ভূস্বর্গ হয়ে উঠছে নরক! পরিবেশ ধ্বংস যে সর্বনাশ করছে কাশ্মীরের

উৎসাহ এবং ভালো কাজ করার তাগিদের চূড়ান্ত অভাব এই জলাভূমিগুলিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
ভূস্বর্গ হয়ে উঠছে নরক! পরিবেশ ধ্বংস যে সর্বনাশ করছে কাশ্মীরের

আচ্ছা ভূস্বর্গ কথার অর্থ কি? শব্দটা পড়েই নিশ্চয়ই আপনার মন চলে গেল কাশ্মীরে। কিন্তু একটা স্থানকে কেন বলা হয় ভূস্বর্গ? তার অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য? শুধু প্রকৃতির রূপের জন্য? না কি তার সঙ্গে যোগ হয় দুর্ধর্ষ প্রাকৃতিক ভারসাম্য? শক্তিশালী বাস্তুতন্ত্র? এই দুয়ের মেলবন্ধন ছাড়া তো ভূস্বর্গ তৈরি হওয়া সম্ভবও নয়, তাই না? কিন্তু যদি পৃথিবীর স্বর্গের পরিবেশ ধ্বংস হয়? তখন?

২০১৮ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের সরকার হোকেরসর নামের একটি জলাভূমি থেকে জল ছাঁচার কাজ শুরু করে। যাতে শ্রীনগরের বন্যার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ২০১৪ সালের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা থেকেই তাদের এই কাজ শুরু হয়।

কিন্তু পরিণাম একটু অন্যরকম হয়। হোকেরসর একটি রামসার সাইট। বিশেষ আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন এই জলাভূমি পরিণত হয় তৃণভূমিতে। ২০২২ সালে গ্রীষ্মে যখন আবার বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন এই তৃণভূমি অতিরিক্ত জল স্বাভাবিকভাবেই ধরে রাখতে অক্ষম হয়। সেই সঙ্গে ওই জায়গায় সরকার সঠিক সময়ের মধ্যে স্লুইস গেটও বসায়নি। বন্যাও আটকানো সম্ভব হয়নি, সেই সঙ্গে একটি জলাভূমির চরিত্র যাতে বদলে না যায়, তার জন্য যতটা জল থাকা প্রয়োজন ততটা পরিমাণ জল ধরে রাখাও যায়নি। ফলস্বরূপ আস্তে আস্তে শুকোতে থেকেছে এই রামসার সাইট। অথচ, ২০১৬ সালে এই সরকারই স্লুইস গেট বসানোর জন্য নির্দেশিকা জারি করে যাতে এই জলাভূমিতে সারা বছর অন্তত তিন থেকে চার ফুট জল থাকে। কিন্তু সেই নির্দেশিকা কাগজে-কলমেই থেকে গেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
করোনার পর কোন ভাইরাস? অতিমারীর ভয়াল দিন ফেরাচ্ছে জলবায়ুর ভোলবদল?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আশঙ্কা থাকছে অনেক মানুষের গৃহহীন হওয়ার। সেই সংখ্যার মধ্যে অনেকেই জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিনত হবেন, বাধ্য হবেন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে।

এই জলাভূমির মূল জলের উৎস হল দুধগঙ্গা নদী। এখানে সারা বছর ৬৮ ধরণের পরিযায়ী জলপাখির আগমন ঘটে বা ঘটত। যেমন, গ্রেট ইগ্রেট, গ্রেট ক্রেসটেড গ্রেব, লিটল করমোরান্ট, কমন শেলডাক, টাফটেড ডাক, এবং ফেরাঙ্গিনোয়াস ডাক। শীতে এদের আগমন হয় সাইবেরিয়া, চিন, মধ্য এশিয়া এবং উত্তর ইউরোপিয়ান দেশগুলি থেকে। এদের মধ্যে অনেক প্রজাতির পাখিই আজ বিপন্ন। তার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো এই ধরণের জলাভূমির ধ্বংস হতে থাকা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, জায়গাটা এতটাই শুকিয়ে গেছে যে, তারা সেখানে ছোট ট্রাক নিয়েও ঢুকে যেতে পারছেন। শুধু তাই নয়, ড্রেজিঙের সময় যে মাটি খনন করা হয়েছিল, তার আশি শতাংশই এখনও সেই স্থানে পড়ে আছে। তাহলে ওই খননের মানে কী দাঁড়াল? পুরো কাজের উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে গেল। সরকার পক্ষ থেকে এখন মুখ বাঁচানোর জন্যে খালি বলা হচ্ছে যে, যত দ্রুত সম্ভব তারা স্লুইস গেট বসানো হবে। সেই ফাঁকা প্রতিশ্রুতি। কবে বসাবে, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই।

এই বিষয়ে যখন সাংবাদিকরা কাশ্মীরের ডিভিশনাল কমিশনারের কাছে যান, তখন তাকে কোনওভাবেই পাওয়া যায়নি। প্রতিক্রিয়া তো অনেক দূরের বিষয়। যদিও তার অফিস থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি এই জলাভূমি সংরক্ষণের কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং নিয়মিত তিনি ওই স্থানে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন।

বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এই জলাভূমি বাঁচাতে অনেক সুপারিশ করেছেন। তাঁরা বলছেন যে, একটি একটি করে রামসার সাইট ধরে পরিকল্পনা না করে একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রয়োজন এই রাজ্যের সমস্ত জলাভূমির জন্য। সেই সঙ্গে তাঁদের সুপারিশ, যে সমস্ত আধিকারিকরা এই জলাভূমিগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের যাতে নিয়মিত গবেষণা থেকে আশা রিপোর্ট দিয়ে সাহায্য করা যায়। জেলা পরিকল্পনার সঙ্গে যেন জলাভূমি সংরক্ষণের কাজকেও জুড়ে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে পর্যটন শিল্পে যুক্ত সকল মানুষ, এবং পর্যটকদেরও যাতে জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা যায়, তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল, ভারতীয় সেনাকে যাতে এই কাজের অংশীদার করা যায়। ২০১৮ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়াও হয়েছিল, যাতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কিছু জওয়ানকে নিয়ে লাদাখে গ্রিন ব্রিগেড তৈরি করা যায়। কিন্তু আমলাতন্ত্রের জটে এই সুপারিশগুলির বেশিরভাগই কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

শুধুমাত্র প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য নয়, এই আমলারা যদি পর্যটন নিয়েও একটু ভাবতেন তাহলে জলাভূমিগুলি রক্ষা পেত, রাজ্যের আয় হতো কোটি কোটি টাকা। কিন্তু তাঁদের উৎসাহ এবং ভালো কাজ করার তাগিদের চূড়ান্ত অভাব এই জলাভূমিগুলিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং সেই সঙ্গে চরম ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সাত দিনের ব্যবধানে দুটো ঘূর্ণিঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা কি এটাই?

Climate change impact on cyclone: ২৮ অক্টোবরে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, ঠিক সাত দিন পর ৩ নভেম্বরে ল্যান্ডফল করে ‘মুরাসু’। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এই পিঠোপিঠি ঝড়ের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটোলজিক্যাল অ্যানোমালি'। বঙ্গোপসাগরের এই ‘ওভার-এনার্জাইজড’ অবস্থাই, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা।

কোথায় আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, কতটা ক্ষয়ক্ষতি, বাংলায় কী প্রভাব?

Cyclone Murasu: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। মঙ্গলবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। নেল্লোর, প্রকাশম ও বাপটলা জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে, নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। তামিলনাড়ু ও ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি হয়েছে। বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলবে মুরাসু?

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।

লুলার জয়ের পরেও কেন স্বস্তিতে নেই 'পৃথিবীর ফুসফুস' আমাজন?

lula's amazon policy: প্রথম পর্বে পিছিয়ে থাকার পর, কুড়ি দিনে এক কোটিরও বেশি ভোট বাড়িয়ে লুলা দা সিলভা চতুর্থবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। লুলার আমলে, আমাজনের জঙ্গল উজাড় হওয়া ৭১% কমেছে, তবু আইনসভায় ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি হওয়ায়, আমাজনের সংকটজনক সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেলই।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব : কোথায় রয়েছে, বাংলায় কতটা দুর্যোগের আশঙ্কা?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে অর্ণব। বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঝড়। সরাসরি বাংলায় আঘাত না হানলেও মঙ্গলবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি হতে পারে। কোন কোন জেলায় দুর্যোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?