পুরভোটের ফল দেখে আত্মানুসন্ধান করুন বামেরা

Gautam Roy
৮ মিনিট
পুরভোটের ফল দেখে আত্মানুসন্ধান করুন বামেরা

পশ্চিমবঙ্গের চারটি পৌরনিগমের ফলাফল ঘোষিত হয়েছে। চারটিতেই শাসক তৃণমূল কংগ্রেস সমস্ত বিরোধীদের অনেকটাই পিছনে ফেলে জয়লাভ করেছে। তৃণমূল পৌরনিগমের ভোটগুলিতে ভালো ফল করবে, এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব একটা সংশয় ছিল না। যদিও তৃণমূলের বিভিন্ন জায়গায় ভোট প্রাপ্তির যে শতাংশের হিসাব, তা অনেককেই বাম জমানায় অনিল বসু, নির্ঝরিনী চক্রবর্তী ,নন্দরানী ডলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে ।স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী বামেরা এবং বিজেপি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছেন।

যে কোন স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচনে শাসকদলের একটা বাড়তি সুবিধা সব সময়েই থাকে। কংগ্রেসের আমল থেকেই এটা দেখা গিয়েছে। বামফ্রন্টের আমলেও তা ছিল। আজকে তৃণমূলের আমলে সেটা আছে স্থানীয় প্রশাসনের ভোট যেহেতু রাজ্য পুলিশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই দেখা যাচ্ছে, যে রাজনৈতিক দল শাসন ক্ষমতায় থাকে ,তারা একটা বাড়তি সুযোগ পেয়ে যায়। তবে স্থানীয় প্রশাসনের ভোট তো কোন ছার, বিধানসভা ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী, এটা কিন্তু খুব বেশিদিনের নয়। বাম জামানার মাঝামাঝি সময় থেকে, সেই সময়ের শাসকদের বহু আপত্তি উপেক্ষা করে এই কেন্দ্রীয় বাহিনী লোকসভা, বিধানসভা ভোটে নিয়োজিত হতে শুরু হয়।

বহু ক্ষেত্রেই স্থানীয় প্রশাসনের নির্বাচন ঘিরে নাগরিক সমাজ দলীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে নিজেদের আটকে রাখতে রাজি হন না। তাদের কাছে পৌর, পঞ্চায়েত পরিষেবা কোন ব্যক্তির কাছ থেকে ভালো পাওয়া যেতে পারে, সেটা সেই ব্যক্তির দলীয় অবস্থানের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ভরা বাম জামানাতেও আমরা বহু ক্ষেত্রে দেখেছি, দলীয় ঘেরাটোপের বাইরের প্রতিনিধিকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের প্রবণতা ছিল।

বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর ১৯৮০ সালে প্রথম যখন পুরসভা নির্বাচন হয়, সেই পৌরনির্বাচন তৎকালীন বিরোধী দল কংগ্রেস বয়কট করেছিল। ভাটপাড়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে ,সেই ভরা বাজারে সিপিআইএম প্রার্থী কে পরাজিত করে এসইউসি প্রার্থী জিতেছিলেন। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, ওই দলটির, ওই এলাকায় সাংগঠনিক শক্তি ছিল। এসইউসি দলের পক্ষ থেকে যে ব্যক্তিকে সেই ওয়ার্ডে প্রার্থী করা হয়েছিল, তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের কাছে এতটাই তীব্র ছিল যে, বামফ্রন্টে সরকারের সূচনাপর্বের সেই ভরা বাজারেও, সি পি আই (এম) দলের প্রার্থীর বদলে এসউসিআই-এর ওই প্রার্থী জেতেন।

তারপরের পুর-নির্বাচনে সেখানে এমন একজনকে বাম প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানো হয় এবং জেতানো হয়, যে ব্যক্তিটি পরবর্তীকালে নিজের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে সুইসাইড নোটে স্থানীয় একটি বামপন্থী নেতা, যিনি তাদের দলের রাজ্য স্তরের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও বটে ,তাকে এবং তার গোটা পরিবারকে দায়ী করে গিয়েছিলেন।

এই যে যেনতেনপ্রকারেণ মানুষের ভাবনাকে উল্টে দিয়ে, দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে হবে, শাসকের এই যে প্রবণতা, সেই প্রবণতায় কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনগুলিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশকে একটা বড় রকমের প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। গণতন্ত্রের সলিল সমাধির সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে- এস ওয়াজেদ আলিকে একটু অদলবদল করে এরকম শব্দ লিখলে মনে হয় না খুব অত্যুক্তি হবে।

এই যে চারটি পৌরনিগমের নির্বাচন হলো, সেই চারটির মধ্যে একটি পৌরনিগমের বাম আমলে দীর্ঘদিনের মেয়রের পত্নী কে সঙ্গে নিয়ে একবার একটি ক্যাসেট সিডির দোকানে গিয়েছিলাম সেই দোকানের বিক্রেতা পরবর্তী সময়ে আমাকে বলেছিলেন, ওঁকে সঙ্গে নিয়ে কেন আপনি এসেছেন ? অর্থাৎ ; ক্ষমতায় থাকাকালীন স্থানীয় প্রশাসনে আধিপত্যবাদ যে জায়গায় পৌঁছে ছিল ,তাতে বামপন্থার আদর্শবাদের প্রতি আস্থা কে ছাপিয়ে, সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের ভেতরে সেই আধিপত্যবাদ ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিরক্তি। তাই সেই আধিপত্যবাদী সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত যে কোনো মানুষ সম্পর্কেই তৈরি হয়েছিল এই ধরনের বিতৃষ্ণা।‌

স্বভাবতই আমরা দেখেছি সংশ্লিষ্ট পৌরনিগমের ভোটে প্রার্থী তালিকায় নতুনদের স্থান দেওয়ার নাম করে, বামপন্থীরা এমন কিছু ব্যক্তিদের প্রার্থী করেছে, যাদের ভিতর একজন দলের জেলা দপ্তরে বসে পর্নোগ্রাফি দেখতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে দল থেকে সাসপেন্ডেড হয়েছিল। অথচ তার আত্মীয়-পরিজন দলের কেষ্টবিষ্টু। সেই কারণে সাসপেনশনের পর এসে আবার 'তরুণ তুর্কি'-র মুকুটটি দলীয় সতীর্থদের দ্বারা সে মাথায় পরতে সক্ষম হয়েছে।

বামপন্থী কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ ,তাদের একটা বড় অংশের ভেতর থেকে গত বিধানসভা নির্বাচনে , সদ্য সমাপ্ত পৌরনিগমের নির্বাচনে বা আসন্ন বেশকিছু পুরসভার ভোটে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের প্রার্থী করার বিষয়টিকে বামপন্থী রাজনীতির ভোটকেন্দ্রিক বিষয়ের ক্ষেত্রে একটা মাইলস্টোন হিসেবে দেখানো প্রবণতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বামপন্থী রাজনীতিতে 'বৃদ্ধতন্ত্র'-র কথাটি , তাদের দলীয় কর্মী সমর্থকদের পরিমণ্ডলেও অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে। সেই জায়গাটি আমাদের একটু ভাবা দরকার।

বিভিন্ন খবরের কাগজের মাধ্যমে জানতে পারা যাচ্ছে যে , সি পি আই(এম) তাদের দলের বিভিন্ন কমিটিগুলোতে থাকা নেতৃত্বের বয়সের উর্ধ্বসীমা বেঁধে দিয়েছেন। আর এখানেই একটা বড় অংশের নেতৃত্ব, যারা এই বয়সের আওতায় পড়েন, আগামীতে আর কোনো কমিটিতে থাকতে পারবেন না বলে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে , তারা বিভিন্ন অংশে নিজেদের ক্ষোভ তকে গোপন রাখতে পারছেন না। খবরের কাগজ গুলোতে কথা বলা হচ্ছে যে, এই সমস্ত অতিবৃদ্ধ নেতৃত্ব টিকে থাকার জন্য নানা রকম ভাবে নাকি চেষ্টা চরিত্র করে যাচ্ছেন।

বৃদ্ধ হলেই কোনো মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায় বা মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে যায়, এমন সরলীকরণের ভেতরে না গিয়েও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে ,দীর্ঘদিন একটি পদে অধিষ্ঠিত থাকার ফলে যে কোন ব্যক্তির মধ্যে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে । সেই জায়গাটির দিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নজর দেন? আর দলীয় কমিটিগুলোতে না থাকলেই কি রাজনৈতিক সংগ্রাম বা দলকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্ত রকমের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়?

সিপিআই(এম)-এর ভরা বাজারে তো বয়স এবং শরীর স্বাস্থ্যের কারণে জ্যোতি বসুর মতো মানুষ কেবল প্রশাসনিক পদ থেকেই অবসর নেন নি ,দলীয় পদ থেকে অবসর নিয়েছিলেন। তা বলে কি প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু কখনো সক্রিয় ছিলেন না ? তা তো নয় ।একই কথা প্রযোজ্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সম্পর্কেও। শারীরিক কারণে বহু অনুরোধ উপেক্ষা করে তিনি দলীয় নেতৃত্বের সর্বোচ্চ কমিটিগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন।শারীরিকভাবে যতদিন তিনি সক্ষম ছিলেন ,দল পরিচালনার ক্ষেত্রে দিশা যোগানোর প্রশ্নে, তিনি কি কখনো কার্পণ্য করেছিলেন? কখনোই নয় ।আজও তিনি তা দেন যতখানি শারীরিকভাবে সক্রিয় আছেন, সাধ্যমতো সতীর্থদের তিনি পরামর্শ দেন। এজন্য তাকে কিন্তু কোনো বিশেষ কমিটিতে অবস্থান করতে হয় না বা ভীষ্ম পিতামহের মতো কোনো ভূমিকা পালন করতে হয় না।

বয়সজনিত কারণে কমিটিতে থেকে নেতৃত্ব না দিতে পারলেও, গণআন্দোলনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তো কোনো অন্তরায় কখনো থাকতে পারে না। আর এই অন্তরায় সম্ভবত সি পি আই (এম) নেইও। অথচ গত চারটি পৌরনিগমের সেই বিষয়গুলো ঘিরে কিছু প্রবীণ নেতাদের আচার আচরণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভেতরে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ।

হঠাৎ সামাজিক গণমাধ্যম থেকে জানতে পারা গেল, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ফোন করেছেন শিলিগুড়ির তথা উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা অশোক ভট্টাচার্যকে। সামাজিক গণমাধ্যমে দেখা গেল এমন লেখা হচ্ছে যে, বুদ্ধদেব বাবু নাকি অশোকবাবুকে পৌর নির্বাচনে শিলিগুড়িতে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। তারপরেই নানা ধরনের মন্তব্য আসতে লাগল যে, রাজনৈতিক সন্ন্যাস থেকে আবার রাজনীতির মূল স্রোতে ফিরে এলেন অশোকবাবু। এই ব্যাপারে কথার চাপানউতোর এমন একটা জায়গায় পৌঁছলো যে, সিপিআই (এম) দলকেও তাদের নিজস্ব মুখপত্রে আলাদা করে লিখতে হল, এই ফোনালাপ পর্বে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং অশোক ভট্টাচার্যের মধ্যে কী কথা হয়েছে।

অশোকবাবু আর বুদ্ধদেববাবু একই দলে অবস্থান করেন। দীর্ঘদিন বুদ্ধবাবুর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন অশোকবাবু। তার আগেও তারা জ্যোতিবাবুর মন্ত্রিসভায় একসাথে কাজ করেছেন। উভয়ের মধ্যে সুন্দর সুস্থ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকা কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় । সেই জায়গা থেকেই রাজনীতি সচেতন এবং শারীরিক বাধাকে উপেক্ষা করেও মস্তিষ্ক অত্যন্ত সচেতন যে মানুষটির ,সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কোন রাজনৈতিক বিষয়ে আলাপ আলোচনার জন্য অশোক ভট্টাচার্য কে ফোন করতেই পারেন। কিন্তু সেই ফোনের বিষয়বস্তু কিভাবে সামাজিক গণমাধ্যমে উঠে এল?

বুদ্ধবাবুর যে রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য , তাতে তিনি কোনো অবস্থাতেই নিজের কোনো ব্যক্তিগত ঘটনাবলীকে প্রচারমাধ্যমের সামনে আনতেন না ।মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন দীর্ঘসময় এটা আমরা দেখেছি। যখন তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কিন্তু' প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী', সেই সময়েও আমরা দেখেছি, ব্যক্তিগত কোনো বিষয়কেই তিনি কখনও প্রচারমাধ্যমের সামনে মেলে ধরতেন না ।

তাহলে প্রশ্ন হল, বুদ্ধদেববাবু ব্যক্তিগত স্তরে যে ফোনটি করেছিলেন অশোক ভট্টাচার্যকে, নিশ্চিত এই ফোনটির বিষয় অশোক ভট্টাচার্যের কোনো না কোনো ব্যক্তিকে বলেন এবং সেভাবেই বিষয়টা জনসমক্ষে আসে। শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন ,' নিয়ন আলোয় পণ্য হল যা কিছু আজ ব্যক্তিগত', সেই কবিতার প্রেক্ষাপটটিই এই গোটা টেলিফোন পর্ব ঘিরে মনে পড়ে যাচ্ছে।

সিপিআই(এমে)র মুখপাত্র টেলিফোনপর্ব নিয়ে লেখা ,অশোকবাবুর ভিডিও ফুটেজ আবার সামাজিক গণমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো ,এইসবের প্রেক্ষিতে বারবার মনে হচ্ছে, যে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে, যে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্তরে ফোন করবার অধিকার আছে ।এক রাজনৈতিক দলে অবস্থান করে, সেই দলের কোনো প্রবীণ নেতা অপর কোনো সহযোদ্ধাকে ফোন করতেই পারেন। তারা রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা করতেই পারেন ।পরামর্শ দিতে পারেন এ।মনকি নির্দেশও জানাতে পারেন। কিন্তু সেই বিষয়টাকে, ফোনালাপের একজনের নিভৃতচারী অভ্যাস কে সম্মান জানিয়ে, অপরজনের কি সেটাকে পাবলিক করা নীতিগতভাবে ,যুক্তিসঙ্গতভাবে, নৈতিকভাবে সঠিক কাজ?

নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে, কেউ যদি এভাবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতন প্রবীণ শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতির প্রাঙ্গণ থেকে শারীরিক কারণে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন ,তার সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা কে সামনে নিয়ে এসে, একটা শোরগোল তুলতে চান, তাহলে কি এটাই মনে হয় যে, নির্বাচন নয়, দলীয় রাজনীতিতে, নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এটা একটা ভিন্নধারার কৌশল?

আমি রাজনীতিতে কতটা অপরিহার্য যে ,আমি রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেবো, একথা ঘোষণা করার পরেও, স্বয়ং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আমাকে ফোন করে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন -- এই ধরনের শিশুসুলভ মানসিকতা আর যাই হোক দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অশোক ভট্টাচার্যকে মানায় কিনা, সেই প্রশ্নটা ভাবী কালের জন্যই তোলা রইল।

অশোক ভট্টাচার্য যে ভাবে বুদ্ধদেব বাবুর ব্যক্তিগত ফোনবার্তা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন, তাতে একটা রাজনৈতিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রশ্নটি হল, দলের কোনো পদে অবস্থান না করেও কি বুদ্ধবাবু সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন ,সেটা বোঝানোর লক্ষ্যে তিনি ফোন করেছিলেন অশোক ভট্টাচার্যকে ?

ব্যাপারটা কিন্তু আদৌ তা নয়। কোনভাবেই পর্দার আড়াল থেকে দলকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেই ।অথচ অশোক ভট্টাচার্য এই ব্যক্তিগত আলাপচারিতা কে যে ভাবে উপস্থাপিত করলেন, তাতে কিন্তু তিনি নিজের গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে, বুদ্ধদেবের রাজনৈতিক শৃঙ্খলাবোধকে ঘিরে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করলেন। যে বিতর্কের ধারপাশ দিয়ে বুদ্ধদেব বাবুকে কখনো হাঁটেন না।

হয়তো সেটা বোঝাতেই সিপিআই (এম) তাদের মুখপত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়টির উল্লেখ করে এটাই বোঝাতে চেয়েছিল যে, ওই ফোনালাপটি ছিল একান্ত ব্যক্তিগত স্তরের রাজনৈতিক আলাপচারিতা ।সেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নিজের থেকে আগ বারিয়ে কোনো নির্দেশ অশোক ভট্টাচার্যের উপরে চাপিয়ে দেননি।

নিজের সম্বন্ধে অত্যন্ত উচ্চধারণা অশোক ভট্টাচার্যের ছিল, সেই জায়গাটি, একদম মাঠে ময়দানে নেমে ,গোটা বাংলায় যারা বামপন্থী রাজনীতি করেন, তাদের লড়াই-সংগ্রাম, বিরোধীদের হাতে মার খাওয়া ,নানা ধরনের আইনি জুলুমের মোকাবিলা করা, জেলখাটা --এই সবের প্রেক্ষিতে আমাদের ভেবে দেখা দরকার কারণ কমিউনিস্ট পার্টিতে কখনোই পার্টির রাজনৈতিক মতাদর্শের উপরে কোনো ব্যক্তির স্থান হতে পারে না। তাই আমরা যখন দেখি এই পৌর নির্বাচনে অশোক ভট্টাচার্য নিজের বহুকালের জেতা ওয়ার্ডেই আর জিতে আসতে পারেন না তখন আমাদের কাছে নানা প্রশ্ন উঠে আসে।

একদা যাকে অশোকবাবুর ভাবশিষ্য বলা হযতো, সেই শঙ্কর ঘোষ, গত বিধানসভা নির্বাচনের অল্প সময়ে আগে কেন তিনি সিপিএম দল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দিলেন? কেনই বা সেই ব্যক্তিটি গত বিধানসভা নির্বাচনে তার একদা রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক অশোক ভট্টাচার্যকে পরাজিত করে, বিধানসভায় প্রবেশ করতে পারলেন? এর পাশাপাশি প্রশ্ন উঠে আসে যে ,বিজেপি দলটি এখন রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে এতটাই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে যে, এক বছরেরও কম সময় আগে জেতা বিধায়ককে তাদের নামাতে হয়েছিল পৌর নিগমের নির্বাচনে। আর সেই নির্বাচনে অশোক ভট্টাচার্যের মতোই শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষও হেরে গিয়েছেন।

অনেকের মনেই প্রশ্ন, এই যে নতুন প্রজন্মের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়ার একটা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সিপিআই(এম) দলটি এগোচ্ছে, এই প্রশ্নে কি অশোকবাবুর সঙ্গে শঙ্করবাবুর শেষ পর্যন্ত সংঘাত তৈরি হয়েছিল? আর সেই সংঘাত থেকে কি অশোকের ভাবশিষ্যের বিজেপিতে যোগদান?

এই পুরনির্বাচন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ব্যক্তির অপরিহার্যত। অর্থাৎ তৃণমূল কংগ্রেসের যেখানেই, যিনি প্রার্থী হন, ওই দলের পক্ষ থেকে যেটা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে, যিনি প্রার্থী,তাকে আপনাদের দেখতে হবে না, প্রার্থী হচ্ছেন কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেটা লোকসভা নির্বাচনেই হোক, সেটা বিধানসভা নির্বাচনই হোক, সেটা পুরসভা নির্বাচন আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচন সর্বত্রই একই জিনিস দেখা যাচ্ছে।

মমতার অপরিহার্যতা কি মানুষ সর্বাত্মকভাবে গ্রহণ করছে? কারণ, বিরোধীরা নির্বাচন সন্ত্রাস ঘিরে অনেক অভিযোগ আনলেও, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, চারটি পৌরনিগমের নির্বাচনের সন্ধ্যেবেলায় শিলিগুড়ির নির্বাচন ঘিরে অশোক ভট্টাচার্য কিন্তু বড় রকমের কোনো বেনিয়ম ইত্যাদির অভিযোগ করেননি । এমনকী চন্দননগর পৌরনিগমের নির্বাচনেও সিপিআইএম-এর বেশ কিছু প্রার্থী খুব সামান্য ভোটে হেরে গিয়েছেন। আসানসোলে একজন তৃণমূল প্রার্থী তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নির্দল প্রার্থীর সঙ্গে সমান ভোট পেয়েছিলেন। টসে জিতে তাকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এই প্রেক্ষিতে আমাদের ভাবা দরকার যে, একাধিক পুরসভার যে ভোট গুলি দরজায় কড়া নাড়ছে, সেখানে এই সব রাজনৈতিক বিষয়গুলোই প্রধান হয়ে উঠবে, নাকি নাগরিক পরিষেবা বিষয়টি সামনে উঠে আসবে।

লিখেছেন
Gautam Roy
Gautam Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।