দাঁতের চিকিৎসা করবে রোবট! আশ্চর্য আবিষ্কার ভারতীয় বিজ্ঞানীদের

দাঁতের একটি বহুল-ব্যবহৃত চিকিৎসা পদ্ধতি হলো রুট ক্যানাল ট্রিটমেন্ট (Root canal treatment)। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে দাঁতের গভীরে ক্ষয় শুরু হয়। পাশাপাশি দাঁতের ভেতরকার নার্ভ এবং পাল্পে জ্বালা করে। সেই সমস্যার উপশমের জন্যই রুট ক্যানাল করা হয়।

 

কিন্তু অগুনতি ক্ষেত্রে রুট ক্যানালের চিকিৎসা শেষ পর্যন্ত সফল হয় না। কারণ দাঁতের গভীরে রুট ক্যানাল করার পরেও সংক্রামক ব্যাকটেরিয়া থেকে যায়, এবং তাদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফলে আবারও দাঁতের ক্ষত বাড়তে থাকে, সঙ্গে বাড়তে থাকে দাঁতের ব্যথা।

 

কিন্তু সমস্ত সমস্যার কিছু না কিছু সমাধান থাকে। এবার সেই সমাধানের জন্য ব্যবহার করা হল ন্যানোটেকনোলজি (Nanotechnology) । ন্যানো-মিটার (Nano-meter) আকৃতির রোবট এবার সাহায্য করবে দাঁতে তৈরি হওয়া ক্ষতর গভীরে প্রবেশ করে, জীবাণুমুক্ত করবে সেই অংশকে। ন্যানো-মিটার যে কতটা ক্ষুদ্র, তাকে সহজ ভাষায় বোঝাতে গেলে বলতে হয়, প্রতি সেকেন্ডে আমাদের নখ ঠিক যতটা বাড়ে, তাকে বলে এক ন্যানো-মিটার।

 

আরও পড়ুন: চোখের রোগের চিকিৎসায় আমূল পরিবর্তন! কোন অসম্ভব সম্ভব হচ্ছে বিজ্ঞানের দৌলতে?

 

প্যাঁচালো (Helical) দেখতে এই ন্যানো-রোবটগুলিকে (Nano-robot) তৈরি করেছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স, ব্যাঙ্গালোর (আই.আই.এস.সি) এবং আই.আই.এস.সি-অবলম্বী (IISC-Incubated) নতুন সংস্থা থেরানটিলাসের (Theranautilus) গবেষকরা। আই.আই.এস.সির অধ্যাপক ড: অম্বরীশ ঘোষের তত্ত্বাবধানে করা এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অ্যাডভান্সড হেলথ্ কেয়ার মেটেরিয়াল (Advance healthcare Material) নামের এক বৈজ্ঞানিক জার্নালে।

 

গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই রোবটগুলি দৈর্ঘ্যে ৩ মাইক্রন (Micron) (এক মাইক্রন মানে এক লক্ষ মিটারের এক ভাগ) এবং প্রস্থে ২০০ ন্যানো-মিটার (Nanometer) (এক ন্যানো-মিটার মানে এক বিলিয়ন মিটারের একভাগ) ।

 

প্রচলিত পদ্ধতিতে রুট ক্যানালের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট। এই ধরনের রাসায়নিক ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকের মতো আণুবীক্ষণিক জীব বা মাইক্রোবসকে নষ্ট করে। প্রচলিত এই চিকিৎসা-পদ্ধতিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্টের নিষ্ক্রিয় ব্যপন পদ্ধতি বা প্যাসিভ ডিফিউশনের (passive diffusion) উপর নির্ভর করা হয়।

 

প্যাসিভ ডিফিউশন পদ্ধতিতে দাঁতের ক্ষততে অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট প্রয়োগ করলে, তাদের অণুগুলি ধীরে ধীরে দাঁতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু মুশকিল হল, বিভিন্ন কারণে এই অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এজেন্টগুলোর কাজ বিফলে যায়। ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলোও সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না। পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতিতে রুট ক্যানাল চিকিৎসা করার সময়, কিছু ব্যাক্টিরিয়া রয়ে যায়, যা আগেই এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ক্ষতর মধ্যে থেকে যাওয়া, সহজে না বেরনো এই ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে অন্যতম হল এন্টেরোকক্কাস ফিকালিস (Enterococcus faecalis)।

 

এন্টেরোকক্কাস ফিকালিস ছাড়াও রুট ক্যানালের জন্য দায়ী বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ব্যাকটেরিয়াগুলো হল পেপ্টোস্ট্রেপ্টোকক্কাস (Peptostreptococcus), পরফাইরোমোনাস (Porphyromonus), এন্টেরোকক্কাস (Enterococcus), স্ট্যাফাইলোকক্কাস (Staphylococcus), ল্যাক্টোব্যাসিলাস (Lactobacillus), অ্যাকটিনোমাইসেটিস (Actinomycetis), ক্যান্ডিডা (Candida), ব্যাসিলাস (Bacillus), ই.কোলাই (E. coli) প্রভৃতি।

 

কিন্তু কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এই রোবটগুলিকে? তার জন্য ব্যবহার করা হবে চৌম্বকীয় শক্তি, যা নিয়ন্ত্রণ করবে এই রোবটগুলির গতিবিধি। আবার কাজ শেষে, দাঁতের ক্ষতর গভীর থেকে এই ন্যানো-রোবটগুলিকে বের করেও আনা যাবে।

প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের ফার্স্ট অথর দেবায়ন দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন, "ন্যানো-রোবটগুলিকে তৈরি করা হয়েছে সিলিকা দিয়ে এবং যাতে এদের চৌম্বকীয় ধর্ম থাকে, তাই সিলিকার বাইরে লোহার আবরণ দেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে চৌম্বকীয় শক্তি প্রয়োগ করলেই, ন্যানো-রোবটগুলি সেই শক্তির প্রতি সাড়া দেয়। প্যাঁচালো-আকৃতির ন্যানো-রোবটগুলিকে সক্রিয় করার জন্যে বাইরে থেকে রোটেটিং ম্যাগনেটিক ফিল্ড প্রয়োগ করা হয়। যাতে প্যাঁচালো-আকৃতির এই রোবটগুলি ছিপি খোলার প্যাঁচালো যন্ত্র অর্থাৎ কর্কস্ক্রু-এর (Corkscrew) মত ঘুরতে পারে।"

 

দেবায়ন দাশগুপ্ত আরও জানাচ্ছেন, "ম্যাগনেটিক ফিল্ড বা চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ট্রাই-অ্যাক্সিয়াল হেল্মহোলৎজ় কয়েল (Triaxial Helmholtz Coil) নামের একটি যন্ত্র।" এই যন্ত্র ব্যবহারের ফলে ন্যানো-রোবটগুলির সমগ্র অংশে সমানভাবে চৌম্বকীয় ক্ষেত্র (Magnetic Field) তৈরি হয়। আর সেই শক্তি প্রয়োগ করেই দাঁতের ক্ষতর গভীরে প্রবেশ করানো হয় রোবটগুলিকে।

 

প্রচলিত পদ্ধতিতে রুট ক্যানালের সময়, দাঁতের ক্ষত পরিষ্কার করার জন্য কিছু বিশেষ তরল ব্যবহার করা হয়। এর আগেও বৈজ্ঞানিকরা আলট্রাসাউন্ড এবং লেজার দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার এই তরলে শকওয়েভ সৃষ্টি করে রুট ক্যানালের চিকিৎসা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও সেই তরলগুলি ৮০০ মাইক্রোমিটারের বেশি গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। অন্যদিকে সাম্প্রতিক এই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ন্যানো-রোবটগুলি দাঁতের ২০০০ মাইক্রোমিটার গভীর অবধি প্রবেশ করে ক্ষতর ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে।

 

মূল গবেষণায় ব্যবহৃত যন্ত্রাংশগুলি আসলে বেশ ভারী এবং রাখার জন্য অনেকটা জায়গার প্রয়োজন হয়। রুট ক্যানালের চিকিৎসা করার সময় মুখের ভেতরে যন্ত্রাংশগুলিকে প্রবেশ করানোর জন্য প্রয়োজন ছিল এদের আয়তনকে ছোট করা। নতুন এই সংস্থাটি সফলভাবে সেই কাজও করেছে।

 

সিলিকা ও লোহার অণু দিয়ে তৈরি এই ন্যানো-রোবটগুলি মানুষের শরীরের জন্য একেবারেই নিরাপদ। দেবায়ন দাশগুপ্ত জানাচ্ছেন, চৌম্বকশক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ন্যানোপার্টিকেল এর আগেও প্রফেসর অম্বরীশ ঘোষের তত্ত্বাবধানে বহু গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে। জীবন কোশ ও রক্ত কোশের মধ্য দিয়েও এরা চলাচল করতে পারে।

 

শুধু তাই -ই নয়, ক্যানসার কোশের গায়েও এরা শক্তপোক্তভাবে আটকে গিয়ে তাদের নষ্ট করতে পারে। শরীরে ক্যানসারের উপস্থিতি বুঝতে এর আগেও এই ধরনের ন্যানো-রোবট ব্যবহার করেছিলেন তাঁরা। এই ন্যানো-রোবটগুলি সেন্সর  হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল সেক্ষেত্রে।

 

গবেষকরা জানাচ্ছেন, খুব শীঘ্রই এই প্রযুক্তি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার স্বার্থে।

 

More Articles

;