কিছু বিক্ষিপ্ত ছবি এবং তার পিছনের কাহিনি

Arunima Mukherjee
৪ মিনিট
কিছু বিক্ষিপ্ত ছবি এবং তার পিছনের কাহিনি

আজ বলবো কিছু ছবির পিছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসের কথা, যা হয়তো আপনাদের নিয়ে যেতে পারবে সেই সময়ে। ছবির হাত ধরে আপনারা যেমন হারিয়ে যেতে পারবেন রবিবারের ডেনমার্কের কোন এক গলিতে, তেমনই আবার বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিস্ময় ঘটতে পারে মনে।

Northern European Children Celebrating Fastelavn

Northern European Children Celebrating Fastelavnফাস্টিলাভন মূলত শিশুদের উত্সব। ডেনমার্কের এই উত্সবটি পালিত হয়ে থাকে রবিবার কিংবা সোমবার । এই ছুটির দিনটি রোমান ক‍্যথলিক ঐতিহ‍্যের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকে। তবে সময়ের সঙ্গে আজ এই উত্সবটি নিজের রঙ হারিয়েছে। ঐতিহ‍্য বলে, অতীতে একটা ছোট পিপায় একটি কালো বিড়াল রাখা হতো এবং তারপর অনেকে মিলে ফাস্টেলাভন্সরিস ( এটি বিভিন্ন কিছু হতে পারে , যেমন – লাঠি কিংবা কোন গাছের ডাল) দিয়ে সেই পিপায় ক্রমাগত সজোরে আঘাত করতো যতক্ষণ না সেই পিপা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গিয়ে বিড়ালটি মুক্তি পায়। এই কালো বিড়ালটিকে মুক্তি দেওয়ার মাধ‍্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটানো হয় বলে অনেকে মনে করেন। এই রীতির সঙ্গে অনেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রচলিত ‘গুড ফ্রাইডে’র সম্পর্ক আছে বলে আবার অনেকে মনে করেছেন। এই সময় যীশুর ক্রুশ বিদ্ধ হ‌ওয়ার যন্ত্রণাকে মনে করানোর জন‍্য বা তা অনুভব করানোর জন‍্য বাচ্চাদের চাবুক দিয়ে প্রহার করা হয়ে থাকতো । তবে এই প্রথা যে সব জায়গায় সমানভাবে প্রচলিত ছিল, তেমনটা নয়। এই ঘটনার‌ও আগে, ‘গুড ফ্রাইডে’র দিনে বন্ধ‍্যা কিংবা অল্প বয়সী নারীদের চাবুকঘাত করার এক রীতির কথাও শোনা যায়‌। এবার আসা যাক উত্সবের কথায়, বিড়ালটি মুক্তি পেলে অঞ্চলের কচিকাচারা নানান সাজে সবাই মিলে লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট সহ অন‍্যান‍্য আহারাদি এবং অর্থ দাবি করে। সবশেষে আবারো অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করার জন‍্য এক বিশেষ ধরনের গান‌ও গাওয়া হয়ে থাকে এই দিনে। ডেনমার্ক এবং নর‌ওয়েতে এই উত্সব পালিত হয়ে থাকে তবে এই উত্সবে যে সবাই আনন্দে গা ভাসান এমনটা নয় কারণ এই উত্সব মূলত পারিবারিক ঐতিহ‍্যকেন্দ্রিক।

Shell Shock In The Trenches

Shell Shock In The Trenchesছবিতে দেখা যাচ্ছে ‘সেল সক’এ আক্রান্ত রক্তাক্ত এক মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই আধুনিক সময় আমরা যাকে বলি PTSD বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস‌অর্ডার, তাকেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিচিতি লাভ করেছিল ‘সেল সক’ নামে। ছবিটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এক ছবি। যুদ্ধ‌ও যাদের প্রাণ কাড়তে পারেনি, সেসব সৈনিকরাও একদিন বাড়ি ফিরেছিল, বাড়ি ফিরেছিল ‘সেল সক’ নামক মানসিক এক যুদ্ধ রোগে আক্রান্ত হয়ে। যুদ্ধে অনবরত সেলের ব‍্যবহারে থেকে একরকম ভীতির জন্ম নিয়েছিল বেঁচে ফেরা মানুষগুলির মধ‍্যে। শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষগুলির মধ‍্যে নানানরকম সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিত এই রোগের কারণে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব‍্যাপার এই রোগ যে কেবলমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত মানুষের মধ‍্যে দেখা দিয়েছিল এমনটা নয়, সাধারণ মানুষের মধ‍্যেও এই ভীতির জন্ম ঘটে। ‘সেল সক’ ছিল এমন এক রোগ যে ধীরে ধীরে তার জাল ক্রমশ বিস্তৃত করছিল অথচ রোগ নিরাময়ের কোন পন্থা কারোর জানা ছিল না। অনেকে নানান থেরাপির সাহায‍্য নিয়েছিলেন আবার অনেকের উপর প্রয়োগ করে হয়েছিল ইলেকট্রিক সক। জর্জ জেমসন অনুমান করেছেন, এই রোগের মূলে যুদ্ধে ব‍্যবহৃত সেল ছাড়াও এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল জার্মানদের ব‍্যবহার করা ট্রেঞ্চ মর্টার। ইংরেজ চিকিৎসক চার্লস মায়ার্স আবার ১৯১৫ সালে তাঁ ‘সেল সক’এর প্রথম গবেষণা পত্রতে বলেছিলেন এই রোগটির লক্ষণগুলি আসলে কোন না কোন শারীরিক আঘাত থেকেই জন্ম নিয়েছে। তিনি আরো বলেছিলেন, বরংবার বিস্ফোরণের সম্মুখীন হ‌ওয়ার কারণে, সৈনিকদের মস্তিষ্কে আঘাত লাগে এবং সেখান থেকেই এই লক্ষণের সৃষ্টি। একজন ইতিবাসবিদ অনুমান করেছেন, সেই সময় প্রায় ২০ শতাংশ পুরুষ এই মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন কিন্তু অনেকেই চিকিৎসায় অনিচ্ছা প্রকাশ করায় সঠিক সংখ‍্যা ঠিকভাবে বলা যায় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রোগ আবার‌ও একবার ফিরে এসেছিল।

Mother And Baby In Gas Masks

Mother And Baby In Gas Masksএই ছবিটি তোলা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন। একজন সদ‍্যজাত শিশুকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসে আছেন তাঁর মা। উভয়ের মুখেই গ‍্যাস মাস্ক। মহিলাটি বোঝাচ্ছেন কীভাবে গ‍্যাস মাস্কের বেলোগুলিকে পাম্প করে শিশুর কাছে বাতাস পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি এবং ব্রিটেনসহ আরো বিভিন্ন দেশ রাসায়নিক যুদ্ধ রীতি অবলম্বন করেছিল। সৈনিকরা এইসময় সেলে আবদ্ধ ক্লোরিন, ফসজেন এবং মাসটার্ড গ‍্যাসের ব‍্যবহার‌ও করে। কিন্তু ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ গভর্মেন্ট আশঙ্কা করে নাত্সি জার্মানি হয়তো এই গ‍্যাস সাধারণ মানুষদের আক্রান্ত করার জন‍্য প্রয়োগ করবে তাই সেইসময় স্বল্প মূল‍্যে একধরনের গ‍্যাস মাস্ক তৈরি করার কথা ভাবেন এবং তৈরি করা হয় ‘সিভিলিয়ন রেস্পিরেটর’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেনে বসবাসকারী প্রত‍্যেকটি মানুষের জন‍্য একটি করে মাস্ক তৈরি করা হয় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ‍্যেই আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলি থেকে ৩৮ মিলিয়ন গ‍্যাস মাস্ক বিতরণ করা হয়। বয়স্ক মানুষদের জন‍্য মুখোশ ছিল কালো রঙের এবং ছোটদের জন‍্য এই মাস্ক ছিল লাল রঙের। এছাড়াও শিশুদের জন‍্য প্রস্তুত করা হয়েছিল একধরনের গ‍্যাস হেলমেট, যা পাম্পের মাধ‍্যমে কার্যকরী হবে। এই ছবিতে ফুটে উঠেছে সেই দৃশ‍্য‌ই।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।