নেপালের বন্যাকবলিত এলাকায় পর্যটকদের এত ভিড়ের কারণ কী?

Nepal floods: নেপালের ভয়াবহ বন্যাকবলিত এলাকায় তখন এত পর্যটকের ভিড় কেন ছিল? পূর্ণিমাকে ঘিরে কেন বাড়ে পর্যটকদের আনাগোনা?

inscript
৩ মিনিট
নেপালের বন্যাকবলিত এলাকায় পর্যটকদের এত ভিড়ের কারণ কী?

নেপালের রাসুয়া ও নুওয়াকোটে হঠাৎ বন্যা ও কাদাধসে যখন একের পর এক এলাকা বিপর্যস্ত, তখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এমন ভয়াবহ দুর্যোগের সময় সেখানে এত পর্যটক কেন ছিলেন? আসলে অগাস্টের এই সময়টিই নেপালের একাধিক ধর্মীয় ও পাহাড়ি পর্যটনস্থানে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মরসুম। বিশেষ করে পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে বহু ভারতীয় ও বিদেশি পর্যটক মানস সরোবর, গোসাইকুণ্ড এবং কৈলাস ট্রেকে যান। সেই পর্যটন মরসুমেই ২৬ অগাস্টের আকস্মিক বন্যা ও কাদাধস ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যায় একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাসুয়া জেলার ভোতেকোশি নদীর আশপাশে ভেসে গিয়েছে বাড়িঘর, রাস্তা ও সেতু। বহু এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।

এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিব্বতের কৈলাস পর্বতের কাছে মানস সরোবর এবং নেপালের রাসুয়া জেলার গোসাইকুণ্ড—দুটি হ্রদই হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র। প্রতি বছর কয়েক হাজার পর্যটক নেপাল হয়ে মানস সরোবরে যান। বছরের এই সময় বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকদের ভিড় বাড়ে। অনেকে মানস সরোবরের পাশাপাশি গোসাইকুণ্ডেও পবিত্র স্নান করতে যান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বন্যার বার্তায় ভারতকে সতর্ক করে কী বললেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী

Nepal Flood Crisis: নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর ভারতকেও কেন সতর্ক করলেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া ও হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি কি আগামী দিনে ভারতের জন্যও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে?

গোসাইকুণ্ডের সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি জড়িয়ে রয়েছে পাহাড়ি ট্রেকের আকর্ষণও। এই রুটটি পর্যটকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। পূর্ণিমার সময়কে শুভ বলে মনে করা হয়। ফলে এই সময়টিতেই বহু মানুষ গোসাইকুণ্ড ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছন।

এবার সেই পর্যটন মরসুমই পরিণত হয়েছে ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে। প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্পকে আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য কারণ মনে করা হলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষের স্রোত থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। চিনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, সেখানে কাদাধসের ঘটনায় নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৮ হয়েছে। গিয়িরং সীমান্ত চিন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। ফলে দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে পর্যটক ও সীমান্তপারের যাতায়াতেও।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আকাশে বৃষ্টি নেই, তবু হড়পা বান! তিব্বত থেকে কীভাবে নেপালে নামল জল-কাদা-পাথরের স্রোত?

Nepal flash flood today: ২৬ অগাস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ৪.৪ মাত্রার একটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর ঠিক আধ ঘণ্টার মধ্যেই তিব্বতের উজান থেকে প্রবল বেগে ঘোলা জলের স্রোত নামতে শুরু করে।

নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন। নিউজিল্যান্ডের কয়েক জন নাগরিকও ওই এলাকায় ছিলেন বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ইউক্রেন জানিয়েছে, ৫৩ জন ইউক্রেনীয় নাগরিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি। তাঁদের কেউ নিহত বা আহত হয়েছেন, এমন খবর অবশ্য এখনও পাওয়া যায়নি। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে থাকা একটি ভ্রমণ দলেরও বহু ব্রিটিশ নাগরিকের পরিবারের কাছ থেকে উদ্বেগজনক বার্তা আসছে।

নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ এখনও চলছে। প্রাথমিক হিসাবে মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৬০। কয়েকশো মানুষ এখনও নিখোঁজ। রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ৮২৬ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পর্যটকরাও রয়েছেন। প্রায় ৫৯০ পর্যটকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি। তাঁদের মধ্যে ৪৭৬ জন বিদেশি এবং ১১৪ জন নেপালি নাগরিক।

বন্যার জল বাড়তে থাকায় চিতওয়ান-সহ কয়েকটি এলাকায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জঙ্গল সাফারির জন্য জনপ্রিয় এই পর্যটন এলাকাগুলিতেও পরিস্থিতি নজরে রাখা হচ্ছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবিক সহায়তা সংস্থা OCHA-র হিসাবে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের অবিলম্বে ত্রাণ প্রয়োজন। কোথাও পুরো বসতি ধ্বংস হয়েছে, কোথাও নিশ্চিহ্ন হয়েছে রাস্তা ও বাজার। একের পর এক সেতু ভেঙে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় স্থলপথে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আকাশপথে ত্রাণ পাঠানোর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রশাসনকে।

দুর্যোগের পরে প্রায় আট টন ত্রাণ দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে উদ্ধারকাজ যত এগোবে, নিখোঁজদের খোঁজ মিললে ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর প্রকৃত ছবিটা আরও স্পষ্ট হবে। যে সময় হাজার হাজার মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাস, পূর্ণিমার পুণ্যস্নান কিংবা পাহাড়ের টানে নেপালের এই দুর্গম অঞ্চলে গিয়েছিলেন, সেই সময়ই প্রকৃতির আচমকা রূপ বদলে যাওয়া এই পর্যটন মরসুমকে পরিণত করেছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ে।

লিখেছেন
inscript
inscript
15 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?

নেপালের হড়পা বান: হিমালয়ে কেন বাড়ছে হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যা?

Nepal glacier disaster: নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লাংতাং উপত্যকায় হিমবাহ ধসে প্রাণহানি ৩৮৯ জনের, নিখোঁজ ১,৪০০-র বেশি। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্প নয়, বরফের স্তূপ ভেঙেই বিপর্যয়। আইসিআইএমওডির তথ্য বলছে, প্রতি ৩০ মিনিটে নদীর জল ৯ মিটার বেড়ে গিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রত্যক্ষ ফল আজ হিমালয় থেকে সারা বিশ্বকে সতর্ক করছে।