কৈলাসে ঘুরতে গিয়ে নিখোঁজ বাংলার একাধিক পর্যটক, উদ্বিগ্ন পরিবার
Bengali tourists missing in Nepal: দক্ষিণ কলকাতার নেতাজীনগরের বাসিন্দা রিনা বন্দ্যোপাধ্যায় 'চলো যাই' দলের সঙ্গে কৈলাসে গিয়েছিলেন। দুর্যোগের পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিনিধি রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তাঁর দিদি জানান, "রিনা আমার বোন। সোমবার রাত্রে বেলার শেষ কথা হয় ওর সঙ্গে। তার পর থেকে আর ওর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তবে নবান্ন, নেতাজীনগর থানার তরফ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।"
নেপাল ও চিন-তিব্বত সীমান্তে লেন্দে ও ভোটেকোশী নদীতে আচমকা নেমে আসা হড়পা বানে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা। বহু বাড়িঘর, সাঁকো এবং পাহাড়ি রাস্তা কাদা আর পাথরের নিচে চাপা পড়েছে। কৈলাস-মানস সরোবর আর গোসাইকুণ্ডের উদ্দেশ্যে বেড়াতে গিয়ে চরম বিপদের মুখে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বহু পর্যটক। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দুই চব্বিশ পরগনা, দুর্গাপুর ও শিলিগুড়ি—রাজ্যের নানা প্রান্তের পর্যটকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারের মানুষেরা।
অগাস্টের এই সময়ে পূর্ণিমার কারণে মানস সরোবর ও গোসাইকুণ্ডে পুণ্যস্নানের জন্য ভারত ও বিদেশের প্রচুর মানুষ নেপালে যান। সেই মতো অনেকে পৌঁছলেও বুধবার সকালে রাসুয়া জেলা ও তিব্বতের গিরং এলাকায় হিমবাহ এবং কাদাধস নেমে আসে। নদীর জল হঠাৎ বেড়ে গিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় একের পর এক গ্রাম ও রাস্তা। বহু গাড়ি এবং সেতু জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও শিবিরে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তবে বহু পর্যটকের এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়
দক্ষিণ কলকাতার নেতাজীনগরের বাসিন্দা রিনা বন্দ্যোপাধ্যায় 'চলো যাই' দলের সঙ্গে কৈলাসে গিয়েছিলেন। দুর্যোগের পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ইনস্ক্রিপ্টের প্রতিনিধি রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তাঁর দিদি জানান—
"রিনা আমার বোন। সোমবার রাত্রে বেলার শেষ কথা হয় ওর সঙ্গে। তার পর থেকে আর ওর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তবে নবান্ন, নেতাজীনগর থানার তরফ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে।"
রঞ্জিত কুমার হাওয়ালদার
দক্ষিণ কলকাতার পর্ণশ্রীর বাসিন্দা রঞ্জিত কুমার হাওয়ালদার নেপালে গিয়েছিলেন। এই বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁর পরিবার তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি। তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইনস্ক্রিপ্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তাঁর পরিবার জানায়,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Himalayan Flash Floods in Nepal: কেন বারবার হড়পা বান হচ্ছে নেপালে? জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া, হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে জল নেমে আসা এবং ভূমিধসের মতো কারণ কীভাবে পাহাড়ি বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে? এই বিপর্যয়ের প্রভাব কি ভারতেও পড়তে পারে?
"আমরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। "
সুস্মিতা ভট্টাচার্য
কলকাতার কসবার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা সুস্মিতা ভট্টাচার্যের পুত্রবধূ তিয়াসা চট্টোপাধ্যায়ের রবিবারেও শাশুড়ির সঙ্গে স্বাভাবিক কথা হয়েছিল। কাঠমান্ডু পৌঁছে পশুপতিনাথ দর্শনের পর তাঁদের দল মানস সরোবরের পথে কেরুং এলাকার দিকে রওনা দেয়। তার পর থেকেই আর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
শর্মিষ্ঠা ভৌমিক
পাশাপাশি, প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়ও গত ২১ অগাস্ট একই দলের সঙ্গে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী শুভ্রাংশু রায় জানিয়েছেন, বুধবার থেকে শর্মিষ্ঠাদেবীর সঙ্গে কোনো ভাবেই ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্নেহাশিস দত্ত
হুগলির তারকেশ্বরের চাউলপট্টির বাসিন্দা স্নেহাশিস দত্ত বুধবার সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে শেষবার তাঁর স্ত্রী সোমা দত্তকে ফোন করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, সকাল আটটার মধ্যে তাঁরা ইমিগ্রেশন অফিসে পৌঁছে যাবেন। ঠিক সেই সময়টিতেই হড়পা বান আছড়ে পড়ে। স্নেহাশিসবাবু এবং তাঁর সঙ্গে থাকা একই এলাকার ভ্রমণ সংস্থার কর্মী জয়ন্ত সান্যালের মোবাইল তখন থেকেই বন্ধ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nepal floods: নেপালের ভয়াবহ বন্যাকবলিত এলাকায় তখন এত পর্যটকের ভিড় কেন ছিল? পূর্ণিমাকে ঘিরে কেন বাড়ে পর্যটকদের আনাগোনা?
অনিতা দাস
হাওড়ার সাঁকরাইলের আন্দুল হাটগাছার বাসিন্দা ৬৮ বছরের অনিতা দাস বহুদিনের ইচ্ছে পূরণ করতে একাই কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সকালে ছেলের সঙ্গে শেষ বার কথা হয় তাঁর। জানান, তাঁরা নেপাল সীমান্তের কাছে রয়েছেন। কিন্তু দুর্যোগের পর থেকে তাঁর মোবাইল বন্ধ। বৃহস্পতিবার সাঁকরাইল থানার পুলিশ ও ভবানী ভবনের আধিকারিকরা তাঁর বাড়ি গিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দেন।
লোপামুদ্রা কুন্ডু
দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের বৈকুণ্ঠপুরের বাসিন্দা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুন্ডু একা ঘুরতে পছন্দ করেন। বাড়িতে স্বামী, দুই সন্তান ও বাবা-মাকে রেখে কৈলাসের পথে রওনা হয়েছিলেন তিনি। বুধবার সকালে শেষবার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাঁর। তার পর থেকে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা দেবী
পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর থেকেও একাধিক পর্যটক গিয়েছিলেন। অম্বুজা টাউনশিপের বাসিন্দা ইস্পাত হাসপাতালের কর্মী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর শিক্ষিকা স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা দেবীর ফোন বন্ধ।
অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায়
একই ভাবে কোনো খবর মিলছে না তপোবন সিটির বাসিন্দা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায়ের।
স্বপন মণ্ডল ও মৌ মণ্ডল
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দম্পতি স্বপন মণ্ডল ও মৌ মণ্ডলের পরিবারের লোকেরাও চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সাত দিন আগে নেপাল পৌঁছলেও দুর্যোগের পর থেকে তাঁদের ফোনও বন্ধ।
সমর মণ্ডল
অন্য দিকে, উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির শান্তিনগর বউবাজার এলাকার বাসিন্দা সমর মণ্ডল কৈলাসের পথে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে তাঁর কাঠমান্ডু ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু তার পর আর কোনো খোঁজ না পেয়ে তাঁর দাদা ইতিমধ্যেই কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন।
নেপাল প্রশাসন ও ভারতীয় দূতাবাসের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জোরকদমে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। বহু পাহাড়ি রাস্তা ও ছোট সেতু ভেঙে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল বন্ধ, তাই আটকে থাকা মানুষদের হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ভারত ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকেও দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের নিখোঁজ পর্যটকদের পরিবারের সদস্যরা এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন, যাতে ঘরের মানুষগুলি দ্রুত এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসতে পারেন।






