বরফশূন্য জানুয়ারি: হিমালয়ের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
Himalayan Climate Change: হিমালয় এখন বরফশূন্য, বিগত অক্টোবরের কয়েকটা দিন ছাড়া গোটা পশ্চিম ও মধ্য হিমালয় তুষারপাতের মুখ দেখেনি।
মানেভঞ্জনের অজয় গুরুং বলে উঠল দাদা এখন আর আগের মতো ঠান্ডা পড়েনা, অক্টোবর, নভেম্বরের শীতেও বরফের দেখা নেই!
কী যে হলো- সব কেমন পালটে গেলো চোখের সামনে
বলে চুপ করে সামনে খাড়া নেমে যাওয়া উপত্যকার দিকে তাকিয়ে রইল সে। আমিও নীরবে তাকিয়ে রইলাম সেই দিকে। আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগের সে স্মৃতি বর্তমানে বৃহত্তর বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Global Carbon Emissions: কার্বন মেজরসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ৫০ শতাংশের জন্য দায়ী মাত্র ৩২টি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক সংস্থা।
হিমালয় এখন বরফশূন্য, বিগত অক্টোবরের কয়েকটা দিন ছাড়া গোটা পশ্চিম ও মধ্য হিমালয় তুষারপাতের মুখ দেখেনি। অদ্ভুত ব্যাপার! তাইনা? আমরা বইতে পড়েছি তাপমাত্রা ০° সেন্টিগ্রেড হলেই জল বরফ হয়ে যায়, আর উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলো সারাবছর বরফ ঢাকা থাকে কারণ সেগুলির উচ্চতা বরফ সীমার উপরে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, কেউ আমাদের কখনও এর বাইরের সত্যিটা বলেনি, বা বলা ভালো আগাম ভয় পাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে ইচ্ছে করেই জানায়নি।
হিমালয়ের তিনটে ভাগ উচ্চ হিমালয়, মধ্য হিমালয় এবং পাদদেশীয় হিমালয়। বইতে যা পড়েছি সেটা বেশ কিছুটা সত্যি। কারণ উচ্চ হিমালয়, যা ৫০০০-৬০০০ মিটারের বেশি উচ্চতা সম্পন্ন সেখানে একধরনের দীর্ঘস্থায়ী বরফ দেখা যায়, যা কিছুটা পার্মাফ্রস্টের মতো অর্থাৎ বিশেষ কোনো সমস্যা না দেখা দিলে তাদের গলতে দেখা যায় না। মধ্য হিমালয়ের বরফ ক্ষণস্থায়ী, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন চক্রের উপর নির্ভরশীল। আর পাদদেশীয় অংশে বরফ দেখা যায় না কিন্তু সে সকলকে ধারণ করে নিজের বুকে।
এখানে আলোচনা করব মধ্যবর্তী হিমালয়কে নিয়ে, যে মাঝখানে থেকে দুই হিমালয়ের কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। মধ্যবর্তী হিমালয় সাধারণত আমাদের প্রত্যেকের দৃষ্টিগোচর হয় কারণ তাকে ঘিরেই যত পর্যটকদের ভিড়। কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড থেকে দার্জিলিং, সন্দাকফু পর্যন্ত এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল আমাদের প্রত্যেকের প্রিয় ঘোরার জায়গা। কিন্তু আমাদের ভালবাসাহীন প্রকৃতিপ্রেম হয়ে উঠেছে সর্বনাশের কারণ। বিগত দশকের তুলনায় বর্তমানে পর্যটকের পরিমাণ বেড়েছে বছরপ্রতি ১৫ মিলিয়ন থেকে প্রায় ২০০ মিলিয়ন! এটা জিডিপির উন্নতির জন্য ভালো কিন্তু হিমালয়ের জন্য নয় কারণ এই সমস্যার সঙ্গে প্রতি বছর কঠিন বজ্য পদার্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ২০২৫ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, হিমালয়ে প্রাপ্ত বজ্য পদার্থের মধ্যে ৯৩ শতাংশ প্লাস্টিক এবং তার মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নয়। এছাড়াও আরও একটি মজার বিষয় হলো একজন পর্যটক প্রায় পাঁচ গুণ বেশি জল ব্যবহার করেন স্থানীয় মানুষের থেকে, যা হিমালয় অঞ্চলের স্বাভাবিক জলচক্রের ব্যাঘাত ঘটিয়ে জলের অভাব ঘটাচ্ছে এবং ব্যাপক খরার সৃষ্টি করেছে কারণ অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাকৃতিক ঝর্ণা শুকিয়ে যাচ্ছে। হিমালয়ের শুষ্ক অঞ্চলগুলো ব্যাপক ভূমিধস প্রবণ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের হিসেব অনুযায়ী প্রায় ৪০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে আবহাওয়াজনিত বিভিন্ন ঘটনার ফলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Pollution: ২০২৫-এর শেষ দিক এবং ২০২৬-এর শুরুর দিকের পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন মনিটরিং স্টেশনে, AQI প্রায়শই ৪০০ ছুঁইছুঁই, ক্যাটাগরিক্যালি দেখলে যা 'বিপজ্জনক' বা 'খুবই খারাপ' (Very Poor)।
এ তো গেল সরাসরি প্রভাবের কথা। এখন যদি আমরা দেখতে চাই পরোক্ষ প্রভাব, তাহলে ঐ অজয় গুরুং-এর কথায় আসতে হয়,
সব বদলে গেল…
পৃথিবীর অক্ষের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ুরও পরিবর্তন হচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬-এর ক্ষুদ্র জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে দেখা যাবে যে, এই বছর গুলো প্রচণ্ড ভাবে ENSO চক্রের দ্বারা প্রভাবিত (ENSO বা El-nino Southern Oscillation হলো, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ ও শীতল স্রোতের অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য। যখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ স্রোত আমেরিকার উপকূলে অবস্থান করে তখন তাকে বলে এলনিনো আর যখন শীতল স্রোত ইন্দোনেশিয়া উপকূলের দিকে অবস্থান করে, তখন তাকে বলে লা-নিনা)। যার দরুণ মৌসুমী বায়ুর আগমন, প্রস্থানের সময় এবং বৃষ্টির বণ্টনের সমস্যা দেখা দিয়েছে বার বার। ভারতীয় উপমহাদেশে এই বছরগুলিতেই ব্যাপক তাপপ্রবাহ এবং শৈত্যপ্রবাহ পরিলক্ষিত হয়েছে। অন্যান্য দেশের মতোই ভারতেরও গড় তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১° সেলসিয়াস। শুনতে বা দেখতে অনেক কম হলেও এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে হিমালয়ের বরফে।
হিমালয়ের বরফ সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর করে একটা ভিনদেশী জলপূর্ণ বাতাসের উপর, যার নাম পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। সুদূর পশ্চিমের ভূমধ্যসাগর থেকে এই বাতাস প্রচুর জল নিয়ে ভারতে এসে পৌঁছয় এবং উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তুষারপাত ঘটায়। এখানেই ঘটেছে আসল সমস্যাটা। ২০২৫ সালের কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, আগের মতো পশ্চিম দিক থেকে এই বাতাস জল নিয়ে আসছে না। অতিরিক্ত গরমে তা শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং নিজের গতিপথ পরিবর্তন করে উত্তর-মধ্য এশিয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। বরং তার জায়গা নিচ্ছে মধ্য এশিয়ার কনকনে ঠাণ্ডা শীতল খটখটে শুকনো বায়ু, যার ফলে প্রবল শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে ভারতের উত্তর-পশ্চিম অংশে।
গতবছরের ন্যায় এই বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি, ঠিক একই ভাবে শৈত্যপ্রবাহ দেখা গিয়েছে; কিন্তু ঠান্ডা হলেও এক বিন্দুও জল না থাকায় তাতে বরফ জমেনি বা বরফ পড়েওনি। এখানেই শেষ নয়, আরও আছে, গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে এবং এখন জানুয়ারিতে কয়েকটা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা এসেছে পরপর কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, হিমালয়ের ভূপৃষ্ঠভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য সেই জল তুষার না হয়ে পরিণত হচ্ছে বৃষ্টিতে এবং গড়িয়ে নিচে চলে যাচ্ছে। কোনো লাভ হচ্ছেনা।
বিস্তীর্ণ এলাকা বরফ বিহীন অবস্থায় থাকায় খরার সম্মুখীন হয়েছে। যে জানুয়ারি মাস তুষারপাতের প্রকৃষ্ট সময় তখনই এক ফোঁটাও বরফের দেখা নেই। তাহলে আগামী এপ্রিল মাসে কী হবে! এই বরফশূন্যতা ডেকে আনছে একটা ভয়ানক ভবিষ্যৎ। নিম্ন অঞ্চলে বরফ না থাকলে বা নতুন তুষারপাত না ঘটলে সামনের গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপমাত্রা সরাসরি গিয়ে পড়বে দীর্ঘস্থায়ী বরফের চাদরের উপরে এবং তারা গলতে শুরু করবে। সরাসরি হিমবাহগুলো গলতে শুরু করবে এবং GLOF বা Glacial Outburst-এর সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। নদীগুলো শুকিয়ে যাবে অনেকাংশে, জলের জোগান কমবে এবং সর্বোপরি সারাবছরের জলচক্রের ব্যাপক পরিবর্তন হবে।






