অত্যধিক মদ্যপানে ঠিক কতটা ক্ষতি লিভারের, উপসর্গ জেনে সতর্ক হোন

যকৃৎ বা লিভার মানবদেহের পৌষ্টিকতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই সুস্থ জীবনযাপনের স্বার্থে লিভারের স্বাস্থ্যের প্রতি অতিরিক্ত যত্নবান হওয়া জরুরি। পৌষ্টিকতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত এই অঙ্গ গৃহীত খাদ্যে উপস্থিত ফ্যাট বা কার্বোহাইড্রেটের বিপাকে ও পরিপাকে সাহায্য করে। আবার রক্তে উপস্থিত দূষিত পদার্থগুলি শরীর থেকে দূর করতেও লিভারের ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়াও লিভার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের সঞ্চয়ে, পিত্ত উৎপাদনে এবং প্রোটিন ও রক্ত জমাট বাঁধার উপাদানগুলির সংশ্লেষে সাহায্য করে।


তাই যাঁরা দীর্ঘদিন যাবৎ লিভারের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল প্রকৃতির। এর ফলে তাঁদের শরীরে গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, লিভারের সমস্যা রয়েছে, এমন ব্যক্তির করোনা সংক্রমণের পর সুস্থ হতে অন্যান্যদের তুলনায় বেশি সময় লাগে।
ভারতে লিভারের অসুখ মৃত্যুর কারণগুলির অন্যতম। প্রতি বছর প্রায় লক্ষাধিক মানুষ মারা যান লিভার-সংক্রান্ত অসুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-র (হু) প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বার্ষিক প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ নতুন করে লিভারের অসুখে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে মদ্যপানের কারণেই বেশিরভাগ মানুষ লিভারের অসুখে ভোগেন। এছাড়াও লিভারের সমস্যার কারণগুলির মধ্যে রয়েছে হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমণ এবং নন অ্যালকোহলিক লিভারজনিত অসুখ।


সুস্থ লিভার দেহের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির কার্যকারিতাও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এই কারণে আজ থেকেই নজর রাখুন লিভারের প্রতি, অবহেলা করবেন না মোটেও। চলুন জেনে নেওয়া যাক লিভারের সমস্যার বিভিন্ন উপসর্গগুলি কী কী।

আরও পড়ুন:টিটেনাসের কারণ কি সত্যিই মরচে পড়া লোহা? যে তথ্য সামনে আসছে 

লিভারের সমস্যার বিভিন্ন উপসর্গ
১.  জন্ডিস লিভার সমস্যাগুলির মধ্যে খুব পরিচিত একটি অসুখ। এক্ষেত্রে ত্বক, প্রস্রাব এবং চোখ হলুদ দেখায়।
২. সাধারণ দুর্বলতা এবং ক্লান্তি।
৩. অস্বাভাবিক ক্ষত।
৪. অ্যাসাইটিস অর্থাৎ পেটে তরল জমে যাওয়া।লিভার সিরোসিস এই রোগের অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে পেট আকারে বড় হতে থাকে এবং দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পেতে থাকে। সঙ্গে গোড়ালি ফোলা, শ্বাসপ্রশ্বাসে কষ্ট এবং হজম-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়।
৫. প্রাথমিক বিলিয়ারি কোলাঞ্জাইটিস- এক্ষেত্রেও লিভারের পিত্তনালীর অংশটি সংক্রামিত হয়। ফলস্বরূপ পিত্ত লিভারের বাইরে না বেরিয়ে তা পুনরায় ফিরে আসে লিভারেই এবং ক্ষতের সৃষ্টি করে। অনেক সময় লিভারে পিত্তের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা পিত্তনালীর পথ অবরুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে লিভার ক্যান্সার দেখা দেয় এবং লিভার ট্রান্সপ্লান্টেরও  প্রয়োজন হয়।

 

কাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মাত্রা বেশি?
যেসব ক্ষেত্রে লিভারের অসুখের সম্ভাবনা বেশি সেগুলি হল -
১. স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন লিভারের সমস্যার তৈরি করে।
২. ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মত রোগ লিভার সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।
৩. চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মী যাঁরা সরাসরি অন্য ব্যক্তির দেহতরলের সংস্পর্শে আসতে পারেন তাঁদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি।
৪. যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রেও এই রোগের ঝুঁকি বেশি।
৫. হেপাটইটিস বি বা সি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আক্রান্ত হতে পারেন এই অসুখে।
৬. লিভারের অসুখের পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও তা প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে।

উপরিউক্ত সমস্যাগুলো ছাড়াও যদি কারও লিভারের সমস্যা দেখা দেয়, তবে চটজলদি চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের কথামতো রক্ত পরীক্ষা, লিভার ফাংশন পরীক্ষা করলে লিভারের অসুখ ধরা পড়তে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজনমতো আরও কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। পাশাপাশি সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনধারা মেনে চললে লিভারের স্বাস্থ্য বজায় থাকবে।

 

লিভার এবং নিজেকে সুস্থ রাখার সহজ কিছু উপায়

১. স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া: অতিরিক্ত চর্বি এবং কার্বোহাইড্রেট, প্যাকেটজাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার, অস্বাস্থ্যকর রাস্তার খাবার, বাসি খাবার এবং অপরিশোধিত জল এড়িয়ে চলুন। এগুলি আপনার দেহে হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই এর মত রোগের কারণ হতে পারে।চর্বিযুক্ত খাবার এবং কৃত্রিম মিষ্টি বা ফ্রুক্টোজ যুক্ত খাবারেও ঝুঁকি বাড়তে পারে লিভার সমস্যার।
২. খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি রাখুন বেশি পরিমাণে
৩. অত্যধিক অ্যালকোহল সেবন এড়িয়ে চলুন কারণ অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে আপনার লিভারে চর্বি জমা হতে থাকে এবং ফ্যাটি লিভার অসুখ দেখা দেয়।এই কারণে  অ্যালকোহল ত্যাগ করাই ভাল। এই অ্যালকোহলের কারণে লিভার সিরোসিস হতে পারে, যা সারা বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
৪. নিয়মিত ব্যায়াম করুন যা শরীরকে সচল রাখবে এবং অতিরিক্ত ওজন ঝড়াতে সাহায্য করবে।
৫. খাদ্যগ্রহণের সময় কাঁচা লবণ কম খাওয়ার চেষ্টা করুন কারণ লবণ শুধুমাত্র রক্তচাপ এবং হৃদরোগের সাথে সম্পর্কিত নয়,এর ফলে লিভার সমস্যাও দেখা দেয়।অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার ফলে লিভারে জল জমা হতে পারে। ফলস্বরূপ লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৬. অবশ্যই হেপাটাইটিস এ এবং বি রোগের টিকা নিন।

More Articles

;