ভোট দিতে পারলেন না মিরজাফরের বংশধরেরা
Nawab family vote denied: সব নথি জমা দেওয়ার পরও মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের দেড়শোরও বেশি সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। প্রশাসনিক গাফিলতি, না অন্য কোনো কারণ? ‘ছোটে নবাব’-সহ এত মানুষ ভোট দিতে পারলেন না কেন?
মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে নবাবি ঐতিহ্যের এক দীর্ঘ ছায়া আজও স্পষ্ট। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মীর জাফরের বংশধররা। সময়ের স্রোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা জমিদারি সবই হারিয়েছে এই পরিবার, কিন্তু পরিচয় হিসেবে থেকে গিয়েছে তাদের অতীত। সেই পরিচয়ই আজ প্রশ্নের মুখে।
প্রথম দফার ভোটের দিন মুর্শিদাবাদে বুথমুখী মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেই ভিড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জা-কে। ভোট দিতে পারেননি তিনি। মিরজাফরের বংশের ১৬তম প্রজন্মের সদস্য তিনি, পাশাপাশি স্থানীয় পুরসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
শুধু তিনি নন, তাঁর ছেলে সৈয়দ মুহাম্মদ ফাহিম আলি মির্জা এবং তাঁদের পরিবারের আরও বহু সদস্য একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। দেড়শোরও বেশি সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। যে পরিবার একসময় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, সেই পরিবারের সদস্যদেরই আজ নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হচ্ছে, এই প্রশ্নটাই বড় হয়ে উঠছে।
মুর্শিদাবাদের লালবাগ অঞ্চলে অবস্থিত কেল্লা নিজামত—এই রাজপ্রাসাদ এবং তার আশপাশেই বসবাস করেন নবাব বংশের বহু সদস্য। একসময় এই এলাকা ছিল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। আজ সেখানে ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রাসাদ, মসজিদ, ইমামবাড়া আর সেইসব স্থাপত্যের মধ্যে বসবাস করছে এক বিস্তৃত পরিবার।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Voter List Revision in Bengal: কারগিল যুদ্ধে লড়া এক প্রাক্তন সেনাকর্মীর নামই যদি ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এসআইআর প্রক্রিয়ায় কি সত্যিই নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে, নাকি নির্দিষ্ট এলাকাকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে?
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় তাঁদের অনেককেই শুনানির জন্য ডাকা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, তারা সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়েছিলেন। পরিচয়পত্র, বাসস্থানের প্রমাণ, পূর্ববর্তী ভোটার তালিকার তথ্য সবই জমা দেওয়া হয়েছিল নিয়ম মেনে। তবুও শেষ পর্যন্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ে যায় অনেকে।
এই অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে এসেছে নাগরিকত্ব নিয়ে। এখানে বলতেই হয়, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় নানা প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সময় বহু অভিজাত মুসলিম পরিবার পাকিস্তানে পাড়ি জমালেও, এই পরিবার ভারতের মাটিকেই নিজের ঠিকানা হিসেবে বেছে নেয়।
দেশভাগের সেই উত্তাল সময়ের কথা আজও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। ভারত বিভাজনের সময় মুর্শিদাবাদ প্রথমে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। পরে পরিস্থিতি বদলায়, এবং শেষ পর্যন্ত এই জেলা ভারতের অংশ হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, সেই সময় নবাব পরিবারের হস্তক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল এই সিদ্ধান্তে। তাহলে এত বছর পর কেন আবার সেই পরিবারকেই নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে?
এই পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরেকটি আন্তর্জাতিক অধ্যায়ও। ইস্কান্দার আলি মির্জা—যিনি পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনিও এই বংশের সদস্য। তাঁর জন্মও হয়েছিল লালবাগের এই কেল্লা নিজামতেই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Matua citizenship issue: নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে যাচ্ছেন মতুয়ারা? ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে কী হবে তাঁদের ভবিষ্যৎ? নাগরিকত্ব, কাজ, অধিকার—সবই কি এখন অনিশ্চিত? এসআইআর প্রক্রিয়া শুধু মুসলিম নয়, প্রান্তিক হিন্দুদেরও টার্গেট করছে? তাহলে কারা সত্যিই নিরাপদ?
বর্তমানে এই বংশের সদস্য সংখ্যা প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি বলে জানা যায়। কেউ মুর্শিদাবাদেই থাকেন, কেউ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন, আবার কেউ বিদেশে বসবাস করছেন। তবুও লালবাগের এই অঞ্চলই তাঁদের আদি বাসস্থান হিসেবে রয়ে গিয়েছে।
স্থানীয় একটি বিদ্যালয়—লালবাগের নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়। এটিই এই পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের ভোটকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। দু'টি বুথে প্রায় ৮৫০ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫৫০ জনই এই পরিবারের সদস্য। সেই সংখ্যার মধ্যে দেড়শো জনের নাম বাদ পড়া নিছক একটি ছোটখাটো ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন অনেকেই।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়েও। ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় নামের বানান, পরিচয়ের সামান্য অসঙ্গতি—এসব কারণে অনেক সময় নাম বাদ পড়ে যায়। এই পরিবারের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারও নামের আগে ‘সৈয়দ’ শব্দটি বাদ পড়েছিল, কারও নামের মধ্যে অন্য শব্দের তারতম্য ছিল। পরে সংশোধন করা হলেও, শেষ তালিকায় তা প্রতিফলিত হয়নি।
এখানেই সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ, একটি পরিবারের বহু সদস্য একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক ত্রুটির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই পরিবারের পূর্বপুরুষরা আরব থেকে ভারতে এসেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। তাঁরা নিজেদের ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন-এর বংশধর বলে দাবি করেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থেও এই বংশপরিচয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে মসনদ অফ মুর্শিদাবাদ এবং হাকিকত মুসলমান-ই-বেঙ্গালাহ-এর মতো গ্রন্থের নাম উঠে আসে, যেখানে নবাব বংশের ইতিহাস ও বংশতালিকা বিশদভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
তবে ইতিহাসের এই দীর্ঘ তালিকা বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাছে কতটা প্রাসঙ্গিক, সেই প্রশ্নও উঠছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকত্ব নির্ধারণ হয় নির্দিষ্ট নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কিন্তু যখন একটি পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে একই স্থানে বসবাস করছে, তখন তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় বিতর্ক তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনায় স্পষ্ট প্যাটার্ন দেখা গিয়েছে—সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব বর্ধমানে, যেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বেশি। নির্বাচন কমিশন বলছে এটি মৃত, ডুপ্লিকেট ও অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হয়েছে।
যে পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দেশের মাটিতে বাস করছে, যাদের ইতিহাস এই ভূখণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাঁদের নাম কেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এখন সবচেয়ে জরুরি।






