তুষার মেহতার আপত্তির কেন্দ্রে মিডিয়া! সোনালিদের নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায়ই কি শেষ কথা?
Sonali Deportation Case: সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ তোলেন, কিছু সংবাদ প্রতিবেদন পরিকল্পিতভাবে একটি ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করছে।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টে চলমান একটি সংবেদনশীল মামলা শুধু আইনগত বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এই মামলা ছুঁয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা, মানবিকতার সংজ্ঞা, সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব এবং এক প্রান্তিক পরিযায়ী পরিবারের জীবনের বাস্তবতাকে। একজন গর্ভবতী নারীকে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করার অভিযোগ, পরে মানবিক কারণে তাঁর ভারতে প্রত্যাবর্তন— এই ঘটনাকে ঘিরে সংবাদ প্রকাশ এবং তার বিরুদ্ধে সরকারের আপত্তি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, রায় ঘোষণার পরই কি সব প্রশ্ন থেমে যায়? নাকি সেখান থেকেই শুরু হয় সাংবাদিকতার আসল দায়িত্ব?
এই আইনি বিতর্কের আড়ালে থেকে যাচ্ছে এক বাস্তব মানবিক গল্প। ‘পুশ ব্যাক’ করা গর্ভবতী নারী সোনালি খাতুন কোনো পরিচিত মুখ নন। ভদ্রবিত্ত সমাজের কেউ নন। তিনি একজন পরিযায়ী শ্রমিক। দিল্লির রাস্তায় প্রায় দুই দশক ধরে তাঁর স্বামী দানিশ শেখ কখনও কাগজ কুড়িয়েছেন, কখনও পরিচারিকার কাজ করেছেন। সোনালির পরিবারও দীর্ঘদিন দিল্লিতেই থাকতেন, বাবা রিকশাচালক। ছিল না স্থায়ী ঠিকানা, ছিল না নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।পরিবারের অভিযোগ, গত ১৮ জুন দিল্লির কে এন কাটজু মার্গ থানার পুলিশ কোনো তদন্ত ছাড়াই ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ সন্দেহে সোনালি, তাঁর স্বামী ও আরও কয়েকজনকে আটক করে। তারপর দ্রুত তাঁদের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সীমান্ত পেরোনোর পরেও মুক্তি মেলেনি। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করে। সেখান থেকেই শুরু হয় বন্দিজীবন। এ এক এমন বন্দিদশা, যেখানে অপরাধ প্রমাণের আগেই সাজা কার্যকর হয়ে যায়। সোনালির গর্ভের সন্তান তখনও অনাগত, অথচ তার ভাগ্য যেন নির্ধারিত কারাগারের অন্ধকারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সোনালির পরিবারের অভিযোগ, রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পার করানোর সময় তাঁদের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। বন্দুক তাক করে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল, ফিরলেই গুলি করা হবে।
এই পরিস্থিতিতে সোনালির বাবা ভদু শেখ কলকাতা হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস মামলা দায়ের করেন।মানবাধিকার সংগঠনগুলিও এই মামলায় যুক্ত হয়। আদালতে জমা পড়ে জমির কাগজ, ভোটার কার্ড, এমনকি সোনালির আট বছরের সন্তানের জন্ম শংসাপত্র। সমস্ত নথি খতিয়ে দেখে কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, চার সপ্তাহের মধ্যে সোনালি ও তাঁর সঙ্গে আটক সকলকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এখানেই থামেনি রাষ্ট্র। কেন্দ্রীয় সরকার হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। সোনালি তখন ন’মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই সময় সরকারের দীর্ঘ নীরবতা, অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক টানাপড়েন নতুন করে প্রশ্ন তোলে। অবশেষে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সরকার সোনালিকে ভারতে ফিরিয়ে আনে।
এই প্রেক্ষাপটেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘিরে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় সলিসিটার জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ তোলেন, কিছু সংবাদ প্রতিবেদন পরিকল্পিতভাবে একটি ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করছে। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের রিপোর্ট বিচারাধীন মামলার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে একটি প্রথম পাতার প্রতিবেদনের উল্লেখ করে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, দ্য টাইসম অফ ইন্ডিয়ার মতো একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রেও এমন লেখা প্রকাশিত হয়েছে।
আদালত অবশ্য এই বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মল্য বাগচি জানান, সুপ্রিম কোর্ট কোনো প্রচার বা জনমতের চাপে সিদ্ধান্ত নেয় না। সংবাদে মামলা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে আপত্তি নেই, কিন্তু বিচারাধীন বিষয়ে মতামত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা সমস্যাজনক হতে পারে। বিচারপতি বাগচির মন্তব্য ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ, ন্যারেটিভ যেন কোনো ব্যক্তির জীবনের উপর প্রভাব না ফেলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pregnant Indian Woman Sunali Khatun: আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যাঁরা ভারতীয় নাগরিক হওয়ার দাবি করছেন, তাঁদের বক্তব্য না শুনে পুশব্যাক করা যায় না। পাশাপাশি, সোনালিদের দেশে ফিরিয়ে আনার দিকেও ইঙ্গিত দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
প্রশ্ন হলো, ন্যারেটিভ কাকে বলে? সোনালির জীবনের ঘটনা কি ন্যারেটিভ, নাকি বাস্তব? তাঁর বন্দিদশা, গর্ভাবস্থা, বিচ্ছিন্ন পরিবার এগুলো কি কেবল ‘গল্প’, নাকি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ফল?
এখানেই এসে দাঁড়ায় সাংবাদিকতার ভূমিকা। আদালত রায় দেবে, সেটাই তার সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু রায়ের বাইরে যে অসংখ্য মানবিক প্রশ্ন থেকে যায়, সেগুলির উত্তর খোঁজার দায়িত্ব কার? সোনালির স্বামী, সুইটি বিবিরা কেন সোনালির সঙ্গেই দেশে ফিরতে পারলেন না? কোন প্রক্রিয়ায় কাউকে ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়? যাচাইয়ের দায় কার? এই প্রশ্নগুলো যদি সংবাদমাধ্যম না তোলে, তবে গণতন্ত্রের পরিসরে সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে কে?
রায় আইনের শেষ কথা হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারের শেষ কথা নয়। বিশেষ করে যখন সেই রায়ের ছায়ায় পড়ে থাকে পরিযায়ী শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ, অদৃশ্য নাগরিকরা। সংবাদমাধ্যমের কাজ আদালতের জায়গা নেওয়া নয়, আবার নীরব দর্শক হয়ে থাকাও নয়। তার কাজ প্রশ্ন তোলা, রাষ্ট্রের কাছে, ব্যবস্থার কাছে, এবং প্রয়োজনে নিজের কাছেও।
সোনালি খাতুন দেশে ফিরেছেন। কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হয়নি। যেমন শেষ হয়নি এই প্রশ্নও, রায় কি শেষ কথা বলবে? নাকি সেখান থেকেই শুরু হবে আরও কঠিন প্রশ্ন, আরও গভীর অনুসন্ধান? গণতন্ত্রে বিচারব্যবস্থা, রাষ্ট্র ও সংবাদমাধ্যম— তিনটি স্তম্ভই প্রয়োজন। একটিকে দুর্বল করে অন্যটির ভারসাম্য রক্ষা করা যায় না। সোনালির মামলাও তাই কেবল একটি আইনি ফাইল নয়। এটি আমাদের সময়ের আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই, নীরবতা, না প্রশ্ন—সেই সিদ্ধান্ত এখনও আমাদের হাতেই।






