বন্যাবিধ্বস্ত বেঙ্গালুরু আতঙ্কিত করছে সব শহরকে! কোথায় দাঁড়িয়ে কলকাতা
Bengaluru Flood: বেঙ্গালুরুর বিপর্যয় চোখের ওপর দেখল দেশ। কলকাতা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

আদিত্য একটি স্টার্ট-আপে কর্মরত। তার বাড়ি থেকে অফিসের দূরত্ব ১০ কিলোমিটার, যাত্রার সময় সাধারণত তিরিশ থেকে চল্লিশ মিনিট। আদিত্যর সংস্থা একটি অ্যাপ তৈরি করেছে, যা দশ মিনিটে আপনার বাড়িতে সামগ্রী পৌঁছে দেবে। সেই অ্যাপটির কাজের জন্য অফিস পৌঁছতে আদিত্যর সময় লাগল তিন ঘণ্টা। গত সপ্তাহের ঘটনা। স্থান বেঙ্গালুরু। সৌজন্যে বৃষ্টি এবং সীমাহীন দুর্নীতি এবং অযোগ্যতা।
ভারতের সিলিকন ভ্যালি প্রায় এক সপ্তাহ ডুবে ছিল জলের তলায়। তার কারণগুলিও উঠে আসছে একে একে। সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে ছবি, মিম, জোকস। কেউ কেউ তীব্র সমালোচনা করছেন বেঙ্গালুরুর, কেউ কেউ তার প্রতিবাদ করছেন। কেউ কেউ এতদিনে উপলব্ধি করছেন যে, নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংসের ফল কী হতে পারে। কিন্তু কিছু বিষয় আড়ালেই থেকে যাচ্ছে বা যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। সেই সঙ্গে অন্যান্য মেট্রো শহর এবং দেশের সব রাজ্যের রাজধানী নিয়ে আশঙ্কা উঠে আসছে, উঠে আসছে প্রশ্ন, কলকাতা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে।

বেঙ্গালুরুর বন্যা-পরিস্থিতি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না
প্রথমেই বেঙ্গালুরুর ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। বেঙ্গালুরু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ ফুট ওপরে অবস্থিত। হ্যাঁ, দেশের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলির মধ্যে বেঙ্গালুরুই উচ্চতম। সবথেকে অবাক করার মতো বিষয় হলো, এর উচ্চতা দেরাদুনের থেকেও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টি হলে জল নিচে নেমে যাওয়ার সুষ্ঠু বন্দোবস্ত প্রকৃতিই করে রেখেছে। সেই সঙ্গে কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় ওখানে হৃদ তৈরি করা হয়েছে স্তরে স্তরে, যাকে জুড়েছিল সুষ্ঠু নিকাশি ব্যবস্থা, মূলত খাল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বেঙ্গালুরুতে সারা বছরই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া থাকে এবং যথেষ্ট বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু সেই বৃষ্টিপাত কখনওই সমস্যার কারণ হতো না। কিন্তু সেই সুখের দিন শেষ। তার কারণটাও সবাই কম-বেশি বুঝে গেছেন। সীমাহীন দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে শহরের পরিকাঠামো। তবে বেঙ্গালুরুর বিষয়টা দেশের বাকি অংশ, বা শুধু যদি পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার নিরিখে বিচার করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে কর্নাটক অনেকটাই আলাদা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Drinking Water Pollution: বয়নশিল্প থেকে শুরু করে কাগজ শিল্প, কিংবা জল ও তেল প্রতিরোধী পদার্থ থেকে শুরু করে নন-স্টিক রান্নার বাসন, আগুন-রোধী ফোম তৈরি করা, সবেতেই ব্যপকভাবে ব্যবহার করা হয় PFAS।
বিগত তিরিশ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যাবে, কর্নাটক মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে দেখেছে পনেরো জন মুখ্যমন্ত্রী। কর্নাটকের সবথেকে আলোচিত মুখ্যমন্ত্রী বিএস ইয়েদুরাপ্পা-ই চার বার মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসেছেন এবং একবারও পুরো পাঁচ বছরের সময়সীমা পার করতে পারেননি। তার মধ্যে দু'বার তো তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন এক সপ্তাহেরও কম সময়ের জন্য। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এর সঙ্গে দুর্নীতি এবং বেঙ্গালুরুর বেহাল দশার কী সম্পর্ক? বিষয়টা খুব সহজ। আসলে যে মুহূর্তে কেউ ক্ষমতায় আসেন, গদিতে বসেন, তখন থেকেই তাঁর ওপর চাপ থাকে নিজের এবং দলের জন্য অর্থ জোগাড় করার এবং তার সবথেকে বড় হাতিয়ার হলো রাজধানী তথা মেট্রো শহরের জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ। যে ১৫ জন গত তিরিশ বছরে বেঙ্গালুরুর নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়েছেন, তাঁরা সবাই জানতেন যে, তাদের হাতে ক্ষমতা খুবই সীমিত সময়ের জন্য থাকতে পারে। তাই যথেচ্ছাচার করে তাঁরা জমি থেকে মুনাফা তুলেছেন। জলাভূমি বুজিয়ে, হ্রদ ধ্বংস করে তাঁরা শিল্পাঞ্চল করেছেন এবং অর্থ জোগাড় করেছেন। তাতে প্রকৃতি ধ্বংস হোক, শহরের স্বাস্থ্যহানি হোক, তাদের কিছুই যায়-আসেনি। ফলস্বরূপ যা হওয়ার হয়েছে। সেই সঙ্গে আরও একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বেঙ্গালুরু পুরসভার কোনও নির্বাচন গত দু'বছরে হয়নি। রাজ্য সরকার নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে নির্বাচন হতে দিচ্ছেন না। যতই রাজ্য সরকারের বেঙ্গালুরু বিষয়ক একটি দফতর থাকুক না কেন, পুরসভার কাজ তারা করেন না, করা সম্ভবও নয়। আজ এই সব অব্যবস্থার ফলাফল বেঙ্গালুরুবাসীরা হাতে-নাতে পাচ্ছেন।
এ তো গেল বেঙ্গালুরুর কথা। আমাদের শহর কলকাতা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আমাদের শহরের নিকাশি ব্যবস্থাও যথেষ্ট বেহাল। এক্ষেত্রে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, তা হলো পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। তাকে যেভাবে তিলে তিলে হত্যা করা হচ্ছে এবং শহরবাসী যে বিপদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে- তা যথেষ্ট আশঙ্কার।
বিগত এক দশক ধরেই দেখা যাচ্ছে, ধারাবাহিক বৃষ্টি হলেই কলকাতা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। তার অন্যতম বড় কারণ হলো পূর্ব কলকাতার জলাভূমির বেআইনি ভাবে বেদখল হয়ে যাওয়া। কলকাতা বিশ্বের বিরল কয়েকটি শহরের মধ্যে একটি যার কেন্দ্রীয় অংশে কোনও নিকাশি ব্যবস্থা বা জলশোধন ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনও পড়েনি। বহু কোটি টাকা ব্যয় করে যে কাজ অনেক শহরে করতে হয়, তা কলকাতায় হয়ে যায় সবার অলক্ষ্যে এবং বিনামূল্যে। সেই কাজটি করে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। আটের দশকে সেই রহস্যের সমাধান করেছিলেন তৎকালীন রাজ্য সরকারের পূর্ত বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। বাস্তুবিদ্যায় পিএইচডি ধ্রুবজ্যোতি বাবু কার্যত একার চেষ্টায় আবিষ্কার করেছিলেন যে, কলকাতার পূর্ব প্রান্তে যে বিপুল জলাজমি, যাকে চলতি ভাষায় আমরা ভেড়ি বলে থাকি, তা আসলে কলকাতার কিডনি। প্রতিদিন প্রায় সাতশো মিলিয়ন লিটার বর্জ্য জলকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির সহায়তায় প্রাকৃতিক উপায়ে জলজ বাস্তুতন্ত্রের শৈবাল এবং প্রাণীরা নিজেদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে শোধন করে এই জলাভূমিতে। সেই কারণে আমাদের অজান্তেই আমরা দূষিত জল থেকে বেঁচে যাই। সেই সঙ্গে শহরের কুড়ি শতাংশ মাছের জোগান দেয় এই জলাভূমি। সেই সঙ্গে এই জলাভূমির সবথেকে বড় অবদান হলো, নিম্ন গাঙ্গেয় অববাহিকার এই শহর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেঙ্গালুরুর মতো উচ্চতায় নেই। যথেষ্ট নিচু একটি শহর। তাকে ভয়াবহ বন্যার হাত থেকে এতদিন বাঁচিয়ে এসেছে এই রামসার সাইট।

ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ
কিন্তু নগরায়ন এই জলাভূমিকে তিলে তিলে মেরে ফেলছে। বামফ্রন্ট জমানা থেকেই সেই কাজের শুরু হয়। কিন্তু পালাবদলের পর তার গতি অনেক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনও আইনের তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র গজিয়ে উঠেছে কংক্রিটের জঙ্গল। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু'টি খাল, কেষ্টপুর এবং বাগজোলা, প্রায় অবরুদ্ধ হতে বসেছে। সারা পৃথিবীতে এমন প্রাকৃতিক জলনিকাশি ব্যবস্থা বিরল। যে কারণে রামসার সাইটের খেতাবও জুটেছে। কিন্তু তাকে রক্ষা করার নূন্যতম প্রচেষ্টা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই। আবাসন শিল্পের কোপে নানাভাবে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এই সাইট। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত জলে মিশছে বিষাক্ত ধাতব অবশেষ এবং রাসায়নিক- যা ক্ষতি করছে শৈবাল এবং মাছের। যেটুকু বেঁচে আছে, তার গভীরতা কমে যাচ্ছে। কলকাতায় ধারাবাহিক বৃষ্টি হলে সেই অতিরিক্ত জল আর এই জলাভূমির মাধ্যমে বেরিয়ে যাচ্ছে না, ধাক্কা খাচ্ছে অপরিকল্পিত নগরে।
মনে রাখতে হবে, এই শহরের ঢাল পশ্চিম থেকে পূর্বে। যদি কেউ মনে করেন যে, গঙ্গা কলকাতাকে বাঁচিয়ে দেবে, তাহলে সেই ধারণা ভ্রান্ত। জল যদি প্রাকৃতিক নিয়মে শহরের বাইরে বা মাটির তলায় যেতে না পারে, তাহলে বেঙ্গালুরুর দশা হওয়া সময়ের অপেক্ষা। গত এক দশকে শহরে স্থায়ী নির্মাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ২০০ শতাংশের ও বেশি। সেই সঙ্গে সবুজের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৭.৩ শতাংশ। বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার পুকুর, যারা শহরের স্বাস্থ্যকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তাই যতই নিকাশি নালার পলি পরিষ্কার করার কথা বলা হোক, স্থায়ী সুরাহা পাওয়া ভীষণ কঠিন একটি কাজ হতে চলেছে।
আমাদের রাজ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকাও কোনও কাজে আসছে না। বাঁচানো যাচ্ছে না শহরের পরিবেশ। একই দুয়ারে বিশ্ব উষ্ণায়নের বিপদ। সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ার বিপদ। তার ওপর দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্তরে পরিবেশ হত্যা। একথা বলাই বাহুল্য, কলকাতাবাসীর নিশ্চিন্তে থাকার, বা বেঙ্গালুরু নিয়ে মিম শেয়ার করার আনন্দের কোনও কারণ নেই। বরং প্রস্তুত হওয়া প্রয়োজন, আগামীর বিপদ সামলানোর জন্য।







