জলবায়ু সংকটের কেন্দ্রে কর্পোরেট দূষণ! কার্বন মেজরসের রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
Global Carbon Emissions: কার্বন মেজরসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ৫০ শতাংশের জন্য দায়ী মাত্র ৩২টি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক সংস্থা।
জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে চরম সংকটের মুখে পৃথিবী, কিন্তু এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কারা? ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী নিঃসৃত মোট কার্বনের অর্ধেক বা ৫০ শতাংশের জন্যই দায়ী মাত্র ৩২টি কোম্পানি। ‘কার্বন মেজরস’ রিপোর্টে এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে, দূষণের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ আরও কম সংখ্যক শক্তিশালী ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে।
কার্বন মেজরসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের প্রায় ৫০ শতাংশের জন্য দায়ী মাত্র ৩২টি জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদক সংস্থা। গত বছর এই সংখ্যাটি ছিল ৩৬। অর্থাৎ, দূষণের দায় ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে আরও কম সংখ্যক শক্তিশালী সংস্থার হাতে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল, এই তালিকার শীর্ষে থাকা সংস্থাগুলির অধিকাংশই রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত। শীর্ষ ২০টি কার্বন দূষণকারীর মধ্যে ১৭টিই সরকারি মালিকানাধীন তেল, গ্যাস ও কয়লা উৎপাদক সংস্থা। এই সংস্থাগুলি যে দেশগুলির অধীনে, তারাই মূলত আন্তর্জাতিক মঞ্চে জীবাশ্ম জ্বালানি পরিত্যাগের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এসেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Day Zero Drought: গবেষকদের মতে, Day Zero Drought (DZD) এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে বহু বছরের খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নদী-জলাধারের জল কমে যাওয়া এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা একসঙ্গে ধাক্কা দেয়। ফলে জলাধার কার্যত শূন্য হয়ে যায়।
ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত Cop30 জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে বন্ধ করার যে প্রস্তাব উঠেছিল, তার বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব, রাশিয়া, চিন, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও ভারতসহ একাধিক দেশ। অথচ বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ সেই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
কার্বন মেজরসের সেই প্রতিবেদন বলছে, সৌদি আরবের তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো একাই ১.৭ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করেছে, যার বড় অংশই এসেছে রপ্তানিকৃত তেল থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, যদি সৌদি আরামকো একটি দেশ হতো, তাহলে এটি হতো বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম কার্বন দূষণকারী দেশ, যার অবস্থান হতো রাশিয়ার ঠিক পরেই। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন সংস্থাগুলির মধ্যে শীর্ষে থাকা এক্সনমোবিলের নির্গমন ৬১০ মিলিয়ন টন CO₂। এই সংস্থা কোনো দেশ হলে এটি দক্ষিণ কোরিয়াকেও ছাড়িয়ে বিশ্বের নবম বৃহত্তম দূষণকারী দেশ হতো।
কোভিড অতিমারির সময় সাময়িকভাবে নির্গমন কমলেও, তার পর থেকে আবারও প্রতি বছর রেকর্ড পরিমাণ কার্বন নির্গমন হচ্ছে। ২০২৬ সালের প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নির্গমন ৪৫ শতাংশ কমানো দরকার, যাতে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা যায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই লক্ষ্য এখন কার্যত অসম্ভব। তবে তাঁরা সতর্ক করে বলছেন, সীমা অতিক্রমের মাত্রা যত বাড়বে, তার প্রভাব তত মারাত্মক হবে। প্রতিটি অতিরিক্ত ডিগ্রি উষ্ণতা মানে আরও বেশি প্রাণহানি, খাদ্য সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Pollution: ২০২৫-এর শেষ দিক এবং ২০২৬-এর শুরুর দিকের পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন মনিটরিং স্টেশনে, AQI প্রায়শই ৪০০ ছুঁইছুঁই, ক্যাটাগরিক্যালি দেখলে যা 'বিপজ্জনক' বা 'খুবই খারাপ' (Very Poor)।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে— তথ্য এখন অস্ত্র। কার্বন মেজরস ডেটাবেস ব্যবহার করেই গবেষকরা দেখাতে পেরেছেন, বিশ্বের বড় জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থাগুলির নির্গমন সরাসরি বহু মারাত্মক তাপপ্রবাহের জন্য দায়ী। এই তথ্যের ভিত্তিতেই জার্মানির ঐতিহাসিক মামলা Lliuya v RWE, কিংবা নিউ ইয়র্ক ও ভারমন্টের ‘ক্লাইমেট সুপারফান্ড’ আইনে বড় সংস্থাগুলিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রাক্তন জলবায়ু প্রধান ক্রিস্টিয়ানা ফিগুয়েরেস বলেন,
কার্বন নির্গমনকারীরা ইতিহাসের ভুল দিকে রয়েছে। কিন্তু তথ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণই সেই শক্তি, যা তাদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে পারে।
বিশ্ব যখন জলবায়ু বিপর্যয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন ‘কার্বন মেজরস’-এর প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সমস্যার মূল কোথায়। প্রশ্ন এখন একটাই, এই সংস্থাগুলোর কি আদৌ লাগাম টানা যাবে? নাকি মুনাফার লড়াইয়ে পৃথিবীটাই ক্রমশ হারিয়ে যাবে?







