হু হু করে বাড়ছে দুর্ঘটনায় মৃত্যু! পথ সুরক্ষা নিয়ে ঠিক কী ভাবছে সরকার

Road Accidents: পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু এড়াতে কী পদক্ষেপ করছে সরকার?

Satyaki Tat
৪ মিনিট
হু হু করে বাড়ছে দুর্ঘটনায় মৃত্যু! পথ সুরক্ষা নিয়ে ঠিক কী ভাবছে সরকার

If tomorrow I tell the press that a gangbanger will get shot, or a truckload of soldiers will be blowing up, nobody panics..because it's all part of the plan. But when I say one little old mayor will die, everybody loses their minds...

-The Dark Knight, 2008

২০২১ সালে পথদুর্ঘটনায় ১,৫৫,৬২২ জনের মৃত্যু হয়েছে ভারতে। তার মধ্যে ২৩,৫৩১ জনের মৃত্যু গাড়িতে বা গাড়ির কারণে। কারও টনক নড়েনি। সরকার এক ইঞ্চিও নড়েচড়ে বসেনি। কোনও নতুন নিয়ম প্রবর্তিত হয়নি। সরকারবাহাদুরের টনক নড়াতে সাইরাস মিস্ত্রিকে প্রাণ হারাতে হলো। টাটা সনস-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর সরকারের মনে হলো, এবার কিছু করা প্রয়োজন। অন্তত দেশের বিত্তবান মানুষ, যাঁরা চার চাকায় যাতায়াত করেন, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া যাক। কিছু মানুষের তো প্রাণ বাঁচবে। কী সুরক্ষা দিচ্ছেন তাঁরা গাড়ির সওয়ারিদের?

প্রস্তাব এসেছে, গাড়িতে ছ'টি এয়ারব্যাগ থাকা বাধ্যতামূলক করার। যাতে যাত্রীসুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। যদিও গাড়ি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হলে তবেই এই এয়ারব্যাগ বেরিয়ে আসে আরোহীদের প্রাণ বাঁচাতে। কিন্তু সেই দুর্ঘটনা কীভাবে এড়ানো যাবে, কীভাবে রাস্তাঘাটকে আরও সুরক্ষিত করা যাবে, তা নিয়ে সরকারের না আছে কোনও দিশা, না পরিকল্পনা। কেন্দ্রীয় পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গড়করি টোল ট্যাক্স আদায় করার অত্যাধুনিক উপায় তো বের করে ফেলছেন। কিন্তু নিরপরাধ মানুষ এবং তাঁদের পরিবারের প্রাণ কীভাবে বাঁচবে, সেই নিয়ে বিশেষ উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। আপাতত এয়ারব্যাগের সংখ্যা বাড়িয়েই তাঁরা দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শুধু মাল নদীর হড়পা বান নয়, অতীতেও উৎসবের নামে হুজ্জুতি বদলে গেছে মৃত্যুর বিভীষিকায়

Mal River Flash Flood: নজরুল মঞ্চে সঙ্গীতশিল্পী কেকের মৃত্যুর পরে এই প্রশ্ন উঠেছিল ফের। অপর্যাপ্ত জায়গায়, অপরিমিত বন্দোবস্ত সত্ত্বেও নাছোড়বান্দা জনতার ভিড় সামলানোর পরিকাঠামো না থাকলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না

সাইরাস মিস্ত্রি

তাও সেই রক্ষাকবচ, অর্থাৎ ছ'টি এয়ারব্যাগের নিয়ম চালু হতে এখনও অপেক্ষা করতে হবে এক বছর। এখনই বিত্তবান বা মধ্যবিত্তদের চারচাকা যাত্রা সুরক্ষিত করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবহণমন্ত্রী এই বছরের ১ অক্টোবরেই বাধ্যতামূলক করতে চেয়েছিলেন এই নিয়ম। কিন্তু পণ্য উৎপাদন বা আমদানির জটিলতার কারণে তাঁকে পিছিয়ে আসতে হলো বলেই তিনি জানাচ্ছেন। ২৯ সেপ্টেম্বর ট‍্যুইটারে গড়করি লেখেন, মোটরগাড়িতে যাতায়াত করা সকল যাত্রীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই তাঁর সরকারের অগ্রাধিকার। তাঁর বক্তব্য, আমাদের দেশের গাড়ি উৎপাদকরা বিদেশে যখন গাড়ি রফতানি করছেন তখন ছয়টি এয়ারব্যাগ থাকছে। কিন্তু দেশের বাজারে তা করতে দ্বিধা বোধ করছেন নির্মাতারা। বিশেষ করে ছোট এবং কমদামি গাড়ির নির্মাণের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণটা যদিও সহজেই অনুমেয়। একজন চারচাকা গাড়ির নির্মাতা যখনই ছ'টি এয়ারব্যাগ গাড়িতে লাগবেন, তখনই তার উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে, যার ফলে বাড়বে গাড়ির দামও। একেই গাড়ি বিক্রির সংখ্যা খুব বেশি বাড়েনি উৎসবের মরশুমেও। তার ওপর অতিরিক্ত এয়ারব্যাগ লাগিয়ে অনেকেই ব্যবসায় মন্দা আনতে নারাজ।

কেন্দ্রীয় পরিবহণমন্ত্রী এখানেই তাঁর উষ্মা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, নির্মাতারা কীভাবে মানুষের প্রাণের আগে অর্থনৈতিক লাভকে রাখতে পারেন। কিন্তু তিনিও তো নতুন পরিবহণমন্ত্রী নন। গত বছর দেশে পথ দুর্ঘটনায় ঘণ্টায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে অনেক মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র সিটবেল্ট না পরার কারণে। কোথায় সেই সংক্রান্ত নিয়ম? কেন এয়ারব্যাগের সঙ্গে সিটবেল্ট পড়া নিয়ে কড়া আইন প্রণয়ন করছে না কেন্দ্র? এই বিষয়ে নীতিন ট‍্যুইট করছেন না কেন? সাইরাস মিস্ত্রি তো দুর্ঘটনার সময়ে সিটবেল্ট পড়ে ছিলেন না। যেটা তাঁর মৃত্যুর অন‍্যতম কারণ। আসলে সিটবেল্ট নিয়ে নিয়ম আনলে তা নিয়ে কড়া নজরদারি করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় পরিবহণমন্ত্রী কি তাঁর দেশের আইন-রক্ষকদের নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন?

সেই সঙ্গে এই প্রসঙ্গে সবথেকে বড় প্রশ্ন- গাড়ি কোথাও ধাক্কা মারলে ছ'টি এয়ারব্যাগ খুলে যাবে, কিন্তু গাড়ির চালককে অতিরিক্ত গতিতে চালানো থেকে কে আটকাবে? কোথায় কড়া শাস্তির নিদান? একজন কোটিপতি ব্যবসায়ীর মৃত্যুতে সরকার নতুন নিয়মের কথা ভাবছে। কিন্তু যখন নিরপরাধ মানুষের প্রাণ চলে যায়? শেষ হয়ে যায় তাঁর গোটা পরিবার? দেশের কোনও না কোনও প্রান্তে প্রত্যেকদিন কেউ না কেউ চারচাকা বা বাইকের বেপরোয়া গতির কারণে প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রাণ হারাচ্ছেন রাস্তায় থাকা খানাখন্দর জন্যে। নীতিনবাবুর কাছে কি সেইসব খবর পৌঁছয়?

জাতীয় সড়ক, যা নিয়ে নীতিনবাবুর সরকার খুব গর্ব করেন, পরিসংখ্যান বলছে, দেশের পথ দুর্ঘটনার সবথেকে বেশি ঘটে সেখানেই, ৩০.৩%। সবথেকে বেশি মৃত্যুও ঘটে জাতীয় সড়কেই। শুধু ২০২১ সালে ৫৩,৬১৫ জন জাতীয় সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন। তার মধ্যে সিংহভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে অতিরিক্ত গতির জন্য। কোনও টুইট? কোনও নিয়ম? না, নেই। কেন নেই? কারণ সেই নিয়ম বলবৎ করতে প্রচুর পরিশ্রম, নিষ্ঠা প্রয়োজন। মন্ত্রী যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নন সেই বিষয় বলেই অনুমান করা যায়।

সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, দেশের সব মানুষ চারচাকা চড়েন? দেশের সব রাস্তা কি চারচাকার কথা ভেবেই তৈরি? বাকি যাঁরা দেশের রাস্তা ব্যবহার করেন? যাঁরা অন্য যানবাহন ব্যবহার করেন? তাঁদের সুরক্ষা? তাঁদের দোষ কি গাড়ি কেনার যথেষ্ট অর্থ না থাকা? যে দেশের সরকার পথসুরক্ষা বাড়াতে শুধুমাত্র এয়ারব্যাগের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেন, সেই দেশে আশা খুবই কম। প্রত্যেকের নিজেদের জীবন নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে। আমরা রোজ পথে বেরোই। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সবাই নিজের গৃহে ফেরেন না। পথ দুর্ঘটনা তাঁর বা তাঁদের প্রাণ কেড়ে নেয়। বড় জোর খবরে কয়েক লাইন বা কয়েক মিনিট। ব্যস, শেষ হয়ে যায় পরিবার। রোজ বেঁচে বাড়ি ফেরাকে মূল্য দিতে শেখা প্রয়োজন। কারণ আমাদের দেশের পথঘাট আজও মৃত্যুফাঁদ।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে যে ভুলগুলি এড়ানো জরুরি

Stock Market Psychology: শেয়ারবাজারে একজন বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা অনেক সময় সে নিজেই। আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক বাজারে এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ এখন সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ।

মহাবিশ্বকে বুঝতে গিয়ে সমাজকে ভুলে যাননি অশোক সেন

পিএইচডির প্রথম প্রায় তিন বছর তাঁর গবেষণায় কোনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিই হয়নি। চারদিকে শুধু স্থবিরতা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যেখানে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন বা হতাশ হয়ে পড়েন, অশোক সেন তা করেননি।

মেষ নয়, হায়াডিস? ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’ নিয়ে কী বলছে নতুন গবেষণা?

The Starry Night mystery: এর আগে দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে ভ্যান গগের আঁকা ছবিটির উপরের অংশটি মেষ রাশির কোনো তারামণ্ডল। তবে, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত 'দ্য অ্যাকচুয়াল স্কাই অফ ভ্যান গগস স্টারি নাইট: এ মাল্টিডিসিপ্লিনারি রিঅকনস্ট্রাকশন' নামক গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, ভ্যান গগের ছবির কেন্দ্রীয় পাঁচ তারার বিন্যাস মেষ রাশির সঙ্গে নয়, বরং হায়াডিস নক্ষত্রপুঞ্জের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে।

ডার্কওয়েবে SBI-র তথ্য ফাঁস, কতটা সুরক্ষিত আপনার সঞ্চয়? যা জানাচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞ

সন্দীপ সেনগুপ্তের পরামর্শ, যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তিনি এমনকি ব্যাঙ্কে রেজিস্টার্ড মোবাইল নম্বর পরিবর্তন এবং নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার কথাও বলেছেন।

আইনস্টাইনের কাল্পনিক পরীক্ষা এবার বাস্তবে, কোয়ান্টাম জগতের কণা-তরঙ্গ রহস্যের কী হলো?

Einstein Bohr quantum debate: সম্প্রতি ১০০ বছর আগের আইনস্টাইনের সেই কাল্পনিক পরীক্ষাটি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অব চায়না (USTC)-এর বিখ্যাত কোয়ান্টামবিজ্ঞানী জিয়ান-উই প্যান (Jian-Wei Pan) এবং তাঁর সহকর্মীরা ল্যাবরেটরিতে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

AI-এর যুগে মানুষ কি নিজের বুদ্ধিটাই মেশিনের হাতে তুলে দিচ্ছে?

Artificial Intelligence: ছোটবেলায় অনেকেই ভাবত রোবট এসে মানুষের কায়িক শ্রমের কাজগুলি করে দেবে। মানুষ অবসর পেয়ে গান শুনবে, কবিতা লিখবে কিংবা বারান্দায় বসে কফি খাবে। বাস্তবে দেখা গেল ঠিক তার উল্টো চিত্র। রোবট এখন কবিতা লিখছে, ছবি আঁকছে আর কোড তৈরি করছে। অন্যদিকে মানুষ সকাল থেকে রাত ল্যাপটপের সামনে বসে শিখছে প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং।

মহাকাশে রওনা নাসার টেলিস্কোপের, বদলে দিতে পারে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি?

NASA’s Roman Space Telescope: নাসার নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ বদলে দেবে মহাবিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি? হাবল ও জেমস ওয়েবের পর কেন প্রয়োজন হলো এই নতুন মহাকাশ-চোখের? ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, গ্যালাক্সি ও এক্সোপ্ল্যানেট সম্পর্কে কি নতুন তথ্য দেবে রোমান? মহাবিশ্বের প্রসারণের ইতিহাস বুঝতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ?

সৌরপৃষ্ঠ আসলে কেমন? ৩৩ বছর পর মিলল উত্তর

Sun’s surface mystery: সূর্যের পৃষ্ঠকে এতদিন দূর থেকে তুলোর মতো নরম ও শান্ত দেখালেও, তা কি সত্যিই এমন? বিশ্বের বৃহত্তম সৌর টেলিস্কোপ ড্যানিয়েল কে ইনোয়ের তোলা সর্বোচ্চ-রেজোলিউশনের ছবিতে দেখা গেল ছোট ছোট হিংস্র প্লাজমার ঘূর্ণি। ৩৩ বছর আগে করা জোয়ান কার্পেনের সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি অবশেষে সত্যি প্রমাণিত হলো? এই আবিষ্কার কি বদলে দেবে সৌরপৃষ্ঠ সম্পর্কে ধারণা?