সম্পূর্ণ অন্য কোনো ফিল্ড থেকে আসা কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি প্রথম কোনো প্রযোজনায় প্রবেশ করেন, সেক্ষেত্রে একটি সিকিউরিটি ডিপোজিটের প্রস্তাবনাটা নেহাতই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। আনুমানিক প্রজেক্ট কস্টের একটা ক্ষুদ্র অংশ যদি ombudsman-এর কাছে জমা রাখা যায়, সেটা বহু টেকনিশিয়ান এবং কলাকুশলীর সুরক্ষার ব্যবস্থা করে। এই ডিপোজিট থেকে পাওয়া সুদের অংশটা কলাকুশলীদের সামাজিক সুরক্ষার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ফলে আর কিছু না হোক ইন্ডাস্ট্রি থেকে বহু অসাধু ফ্লাই-বাই-নাইট প্রডিউসারদের পলায়ন ঘটবে। এই দায়িত্ব অবশ্যই ফেডারেশনের বা ইম্পা-র নয়। এটাকেও ombudsman এর আওতার ভিতরে আনা প্রয়োজন। তাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে।

ঙ) এমনিতেই ইন্ডাস্ট্রি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুব অনুকূল পরিবেশ নয়। গত বছর দশেক প্রচুর কাজ কমে যাওয়ায় বহু মানুষ আর্থিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আছেন। টেকনিশিয়ান থেকে অভিনেতা অভিনেত্রী কেউই এই স্ট্রেসের বাইরে নন। সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং বা মানসিক চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের তরফ থেকে যদি একটি দৈনিক ফ্রি সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং-এর সেন্টার খোলা যায়, যেখানে ফেডারেশন ও আর্টিস্ট ফোরামের যে কোনো কার্ড হোল্ডার বিনামূল্যে তার সুযোগ নিতে পারেন, আমার ধারণা বহু মানুষ তাতে প্রভূত উপকার পাবেন।

চ) সরকার থেকে সরাসরি প্রত্যাশা

এই লিস্টটা অনেক লম্বা হতে পারে। কিন্তু আমরা প্রাথমিক স্তরের বিষয়গুলি নিয়েই কথা বলছি। ফলে একটা বিষয় নিয়েই আপাতত লিখব। এটা ব্যবসা প্রসারের মূল শর্ত।

বাংলা ছবির মূল সমস্যা প্রদর্শনীর হল। মাল্টিপ্লেক্স বাংলা ছবির জায়গা নয়। তার কারণ দর্শাতে হলে আর একটা লম্বা প্রবন্ধ লাগবে, তার মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু affordable সিঙ্গল স্ক্রিন ছাড়া বাংলা ছবির পরিত্রাণ অসম্ভব। এক্ষেত্রে সরকার কী করতে পারে? অর্থের যোগান থাকলে নিজে, না থাকলে একাধিক প্রাইভেট পার্টনারের সঙ্গে পিপিপি মডেলে একটি প্রদর্শনী ও ডিস্ট্রিবিউশনের কোম্পানি খোলা উচিত। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বহু পরিত্যক্ত বা ধুঁকতে থাকা ছোট হল পড়ে রয়েছে। সেগুলি ২০–২৫ বছরের লিজে নিয়ে, সেগুলিকে revamp করে, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে একটি পরিচ্ছন্ন আরামদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা যেতে পারে। যেখানে টিকিট ও খাবারের খরচ মিলে একটি দম্পতির এক সন্ধ্যায় আড়াইশো থেকে তিনশো টাকার বেশি খরচ না করতে হয়। হলের সংখ্যা একশো থেকে দেড়শো হওয়া খুব একটা অসম্ভব কিছু নয়। এই হলগুলির ছবি একটি সেন্ট্রাল সার্ভারে আপলোড করা থাকবে। সেই আপলোডিং চার্জ যেন বাংলা ছবির ক্ষেত্রে অবশ্যই ফ্রি হয়। টিকিট কেনার ব্যবস্থা যেন অবশ্যই একটি অনলাইন সার্ভারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে একজন প্রযোজক বাংলায় বা দেশের যে কোনো জায়গায় বসে যে কোনো মুহূর্তে তার ছবির ব্যবসার আন্দাজ পেতে পারেন। দুর্নীতি এবং বেআইনি টিকিট বিক্রি রুখতে একটি ইনফ্রারেড ক্যামেরায় (ছবি শুরু হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে) হলের একটি স্ন্যাপশট যথেষ্ট। তাতে বিক্রি হওয়া টিকিট এবং হলে উপস্থিত আসল দর্শকদের সংখ্যা এক লহমায় এআইয়ের মাধ্যমে মিলিয়ে দেখা যায়। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি দিক, কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি হলে কত টিকিট বিক্রি হয়েছে এটা বোঝা পরিবেশক বা প্রযোজকের পক্ষে অসম্ভব।

এ বাদেও কয়েকটা পয়েন্ট আছে। ছবির লভ্যাংশের ভাগ যেন ন্যূনতম পঞ্চাশ শতাংশ হয় এবং প্রত্যেকটি বাংলা ছবিকে শো টাইমের ক্ষেত্রে অন্তত দুই সপ্তাহের সময় দেওয়া প্রয়োজন। খুব কম বাংলা ছবির পক্ষে সেই মাপের বিপণন করা সম্ভব হয়ে ওঠে। নন্দনের ক্ষেত্রে দেখেছি প্রযোজকের হাতে টাকা আসতে আসতে প্রায় বছর ঘুরে যায়। টাকা পাওয়ার আর প্রায় কোনো মানে থাকে না। এই নতুন হলগুলির ক্ষেত্রেও ইন্ডাস্ট্রির স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ছবির টাকা পাওয়া আবশ্যক।

ছবির নির্বাচন এবং তার শো টাইমে স্বজনপোষণ এবং দুর্নীতির সম্ভাবনা থাকে। সেক্ষেত্রে চলচ্চিত্র কর্মীদের একটা বড় পুল তৈরি করা যেতে পারে, যেখান থেকে রোটেশন সিস্টেমে প্রতি দু মাসের জন্য একটা স্ক্রিনিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তাতে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে।

এটাকে একটা পরিচ্ছন্ন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলা যেতে পারে। এগুলি অ্যাচিভ করলেই আমরা অনেকটা দূর এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু তার আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের চাহিদা থাকাটা অতি আবশ্যক।

এত বড় একটা লেখা কাদের পড়ার ধৈর্য হল জানি না। লোকে পড়বে ভেবে যে লিখেছি, এমনও নয়। যখন মামলাটায় জড়িয়ে ছিলাম বহু শুভানুধ্যায়ী বারবার করে বলে গিয়েছেন, ভুলভাল কাজ করে নিজের সময় নষ্ট কোরো না। তারা ঠিক বলেছেন। তবে আমিও যে খুব ভুল করেছি এটা আজকে দাঁড়িয়েও আমার মনে হয় না। সব কাজ তাৎক্ষণিক মুনাফার জন্য করলেই মুনাফা যেমন হয় না, আগে জেতা নিশ্চিত করে তবেই লড়াইয়ে নামব, এরকম লড়াইও হয় বলে শুনিনি। আন্দোলনের সময় নিজের জানার জন্যই বহু প্রাক্তন টেকনিশিয়ান, গিল্ডের সংগঠকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে দেখা করেছিলাম। তারা তাদের মতো করে একটা ঘটনা পরম্পরা দাঁড় করিয়ে ইতিহাসটা বলার চেষ্টা করেছেন বটে, বহু ক্ষেত্রেই মনে হয়েছে সেই ইতিহাসটা খাপছাড়া এবং anecdotal। তারা ঘটনা হয়তো জানেন, কিন্তু একটা সুস্পষ্ট কার্যকারণের বিবরণী তাদের পক্ষে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে রেজাল্টগুলি দেখা যায়, কারণগুলি বুঝতে অসুবিধা হয়, সেই বিন্দুগুলি নিজের মনেই লাইন টেনে জুড়ে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে কুড়ি বছর পরে আমার মতোই যদি কোনো ছেলে বা মেয়ের এই ইন্ডাস্ট্রির গতিপ্রকৃতি বোঝার ইচ্ছা হয়, তাহলে এই লেখাটিকে তারা হয়তো ফুটনোট হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এটাও তো কম কিছু নয়। আর কিছু না হোক, যা ঘটছে, বা যা হতে পারে তার একটা রেকর্ড থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। হাজার চেষ্টা করেও এখনও ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে নিজেকে সম্পূর্ণ অনাসক্ত করে তুলতে পারিনি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

গাজা ধ্বংসের তিন বছর: স্কুল নেই, শিক্ষক নেই, হারিয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম

Gaza education crisis: ইউনিসেফের হিসেব অনুযায়ী, গাজার ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ৭ লক্ষ শিশু টানা তিন শিক্ষাবর্ষ ধরে নিয়মিত স্কুলশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়েও গাজার প্রায় ৪ লক্ষ ২০ হাজার শিশু সরাসরি স্কুলে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।

এসআইআর: সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকা নিয়েও কথা হোক

SIR controversy: নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে যখন একের পর এক অভিযোগ উঠছে, তখন সুপ্রিম কোর্টের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও কি প্রশ্ন উঠবে না? ফর্ম ৬, ভোটার তালিকা থেকে বাদ এবং ট্রাইবুনালে দীর্ঘসূত্রিতার মতো ঘটনায় সর্বোচ্চ আদালত কি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে?

নেহা বোরার সভার পরেই যাদবপুরে কমিটি ভাঙল! রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ঘিরে কেন তুঙ্গে বিতর্ক?

Neha Bora Jadavpur University: আয়োজক ছাত্র সংগঠন আইসার যাদবপুর ইউনিট দাবি করেছে যে তারা যথাযথ নিয়ম মেনে ২০ সেপ্টেম্বরই আবেদনপত্র জমা দিয়েছিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কমিটি থেকে অনুষ্ঠানটির অনুমোদনও পেয়েছিল। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দেবজিৎ দত্ত দাবি করেন, এই ধরনের কোনো ফাইল বা অনুমতির চিঠি তাঁর দপ্তরে পৌঁছয়নি।

এসআইআর ফর্ম ৭ বিতর্ক, ৩০ জন মুসলিম ভোটারের নাম বাদের অভিযোগে এফআইআর

SIR Form 7 Controversy: হায়দরাবাদে এসআইআর-এ ফর্ম ৭ নিয়ে বিতর্ক। ৩০ জন মুসলিম ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আবেদন করার অভিযোগে বিজেপির এক বুথ এজেন্টের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে। নির্বাচন আধিকারিকদের যাচাইয়ে ওই ভোটারদের ঠিকানায় থাকার প্রমাণ মেলে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনায় ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বামের যে ভোট রামে গিয়েছে, তার অধিকাংশই ফেরানো যাবে বলে মনে করি: দীপ্সিতা

Dipsita Dhar Interview: ৮০ শতাংশ মানুষ মমতার বিরুদ্ধে ক্রোধ এবং ঘৃণায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলেন। বাকি ২০ শতাংশ দিয়েছিলেন ‘হিন্দুত্বের’ কারণে। সিপিএমের নেত্রী মনে করেন, সেই ৮০ শতাংশ মানুষকে বুঝিয়ে ফেরানো সম্ভব।

স্কুল বন্ধ, রাস্তায় বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ: ফ্রান্সে ছাত্র আন্দোলনের নেপথ্যে কী?

France Student Protests 2026: কেন উত্তাল ফ্রান্স? হাজার হাজার পড়ুয়া কেন স্কুল ছেড়ে রাজপথে? পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কেন বাড়ছে উত্তেজনা?

জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে আট ঘণ্টা ধরে আকাশবাণী ভবনে বিরোধীদের অবস্থান

Gyanesh Kumar Resignation Demand: জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বন্ধের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভে নামে ইন্ডিয়া জোট। নির্বাচন কমিশনের দফতরের দিকে বিরোধী সাংসদদের মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। ব্যারিকেড টপকে আকাশবাণী ভবনে পৌঁছন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ নেতারা। অখিলেশ যাদব, ডেরেক ও’ব্রায়েন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতাকে আটক করা হয়।

অভিজিৎ, সৌরভ, আশুতোষ গ্রেফতার হলেই থেমে যাবে আন্দোলন?

Possible detention of cockroaches:যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কে.পি. বসু মেমোরিয়াল হলে, বাম ছাত্রসংগঠনগুলির ‘জেন-জি আন্দোলন’ কনভেনশনে উপস্থিত হলেন, আইসা-র নেহা বোরা ও এসএফআই-এর সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁদের দাবি, এসআইআর প্রত্যাহার, এনইপি বাতিল, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। অন্যদিকে ঘনাচ্ছে অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কার গ্রেফতারির আশঙ্কা। এরই মাঝে, ১০ অক্টোবর বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। নেতৃত্বহীন জনগণ কি চালিয়ে যেতে পারবে আন্দোলন?