হিটলার-ডিজনির প্রথম প্রেম! কলকাতার সবেধন নীলমণি এই ছায়াছবির গাড়ি

কী করে অবসর জীবন কাটানো যাবে, এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। বহু বই আছে, কীভাবে অবসর জীবন অর্থবহ করা যায়, সেই বিষয়ের ওপর। জাপানি পণ্ডিতেরা বলেন, জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস, প্রথম ইনিংসের চেয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং। অবসর জীবন নিজেকে চেনার, জানার সুযোগ দেয়।

কর্নেল সঞ্জয় ঘোষ যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিলেন, তখন তাঁর মাথায় এক অভিনব চিন্তা এল। তিনি ঠিক করলেন, অবসর জীবন কাটাবেন পুরনো গাড়িকে নতুন যৌবন দান করে। গাড়ি ইতিহাসের সাক্ষী, সময়ের সাক্ষী, তাই একটি পুরনো অযান্ত্রিককে সচল করার মধ্য দিয়ে সেই কালটিকে ধরে রাখা যাবে। ঘোষমশাই ইতিহাসের একনিষ্ঠ সেবক, আধুনিক সময়ের ইতিহাস তাঁর প্রিয় বিষয়।

পুরনো গাড়ি কিনব বললেই তো আর কেনা যায় না। শুরু হল তল্লাশি। সাহায্য করলেন পল্লব রায়মশাই, যিনি নিজেও একজন ভিনটেজ কারের সংগ্রাহক, তাঁর পুত্র, তাঁকে পাওয়া গেল বেঙ্গালুরুতে।

আরও পড়ুন: এই গাড়ি চড়েই দেশ ছেড়ে পালানোর পরিকল্পনা ছিল সুভাষচন্দ্রের

তাঁর জন্ম ১৯৬৭ সালে। খোদ জার্মানিতে। টুকটুকে লাল ১৩০০ সিসি-র ফোকসওয়াগন বিটিল। ২০২১ সালে ঘোষ পরিবার আলো করে তাঁর দাক্ষিণাত্য থেকে আনন্দের শহরে আগমন। লেফট হ্যান্ড ড্রাইভ।

প্রতি রবিবার কর্নেল সাহেব তাঁর ৫৪ বছরের সন্তানটিকে নিয়ে ভবানীপুরে একটি বিশেষ দোকানে সকালবেলা চা খেতে আসেন, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী। কথায় কথায় সেদিন বলছিলেন, কে বলবে ওর বয়স হয়েছে। কী তেজ এখনও, আর চালিয়ে যা আরাম, কোনও তুলনা নেই।

Volkswagen beetle

এরপরে ফোকসওয়াগন বিটিলের পরিবর্তন ঘটল। সামনের দিকে চেহারাও পরিবর্তন করা হয়। ১৫০০ সিসি আর ১৩০০ সিসি-র গাড়ি আসে। অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন। লালুবাবুই ১৩০০ সিসি-র বিটিলের শেষ প্রতিনিধি। পাওয়ার স্টিয়ারিং নেই, কিন্তু অনায়াসে ছোট জায়গাতে কাটানো যায়। গাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার নেই, ইঞ্জিনের পিছনের হাওয়াতে গাড়ির ইঞ্জিন ঠান্ডা হয়, যাকে বলে এয়ারকুলড ইঞ্জিন। চলবে যখন, তখন একেবারে মাটি কামড়িয়ে, যেন জার্মান ট্যাঙ্ক যাচ্ছে।

তিনের দশক তখন। জার্মানিতে ফুয়েরারের রাজত্বকাল। তিনি পোর্শে-কে বললেন, একটি "পিপল'স কার" বানাতে হবে। গাড়িটি হবে সস্তা এবং খুব তেজি। ১৯৩৮ সালে জার্মানিতে প্রথম ফোকসওয়াগন রাস্তায় নামল। ছোট্ট গাড়ি। একেবারে হাম দো, হামারা দো। ছোট পরিবারের অনেকেই নতুন গাড়িটি কিনলেন এবং শনিবার-রবিবার এই গাড়ি চালিয়ে পিকনিকে যাওয়াটা একটা চল হয়ে গেল।

রবিবারে মাঝে মাঝেই দেখা যেত স্বয়ং হিটলার তাঁর বিশাল ১২ সিলিন্ডারের মার্সিডিজ ছেড়ে বার্লিনের রাস্তায় ফোকসওয়াগন চড়ে বেড়াচ্ছেন। চালকের আসনে তিনি নিজে। চারপাশে তাঁর সেনানায়করা– রোমেল, হিমলার, রুনস্টিগ, গোয়েরিং রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন।

বিটিল গ্রান্ট পেল উইনস্টন চার্চিলের জন্য। যুদ্ধ যখন শেষ হলো চার্চিল বললেন, সেনাবাহিনীর কর্তারা বিনেপয়সায় বিটিল নিয়ে যেতে পারবে নিজেদের দেশে। বিটিল ছড়িয়ে পড়ল গোটা ইউরোপে, আমেরিকাতে। ফোর্ড মডেল 'টি' সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছিল এবং তা ছিল আমেরিকানদের গর্ব। অচিরেই ফোর্ড মডেল 'টি'-কে পিছনে ফেলে তার জায়গায় নতুনভাবে যাত্রা শুরু করল বিটিল।

যে গাড়ি জার্মানিতে ছিল জনগণের গাড়ি, তা হয়ে উঠল কাল্ট ভেহিকেল। বিদেশে বড়লোকদের যেমন মঁ ব্লাঁ কলম, গ্রেট ডেন বা সেই বার্নার্ড কুকুর না থাকলে আর বাড়িতে একটা গ্র্যান্ড পিয়ানো না থাকলে তাদের কৌলীন্য সম্পূর্ণ হয় না, সেই মর্যাদা পেল বিটিল। বাড়িতে রোলস বা ক্যাডিলাক বা লা সেল থাকলেও একটা বিটিল থাকতেই হবে।

ছয়ের দশকের গোড়াতে এল হিপি আন্দোলন। হিপিরা ফোকসওয়াগনকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেল। বিটিল তখন চূড়ান্ত আধুনিকতার প্রতীক। বিটিল চেপে হিপিদের দল এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে লাগল। অতি-আধুনিকতা আর বিটিল সমার্থক হয়ে উঠল। 'প্লেবয়' ম্যাগাজিনের মডেলরা বিটিলে চড়েছেন সেই ছবি পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ল।

ওয়াল্ট ডিজনির হার্বি হল ১৯৬৩-র ফোকসওয়াগন বিটিল। ১৯৬৮ সালের 'দ‍্য লাভ বাগ' ছবিতে হার্বির অভিষেক। হার্বির নিজের বুদ্ধি আছে, সে নিজেই নিজেকে চালাতে জানে। গোটা পৃথিবী তখন হার্বির প্রেমে মত্ত। গোটা একটি পরিবার হার্বিকে ঘিরে বয়ে চলেছে তাদের জীবন‌।

The love bug

'দ্য লাভ বাগ' (১৯৬৮) ছবির পোস্টার

হার্বির রেসিং নম্বর ৫৩। মেক্সিকোতে ওকে ভালবেসে ‘ভোচো’ বলে ডাকা হয়। মেক্সিকোতে বিটিলের খুব আদর, খাতির। ১৯৬৮-তে হার্বিকে দেখা যায় 'দ্য লাভ বাগ' ছায়াছবিতে। তারপর 'হার্বি রাইডস এগেন' ১৯৭৪। ১৯৭৭ আসে 'হার্বি গোজ টু মহিকার্লো' আর ১৯৮০ তে এল 'হার্বি গোজ টু বানানাস'। ১৯৯৭ সালে 'দ্য লাভ বাগ' (রিমেক) আর ২০০৫-এ 'হার্বি ফুললি লোডেড'। হার্বির ছায়াছবি পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে আর তা থেকে উপার্জন হয় ২৮০,৬৩৯,৮১৬ আমেরিকান ডলার। একটি গাড়িকে ঘিরে ছায়াছবির এই বিপুল জনপ্রিয়তা সত্যিই চিন্তার অতীত।

কর্নেল সাহেবের গাড়ির নম্বর ৫৪, হার্বির রেসিং নম্বরের চেয়ে একটি নম্বর বেশি। এর কারণ তিনি যখন লালুবাবুকে পান ২০২১ সালে, তখন তার বয়স ৫৪ বছর। লাল দেহের ওপর নীল আর সাদা রং করা আর দরজায় লেখা ৫৪, কলকাতার বিটিলটি একটি বড় পাওয়া।

আর এখন বিটিল তৈরি হয় না। শূন্য দশক থেকে এই মডেলটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থেকে গেছে। এখন অন্য চেহারা নিয়ে বিটিল আছে কলকাতায়, কিন্তু বিটিলের যে 'কিউট' চেহারা, সেটি নেই। হিটলার থেকে এলভিস প্রেসলি, জন লেনন থেকে সোফিয়া লরেন সবাই প্রেমে পড়েছিল বিটিলের। জার্মান টেকনোলজির সঙ্গে জনপ্রিয়তা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।

More Articles

;