নারীদেহের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
নারীদেহের বন্ধ্যাত্বের সমস্যা

বন্ধ‍্যাত্ব এক আধুনিক সমস‍্যা। এই সমস‍্যা যে আগে ছিল না এমনটা নয় কিন্তু বর্তমানে নাগরিক জীবনে অভ‍্যস্ত মানুষদের প্রায় ঘরে ঘরেই এই সমস‍্যা দেখা দিয়েছে। ‘সেন্টারস্ অব ডিসিস কন্ট্রোল এবং প্রিভেনশন’– এর মতে, আমেরিকার মতো দেশে বছরে প্রায় ৬.৭ মিলিয়ন মানুষ এই সমস‍্যায় আক্রান্ত। ভারতের পরিসংখ‍্যানটা আরও ভয়াবহ। মোট জনসংখ‍্যার প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ বিবাহিত নারী-পুরুষ এই সমস‍্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন।

৩০ মিলিয়ন দম্পতির মধ‍্যে কেবলমাত্র ৩ মিলিয়ন দম্পতিই এর চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে থাকেন। জানলে অবাক লাগলে, শহুরের মানুষদের মধ‍্যেই এই সম‍স‍্যা অধিকমাত্রার লক্ষ করা যায়। ভারতে, শহরে বসবাসকারী প্রতি ছয়জনের মধ‍্যে একজন বিবাহিত দম্পতি বন্ধ‍্যাত্বের শিকার। তবে, এই সমস‍্যার সম্মুখীন হ‌ওয়া মানুষের পরিমাণ‌ও যেমন বেশি, সেরকম‌ই বর্তমানে চিকিৎসা ব‍্যবস্থার উন্নতির কারণে, ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ে নানা ধরনের চিকিৎসার মাধ‍্যমে অনেকেই এই সমস‍্যার হাত থেকে রেহাইও পাচ্ছেন অতি সহজেই। বন্ধ‍্যাত্বের জন‍্য শুক্রাণু এবং ডিম্বাণু উভয়েরই সমান গুরুত্ব থাকে। ডিম্বাণু নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আজ আপনাদের জানাব।

একজন কন‍্যাশিশু যখন জন্মগ্ৰহণ করে, তখন তার দেহে ডিম্বাণু সংখ‍্যা থাকে প্রায় কয়েক লক্ষের মতো। তারপর আসে মাসিকের পালা। একজন সুস্থ স্বাভাবিক নারীদেহে মাসিক শুরু হয় ১২ থেকে ১৪ বছর বয়েসের মধ‍্যেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেই সময় থেকেই ক্রমে ডিম্বাণুর সংখ‍্যা কমতে শুরু করে । সেই সময় এই সংখ‍্যা এসে দাঁড়ায় চল্লিশ হাজার এবং বাকি ডিম্বাণুগুলি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর তিরিশের কাছাকাছি বয়সে বা তিরিশের পরবর্তী বয়সে ডিম্বাণুর সংখ‍্যা খানিক দ্রুত হারে কমতে শুরু করে এবং সর্বশেষে ৪২ বছর বয়সে অতিদ্রুত হারে এই ডিম্বাণুগুলি নষ্ট হতে শুরু করে তখন স্বাভাবিকভাবে গর্ভবতী হ‌ওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পায়। এইসময় সন্তানধারণের জন‍্য অনেকেই ডাক্তারি পরামর্শ নিয়ে থাকেন। তবে এই সমস‍্যা যে কেবলমাত্র বয়সজনিত তেমনটাও নয় । অনেকের ওভারি বা ডিম্বাশয়ের কোন সমস‍্যা থাকলেও তাঁরা এই বন্ধ‍্যাত্বের সর্বোপরি ডিম্বাণু নষ্টের সম্মুখীন হতে পারেন।

অনেক মহিলার ক্ষেত্রেই মূলত ওভারি বা ডিম্বাশয়ে পূর্বের কোন সমস‍্যা থেকে ‘প্রিম‍্যাচিওর মেনোপজ’ হতে দেখা যায়, আবার অনেকে এরফলে অনিয়মিত মাসিক হতে দেখা যায়, অনেকের আবার মাসিক সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়।

সমস‍্যার কথা তো অনেক হল, এবার আসা যাক সমস‍্যা সমাধানের কথায়। চিকিৎসকেরা কিছু বিশেষ পদ্ধতির মাধ‍্যমে এই ডিম্বাণু হ্রাসের বা ডিম্বাণু উপস্থিতির পরিমাপ করে থাকে । মূলত, যাঁদের ওভারিতে কখনও সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়েছে কিংবা যাঁদের বয়স ৩৫ এর বেশি অথবা যাদের ওষুধেও কোনরকমের ধনাত্মক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, তাঁদের ক্ষেত্রেই এই পন্থাগুলি গ্ৰহণ করা হয়ে থাকে।

চিকিৎসকেরা মহিলাদের মাসিক চলাকালীন, রক্তে অবস্থিত ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন এবং ইস্ট্রোজেন পরিমাপ করে থাকেন। ফলিকল হরমোনের অধিক মাত্রায় বেড়ে যাওয়া এবং ইস্ট্রোজেন হরমোনের কমে যাওয়ায় ফলে যে অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয় তা ডিম্বাণুর ক্ষেত্রে ক্ষতিকর। আবার রক্ত পরীক্ষার মাধ‍্যমে শরীরের অবস্থিত অ্যান্টিম‍্যুলেরিয়ান হরমোনের পরিমাপ করেন , এই হরমোনটি ফলিকল থেকে উত্পাদন হয়ে থাকে। যদি শরীরে এই অ্যান্টিম‍্যুলেরিয়ান হরমোনের পরিণাম কম হয় , তার মানে বুঝতে হবে ফলিকলের পরিমাণ কম এবং ফলিকলের সংখ‍্যা কম হ‌ওয়া মানেই গর্ভধারনের সম্ভবনা কম হয়ে যায়। আলট্রাসোনোগ্ৰাফির মাধ‍্যমেও এই ফলিকলের পরিমাণ বোঝা সম্ভব । কিন্তু এরপরেও অনেকেই গর্ভধারণে সক্ষম হয়ে থাকেন। এছাড়াও ‘স্টেস টিউব বেবি’ র মাধ‍্যমেও আজ অনেকেই মাতৃত্বের স্বাদ পেতে সক্ষম হয়েছেন।

এই প্রক্রিয়া হল বান্ধ‍্যত্বের চিকিৎসায় সর্বজন স্বীকৃত একটি পদ্ধতি । এই পদ্ধতির বিভিন্ন কৌশল রয়েছে, তার মধ‍্যে একটি হল আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে স্ত্রী দেহ থেকে একটি পরিণত ডিম্বাণু ‘ল‍্যাপারেস্কোপিক’ পদ্ধতিতে বের করে আনা হয় । তারপর সেটিকে নিয়ে যাওয়া হয় ল‍্যাবে , প্রক্রিয়াকরণের জন‍্য । এই এক‌ই সময়ে পুরুষ দেহ থেকে শুক্রাণু সংগ্ৰহ করা হয় এবং ল‍্যাবেই তারমধ‍্যে থেকে গুণমান বিচার করে একঝাঁক শুক্রাণু বেঁছে নেওয়া হয় । এরপর নিষিক্তকরণের জন‍্য ডিম্বাণুর ‘পেট্রিডিশে’ শুক্রাণু মিশিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে । মাতৃগর্ভের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করার উদ্দেশ‍্যে একটি ‘ইনকিউবিটরে’ ওই পেট্রিডিশটি রেখে দেওয়া হয় এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টা পর জানা যায় প্রক্রিয়াটির সফলতা সম্পর্কে। এরপ‍র ভ্রুণ সৃষ্টি হলে তা একটি বিশেষ নলের দ্বারা মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করা হয় এবং এরপরেই অন‍্য ভ্রুণের মতোই তা বেড়ে চলে এবং মানবশিশুর জন্ম ঘটে । সূচনাপর্ব ছাড়া একেবারেই সাধারণভাবে শিশুটি মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠে। বহু ক‍্যানসারে আক্রান্ত মহিলা, যারা কেমো থেরাপি নিতে বাধ‍্য হয়েছেন , তারা এই পন্থায় আজ ফুটফুটে এক শিশুর জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন ।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।