অ্যাম্বাসাডর চালানো শেখো, বাঙালি যুবকদের বলতেন বিধান রায়

ভারতের মানুষের কাছে এই‌ মুহূর্তে একটি অন্যতম বড় প্রশ্ন, তিনি কি আবার ফিরছেন? কীভাবে ফিরছেন? তাঁর আগের চেহারা কি থাকছে, না নবকলেবরে তিনি আবির্ভূত হবেন। তিনি আমাদের অতি প্রিয় অ্যাম্বাসাডর। ফুটবল এবং অ্যাম্বাসাডরের জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও তা ভারতীয় হয়ে গেছে। ১৯৫৭-২০১৮- এই ৫৭ বছরে ৯০০,০০০ অ্যাম্বাসাডর গাড়ি তৈরি হয়েছে। এই যে মানুষের কৌতূহল, তিনি কি আসছেন; এটি প্রমাণ করে যতই বি.এম.ডবলু, জাগুয়ার, পোর্শে, হুন্ডাইয়ের নানা মডেল বাজারে চলুক না কেন, এখনও আমাদের মনজুড়ে আছে অ্যাম্বাসাডর, কিং অফ ইন্ডিয়ান রোডস। 

শংকর-এর 'স্বদেশ ভার্সেস বিদেশ' গল্পে অ্যাম্বাসাডরের কথা গৌরবের সঙ্গে বলা হয়েছে। মিছরিদা হাওড়ার বাসিন্দা। তিনি মনে করতেন, যমরাজ যখন কাউকে কঠিনতম শাস্তি দেবেন, তখন তাঁকে হাওড়াতে পাঠিয়ে দেন। তিনি হাওড়ায় জন্মান এবং সারা জীবন যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে কাটান। হাওড়া হলো হেল। 

সেই মিছরিদা আমেরিকাতে গেলেন এবং পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করলেন। শংকর আমেরিকাতে গিয়েছেন, মিছরিদার বাড়ি যেতে উনি ভ্রাতৃপ্রতিম শংকরকে নিয়ে গেছেন অফিসের বস মঙ্কেলো সাহেবের বাড়ি। শংকরকে দেখেই সাহেব নিজের দেশের নানা গুণগান করছেন। প্রযুক্তিতে ভারতের চেয়ে কত এগিয়ে তাঁর দেশ, সেই কথা বলতে গিয়ে তিনি শংকরের কাছে জানতে চাইছেন যে শংকর কি বুলক কার্টে অফিসে যান? আর যায় কোথা! মিছরিদা, যিনি সাহেবের কথা চুপ করে শুনছিলেন তিনি ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন, হোয়াট ডু ইউ মিন। হি গোজ টু অফিস ইন এ কার। বোথ অফ দেম মেড ইন উত্তরপাড়া, ডিসট্রিক্ট হুগলি, ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া। সাহেব তো মিছরিদার কথা শুনে থ। বলে কী? গাড়ি চেপে অফিসে যায়! কী নাম সে গাড়ির। মিছরিদার বুক গর্বে ফুলে উঠল– অ্যাম্বাসাডর সেই গাড়ি। 

আরও পড়ুন: বিধানচন্দ্র রায় থেকে জ্যোতি বসু, এই মডেলের ফিয়াট পছন্দ ছিল সকলের

অ্যাম্বাসাডর নিয়ে রসিকতারও শেষ নেই। বিড়লা পরিবারের একজন স্বর্গে গেছেন। সেখানে নারায়ণের সঙ্গে দেখা। নারায়ণকে তিনি প্রণাম করতেই নারায়ণ তাঁকে বললেন, তোমাদের আর কী বলব? তোমরা যা সেবামূলক কাজ করো, মন্দির তৈরি করো, আগে তোমাদের নাম প্রচার করো, পরে ভগবানের নাম। নারায়ণ চলে যাচ্ছেন দেখে তিনি বললেন, প্রভু আমাদের একটি সৃষ্টি আছে, যেখানে আগে ভগবানের নাম আছে। উৎসুকভাবে নারায়ণ বললেন, বৎস সেটি কী? যিনি স্বর্গে গেছেন, তিনি বললেন, অ্যাম্বাসাডর গাড়ি। কেনার ছ’মাসের মধ্যে দরজা দিয়ে এত শব্দ হয় যে, গাড়ির মালিক বলে, হায় রাম! বিড়লাদের কী গাড়ি কিনলাম!

প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সবাই সাদা অ্যাম্বাসাডর চড়তেন। জ্যোতিবাবু চড়তেন উড়িষ্যার নম্বর লাগানো দুধ-সাদা বুলেটপ্রুফ অ্যাম্বাসাডর। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অ্যাম্বাসাডর চড়তেন। ডিসি হেডকোয়াটার্সের ছিল অ্যাম্বাসাডর স্টেশন ওয়াগন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সাদা অ্যাম্বাসাডর চড়তেন (ডবলুএমসি ৫৩৫৩)। উত্তমকুমার সাদা অ্যাম্বাসাডর চেপে প্রতিদিন সকালে ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি থেকে গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে মাকে প্রণাম করতে আসতেন। বসন্ত চৌধুরী তাঁর অ্যাম্বাসাডর নিজেই চালাতেন। 

Ambassador

মার্ক ওয়ান অ্যাম্বাসাডর বাজারে আসে ১৯৫৭ সালে, স্বাধীনতার দশ বছরের মধ্যে। অসাধারণ শক্ত-পোক্ত এই গাড়িটি চলে ১৯৬২ সাল অবধি। এই গাড়ির ড্যাশবোর্ডে ঘড়ি থাকত। ১৯৬২-'৭৫ মার্ক টু অ্যাম্বাসাডরের দখলে। মার্ক টু-তে গ্রিলের পরিবর্তন হয়। সাইড লাইট নতুন রকমের দেওয়া হয়। মার্ক থ্রি ১৯৭৫-'৭৯ আর মার্ক ফোর ১৯৭৯-'৮০। বাজারে এসেছে অ্যাম্বাসাডর নোভা, রিজেন্ট, ১৮০০ আইএমজেড। এল অ্যাম্বাসাডার গ্র্যান্ড আর এভিগো। সাতের দশকে কলকাতায় পর পর বেশ কয়েকটি ডাকাতি হয়। ৫৭ বছরে সাদা ছাড়া কত রং বাজারে এসেছে– কালো, থান্ডার গ্রে, সিলভার গ্রে, চেরি। জটায়ুও অ্যাম্বাসাডর কিনে রজনী সেন রোডে ফেলু মিত্তিরের বাড়ি আসতেন। 

চব্বিশ বছরের সৌরদীপ মুখোপাধ্যায়ের ধ্যান-জ্ঞান অ্যাম্বাসাডর। কলকাতাতে বেশ কিছু হলুদ আর নীল সাদা অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি চলছে। কিছু পুরনো গাড়ি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চলছে কিন্তু বাড়ির গাড়ি হিসেবে অ্যাম্বাসাডর ব্যবহার হয় না। এ মা! তোমরা এখনও অ্যাম্বাসাডর চড়ছ!– কোনও বাড়িতে অ্যাম্বাসাডর ব্যবহার করা হলে মালিককে একথা প্রায়ই শুনতে হয়। 

Ambassador

সৌরদীপের তিনটি অ্যাম্বাসাডর আছে। একটি ১৯৫৮ সালের মার্ক ওয়ান। এই গাড়িটির মালিক ছিলেন একজন কংগ্রেসের নেতা। মল্লিকবাজার থেকে সৌরদীপ এটি কেনেন। স্টিয়ারিং গিয়ারকে ফ্লোর শিফট গিয়ার, চলতি ভাষায় লাট্টু গিয়ারে পরিবর্তন করা হয়েছিল। গাড়িটি উত্তর কলকাতায় দীর্ঘদিন জলে ডুবে ছিল। অবহেলা, অনাদরের ছাপ সারা দেহে স্পষ্ট। সৌরদীপের হাতের ছোঁয়ায় এখন নবযৌবন পেয়েছে রাস্তার রাজা। 

সৌরদীপের দ্বিতীয় গাড়িটি ১৯৭১ সালের মার্ক টু। নয় নয় করে তাঁর বয়সও পঞ্চাশ পেরিয়েছে। টালা পার্কের কাছে গাড়িটি রাস্তায় পড়েছিল। হেডলাইটদুটো ভাঙা, রং জ্বলে গেছে- এই অবস্থায় মুখোপাধ্যায় সাহেবের কাছে তিনি এসে পৌঁছন। তিল তিল করে তাঁকে তৈরি করা হয়েছে। এই গাড়ি চড়ে, চালিয়ে বড় আরাম। পিছনের সিটে বসে অ্যাম্বাসাডরের মতো আরাম আর কোনও গাড়িতে চড়ে পাওয়া যায় না। 

সৌরদীপের তৃতীয় গাড়িটি তার বাড়ির গাড়ি, ১৯৮৭ সালে কেনা অ্যাম্বাসাডর মার্ক ফোর। অ্যাম্বাসাডর অসাধারণ ব্রোসিওর বানাত, যেটি গাড়ির সঙ্গে দেওয়া হতো। থাকত কালার কার্ড। কী রঙের গাড়ি কেনা হবে, সেটি মালিক বলে দিতেন। আর এক সময় এক বছরের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতো গাড়িটি হাতে পেতে। 

সৌরদীপ কলকাতার ছেলে। ওর বিশ্বাস, কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে অ্যাম্বাসাডরের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রয়েছে। এক সময় মুম্বইয়ের স্টেশনের সামনে দাঁড়ালে সার সার ফিয়াট ট্যাক্সি দেখা যেত আর হাওড়া স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত হলুদ অ্যাম্বাসাডর। ড. বিধানচন্দ্র রায় কলকাতার বেকার ছেলেদের বলতেন, চাকরি দিতে পারব না, গাড়ি চালানো শেখো, আমি বিড়লাদের বলে গাড়ি আনিয়ে দিচ্ছি। স্বাধীনতার পরও কলকাতায় শেভ্রোলে, ডজ ট্যাক্সি চলত। ডাক্তার রায় বেবি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডার্ড টেন আর অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি চালু করেন। 

সৌরদীপের অ্যাম্বাসাডর-প্রেম এমনই যে, ২০২২ সালে ও একটি অ্যাম্বাসাডরের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার বের করে এবং তা বিলোয় গাড়িপ্রেমীদের মধ্যে। অ্যাম্বাসাডর আমাদের বড় আপনার জিনিস, ওকে কি ছেড়ে থাকতে পারি– সৌরদীপের ছোঁয়ায় বেঁচে আছে তিনটে অযান্ত্রিক, যেগুলো হয়তো এতদিনে হারিয়েই যেত।         

More Articles

;