কিউবায় সরকার পতনের আশঙ্কা? আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন
Trump Cuba policy: কিউবার বর্তমান সরকার কি সত্যিই বড় সংকটের মুখে? মার্কিন রিপোর্টে দাবি, সম্ভাব্য ‘সরকার পতন’ পরিস্থিতি মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। অর্থনৈতিক সঙ্কট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে তাহলে কি নতুন করে আমেরিকা-কিউবা সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে?
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানির ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এবার নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কিউবা। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন নাকি কিউবার বর্তমান সরকার 'সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে' বলে ধরে নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে। খবর অনুযায়ী, কিউবায় অশান্তি ছড়ালে কী ভাবে পরিস্থিতি সামলানো হবে, তা নিয়ে আগাম সামরিক প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
এই খবর সামনে আসার পর থেকেই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি সত্যিই কিউবায় সামরিক হস্তক্ষেপের পথে হাঁটছে আমেরিকা? নাকি এটি শুধুই চাপ তৈরির কূটনৈতিক কৌশল?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস (Axios)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের একাংশ মনে করছে, চলতি গ্রীষ্মেই কিউবার কমিউনিস্ট সরকার বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন দফতর সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে 'ওয়ার গেম' বা প্রস্তুতিমূলক মহড়া চালিয়েছে। সেখানে ভাবা হয়েছে, যদি কিউবায় গণঅসন্তোষ ছড়ায়, প্রশাসন ভেঙে পড়ে বা শরণার্থী সঙ্কট তৈরি হয়, তাহলে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া কী হবে।
তবে এখনও পর্যন্ত সরাসরি সামরিক অভিযানের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি হোয়াইট হাউস। বরং প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং এমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা যাতে কিউবার সরকার ভিতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কৌশলকে কেউ কেউ 'অ্যাক্সেলারেশনিজম' বলেও উল্লেখ করছেন। অর্থাৎ সংকটকে দ্রুততর করে শাসনব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Cuba Blackout Crisis: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজেরাই তেল সরবরাহ বন্ধ করেনি, অন্য দেশগুলিকেও কিউবাকে তেল বিক্রি করলে শাস্তির হুমকি দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিউবা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়।
কিউবার বর্তমান পরিস্থিতিও এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশটিতে বহু মাস ধরে বিদ্যুৎ ঘাটতি চলছে। জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়ায় নিয়মিত ব্ল্যাকআউট হচ্ছে। খাদ্য এবং ওষুধের অভাবও তীব্র হয়েছে। বহু মানুষ দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। ২০২১ সালে কিউবায় বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের একাংশের দাবি, পরিস্থিতি তখনকার চেয়েও খারাপ।
এই পরিস্থিতির পিছনে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছে হাভানা। কিউবার অভিযোগ, ওয়াশিংটন ইচ্ছে করেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যাতে দেশটির সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সম্প্রতি কিউবার উপ-বিদেশমন্ত্রী জোসেফিনা ভিডাল অভিযোগ করেছেন, আমেরিকা 'সামরিক আগ্রাসনের পরিবেশ' তৈরি করছে। তাঁর মতে, নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি অবরোধ এবং রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে কিউবাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছেন মার্কিন বিদেশমন্ত্রী মার্কো রুবিও। কিউবান অভিবাসী পরিবারের সন্তান রুবিও বহুদিন ধরেই কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের কড়া সমালোচক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের কিউবা নীতিতে তাঁর প্রভাব অত্যন্ত বেশি। প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, কিউবার শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোই রুবিওর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লক্ষ্য।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Che Guevara Famous Photograph: চে গেভারার এই বিখ্যাত ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৫ মার্চ। উপলক্ষ্য ছিল অন্ত্যেষ্টি।
মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যেই কিউবার বিরুদ্ধে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভেনেজুয়েলা থেকে তেল সরবরাহে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। পাশাপাশি প্রাক্তন কিউবান নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতির খবরও প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি এবং অন্যান্য সূত্রে দাবি করা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের একটি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা তৈরির চেষ্টা চলছে।
এদিকে আমেরিকার সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও জল্পনা বাড়ছে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি বৃদ্ধি, নজরদারি বাড়ানো এবং দক্ষিণ কমান্ডের বিশেষ বৈঠক নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, কিউবায় পরিস্থিতি খারাপ হলে আমেরিকা সামরিক পদক্ষেপ বা ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর মতো বিভিন্ন উপায় নিয়ে ভাবছে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সরাসরি কিউবা আক্রমণ করা এত সহজ নয়। কারণ কিউবার সঙ্গে আমেরিকার সংঘাতের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল। ১৯৬১ সালের ‘বে অফ পিগস’অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে কিউবায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি আমেরিকার কাছে খুবই স্পর্শকাতর হয়ে রয়েছে। এছাড়া রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে কিউবার সম্পর্কও ওয়াশিংটনের জন্য বড় কূটনৈতিক চিন্তার বিষয়। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে সম্প্রতি দাবি করা হয়েছে, কিউবায় রুশ এবং চিনা নজরদারি কার্যকলাপ বেড়েছে।
এই কারণেই অনেকের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন সরাসরি পদক্ষেপ না নিয়ে চাপ বাড়িয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তনের অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বাড়িয়ে সরকারকে দুর্বল করে তোলার চেষ্টা। এমনকি কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নিজে আপাতত নতুন সামরিক সংঘাতে জড়াতে চান না, বিশেষ করে ইরান পরিস্থিতির পর।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, এই কৌশল সাধারণ কিউবানদের জীবন আরও কঠিন করে তুলছে। অর্থনৈতিক অবরোধের ফলে খাদ্য ও ওষুধের সঙ্কট বাড়ছে। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের নামে সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলা হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই ইস্যু নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। রেডিট (Reddit)-সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেকে অভিযোগ করছেন, আমেরিকা ইচ্ছে করেই কিউবায় অস্থিরতা বাড়াতে চাইছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, যদি সত্যিই কিউবার সরকার ভেঙে পড়ে, তাহলে শরণার্থী সঙ্কট ও মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে আমেরিকার কোনো না কোনো হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠবে।








