পিজ্জা-বার্গারের খিদে কমবে শরীরচর্চাতেই, হাতেনাতে প্রমাণ গবেষণায়

Sindhu Som
৩ মিনিট
পিজ্জা-বার্গারের খিদে কমবে শরীরচর্চাতেই, হাতেনাতে প্রমাণ গবেষণায়

এই ব্যস্ত ছোটাছুটির জীবনে খাওয়াদাওয়া বেশ কিছু ক্ষেত্রে সারতে হয় বাড়ির বাইরেই। হালকা কিছু অথবা ভাজাভুজিই (যা মোটেও হালকা নয়) এক্ষেত্রে সম্বল। মোটের ওপর সহজে তৈরি খাবার পেয়ে যাওয়ার সুবিধে ইত্যাদি জাঙ্ক ফুডের একটি বিরাট বাজার তৈরি করেছে। অপরদিকে ঘরে থাকলেও চিপস, বার্গার, চিজ বল জাতীয় খাবারের চাহিদা কমে যায় না। বরং সমীক্ষা বলছে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে একাকী, উদ্বিগ্ন মানুষ খায় স্বাভাবিক পরিমাণের থেকে বেশি। একে 'স্ট্রেস ইটিং' বলে। বস্তুত, বর্তমান বিজ্ঞান এই খাওয়ার নেশা বা চাহিদাকে ড্রাগের নেশার মতোই দেখে থাকে। ক্যালোরি জমানোর এক ধরনের বিশেষ নেশা সৃষ্টির পিছনে হাত কিন্তু সেই জাঙ্ক ফুডেরই। অথচ দিনের পর দিন এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে। পুঁজির দুনিয়ায় কাটতি বেশি এমন দ্রব্যের উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব নয়। কাজেই কীভাবে একে এড়িয়ে চলা যায়, সেই বিষয়ে মানুষেরই সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

দীর্ঘদিন এই নিয়ে নানা রকমের গবেষণা হয়েছে। বর্তমানে দু'টি গবেষণা জাঙ্ক ফুডের বিকল্প খুঁজে পেয়েছে। এবং শুনলে আশ্চর্য হবেন, সেই বিকল্প ক্যালোরি জমানোর সম্পূর্ণ উলটো পথ, ক্যলোরি বার্ন বা ক্যলোরি ঝরানো। এবং তার মাধ্যম কী? এই বিষয়ে একমত দু'টি গবেষণাই। মাধ্যম হল, এক্সারসাইজ। অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা স্নেহজাতীয় খাবারের এই নেশা নিয়ে খুব সম্প্রতি একটি পরীক্ষা চালায় ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি। ২৮টি ইঁদুরকে একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষা দেওয়া হয়। তাদের শেখানো হয়, একটি বিশেষ ধরনের লিভারে চাপ দিলে আলো জ্বলবে এবং একটি আওয়াজ হবে। আলো ও শব্দের পরপরই তাদের প্রচুর ফ্যাটসম্পন্ন খাবার দেওয়া হতে থাকে প্রতিবার। এতে করে ইঁদুরেরা লিভারে চাপ দিয়ে খাবার খেতে চাওয়ার প্রক্রিয়া রপ্ত করে নেয়। এবারে গড়ে কতবার তারা এই লিভার চেপে খাবার আদায়ের চেষ্টা করছে তার একটা পরিসংখ্যান নেওয়া হয়। এরপরে ইঁদুরদের দু'টি দলে ভাগ করা হয়। এক দলকে নিয়ম মেনে তাদের দৈনিক কার্যকলাপ করতে ছাড় দেয় বৈজ্ঞানিকেরা। আরেক দলকে প্রচণ্ড বেগে ট্রেডমিলে দৌড় অভ্যেস করানো হয়। এই তিরিশ দিন প্রচুর ফ্যাটজাতীয় খাবার ইঁদুরগুলিকে দেওয়া হয় না। মাসের শেষে ফুড লিভারটি ফের ফিরিয়ে আনা হয় ইঁদুরের খাঁচার মধ্যে। কিন্তু খাবার এবারেও দেওয়া হয় না। কারা কতবার খাবার চায়, সেটাই ছিল দেখার বিষয়। এতে দেখা যায়, যে ইঁদুরগুলি এক্সারসাইজ করেনি, তারা লিভারে চাপ দিল, অর্থাৎ সেই জাঙ্ক ফুড খেতে চাইল অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে যেসব ইঁদুর ছোটা প্র্যাকটিস করেছিল, তারা সেভাবে খেতে চাইল না। গবেষকরা এর থেকে অনুমান করছেন, এক্সারসাইজ দ্বারা জাঙ্ক ফুড ক্রেভিং বা জাঙ্ক ফুডের প্রচণ্ড চাহিদা কমানো সম্ভব।

পাশাপাশি ২০১৬ সালে হওয়া একটি গবেষণার কথা বলি। সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এই গবেষণা করেছিলেন। বিজ্ঞান ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে, ঘুম কম হওয়ার সঙ্গে খাওয়ার একটা সম্পর্ক রয়েছে। রাতের ঘুম ঠিকমতো না হলে বা অত্যন্ত কম হলে, দেখা গিয়েছে, অতিরিক্ত মিষ্টি বা স্নেহজাতীয় খাবার খাওয়ার একটা ঝোঁক দেখা যায় মানুষের মধ্যে। এই ঝোঁক কীসে কাটানো যায়, তাই নিয়ে গবেষণা চলছিল। ঘুম স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওজন কমানোর পরিকল্পনা করার সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘুমটাকে হিসেবের মধ্যে রাখতেই ভুলে যায় মানুষ। দীর্ঘদিন স্বাভাবিক মাত্রায় ঘুম না হলে, অর্থাৎ সাত ঘণ্টারও কম ঘুম ব্যপক ওজনবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জাঙ্ক ফুডের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার এটি অন্যতম প্রধান কারণ। সুইডিশ গবেষকদের দলটি কয়েকজন মানুষের ওপর পরীক্ষা চালান। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষায় তাদেরই অংশগ্রহণ করার অনুমতি দেওয়া হয়, যাদের স্বাস্থ্য বেশ ভালো, এবং এন্ডোক্যানাবাইনোডিসের মাত্রাও স্বভাবিক। এন্ডোক্যানাবাইনোডিস একটি মস্তিষ্কনিঃসৃত রস, যা মানুষের শরীরে অবস্থিত স্নায়বিক রিসেপ্টরগুলিকে জাগিয়ে তোলে। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে মানুষের শরীরে এন্ডোক্যানাবাইনোডিসের মাত্রা বাড়ে এবং সেই কারণেই জাঙ্ক ফুড খাওয়ার দিকে প্রবল ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়।

গবেষণাগারে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ‘স্বাভাবিক’ সময় ধরে (সাড়ে আট ঘণ্টা) ঘুমোনোর সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরীক্ষা করা হয়। এরপরে তিনদিন লাগাতার চার ঘণ্টামাত্র ঘুমোনোর সুযোগ দেওয়া হয়। খাবারদাবার এবং দৈনিক কাজকর্ম দুই ক্ষেত্রেই এক রাখা হয়। বারে বারে রক্ত পরীক্ষা করে এন্ডোক্যানাবাইনোডিসের মাত্রা মাপা হতে থাকে। শেষের দিন স্বল্প পরিসরের প্রচণ্ড এক্সারসাইজ করিয়ে তারপরে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, ঘুমের ঘাটতি ঘটায় রক্তে '২-অ্যারাকিডোনয়েলগ্লিসারল’ বেড়ে গয়েছে প্রচুর, প্রায় ৮০ শতাংশ। মাথা থেকে নিঃসৃত এন্ডোক্যানাবাইনোডিসগুলির মধ্যে এটির ক্ষরণই সব থেকে বেশি। যাই হোক, শেষের দিন ৩৫ মিনিট প্রচণ্ড বেগে এক্সারসাইজ করার পর রক্ত পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, এর মাত্রা কারও ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, কারও ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশই নেমে গিয়েছে। অর্থাৎ, আবার স্বাভাবিক স্তরে ফিরে গিয়েছে এন্ডোক্যানাবাইনোডিসের মাত্রা। খেলাধুলো, এক্সারসাইজ স্ট্রেস কাটাতে সাহায্য করে বহুল পরিমাণে। স্থায়ী অনিদ্রার রোগে এক্সারসাইজ স্বাভাবিক ঘুমে ফেরার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি। যাই হোক, দিনের শেষে দুই দল বিজ্ঞানীই একমত। জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রবল আকর্ষণ এড়াতে চাইলে রোজ ভালো করে ঘুমান, এবং এক্সারসাইজ করুন।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

করোনা সেরে গেলেও পিছু ছাড়ছে না ক্লান্তি! লং কোভিড নিয়ে নতুন গবেষণায় কী জানা গেল?

Long COVID: করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকের শরীরে থেকে যাচ্ছে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা। লং কোভিড নিয়ে নতুন মার্কিন গবেষণায় দেখা গেল, তিন বছরে প্রায় অর্ধেক রোগীর উপসর্গ কমেছে এবং এক-চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোন ধরনের উপসর্গ থাকলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? কী বলছে গবেষণা?

কলকাতা বন্দরে উদ্ধার সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ই-সিগারেট, শরীরের কী কী ক্ষতি করে এই ইলেকট্রনিক সিগারেট?

E-Cigarette Side Effects: কলকাতা বন্দরে প্রায় ৫৫ হাজার ই-সিগারেট উদ্ধার করেছে রাজস্ব গোয়েন্দা দফতর (DRI)। উদ্ধার হওয়া পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৩.৫ কোটি টাকা। ভারতে নিষিদ্ধ এই ইলেকট্রনিক সিগারেট শরীরের কী কী ক্ষতি করতে পারে?

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর হতে পারে?

Fatty liver: ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় DT-109 কতটা কার্যকর? অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে এই পরীক্ষাধীন ওষুধ লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে? প্রাণীর শরীরে আশাব্যঞ্জক ফল মিললেও মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা কি প্রমাণিত হয়েছে? ভবিষ্যতে কি গুরুতর ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় নতুন দিশা দেখাতে পারবে DT-109?

ইউক্রেনকে বিসর্জন দিয়ে পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প?

Trump Putin relationship: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠতা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণকে নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে?

বাংলার স্বাস্থ‍্যরক্ষায় সরকারি স্বাস্থ্যব‍্যবস্থা সংহত হওয়া জরুরি: অভিজিৎ চৌধুরী

Abhijit Chowdhury Interview: তিনি বাঙালির ‘লিভারের ডাক্তারবাবু’ বলেই সমধিক পরিচিত। দীর্ঘদিন সরকারি ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। অবসরের পরেও জড়িয়ে রয়েছেন চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে। সোনারপুরে গড়ে তুলেছেন ‘লিভার ফাউন্ডেশন’। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলে তাঁর পরবর্তী স্টেশন ‘স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়’।

হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হলে কী করবেন? নানা পাটেকরের মৃত্যুর পর জেনে নিন CPR-এর জরুরি নিয়ম

How to perform CPR: ধরুন, হঠাৎ কেউ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। ডাকলেও সাড়া দিচ্ছেন না, স্বাভাবিকভাবে শ্বাসও নিচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই। তাহলে, কী করবেন তখন?

থালায় খাবার, নাকি বিষ? খাদ্যব্যবস্থার ভিতরে যেভাবে ঢুকছে কীটনাশক ও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ

Poison on the Plate: বায়ার-মনসান্টো ও সিনজেনটার মতো 'বিগ সিক্স' কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে বিশ্বের বীজ বাজার। ২০২৩ সালে ভারতে ১০,৭৮৬ জন খাদ্য উৎপাদক কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৮ শতাংশ খাদ্য নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত গ্লাইফোসেটকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্ষতিকারক ‘সম্ভাব্য কার্সিনোজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও এর ব্যবহার থামেনি। অন্যদিকে, প্রচারের অন্তরালে সিকিম আমাদের দেশের প্রথম শতভাগ জৈব কৃষির রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সারা বিশ্বজুড়ে কৃষিবিদ বন্দনা শিবার ‘পয়জন-ফ্রি ফুড অ্যান্ড ফার্মিং ২০৩০’ অভিযানের ডাক আমাদের খাবারের থালাকে বিষমুক্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।