বিদ্যুৎহীন কিউবা! কেন ফের আগ্রাসী সুর ট্রাম্পের?
Cuba Blackout Crisis: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজেরাই তেল সরবরাহ বন্ধ করেনি, অন্য দেশগুলিকেও কিউবাকে তেল বিক্রি করলে শাস্তির হুমকি দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিউবা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়।
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার সম্পর্ক। এখন এই দ্বন্দ্ব নতুন মোড় নিয়েছে। সম্পর্কের টানাপোড়েনে সরাসরি ক্ষমতা দখলের ইঙ্গিত পর্যন্ত উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় বিতর্ক তৈরি করেছে। তিনি বলেছেন,
আমি বিশ্বাস করি কিউবা দখলের কৃতিত্ব পাব। আমি এ-ও মনে করি এটা বড় সম্মান।
এই কথাতেই বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত মূলত তীব্র জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন ধরেই কিউবা বাইরের দেশ থেকে তেল আমদানির উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ছিল তাদের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী। কিন্তু ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায় এবং সেই সঙ্গে কিউবায় তেলের সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এখানেই শেষ নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু নিজেরাই তেল সরবরাহ বন্ধ করেনি, অন্য দেশগুলিকেও কিউবাকে তেল বিক্রি করলে শাস্তির হুমকি দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকেও কিউবা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Che Guevara Famous Photograph: চে গেভারার এই বিখ্যাত ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯৬০ সালের ৫ মার্চ। উপলক্ষ্য ছিল অন্ত্যেষ্টি।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। দেশজুড়ে পুরনো এবং জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি একে একে বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে পুরো দেশ অন্ধকার (ন্যাশনওয়াইড ব্ল্যাকআউট) হয়ে যায়। এতে কোটি কোটি মানুষ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছে।
এই অবস্থাতেই ট্রাম্পের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তিনি বলেন, কিউবা এখন 'খুব দুর্বল দেশ' এবং তিনি চাইলে 'যা খুশি করতে পারেন', চাইলে মুক্ত করতে পারেন, আবার চাইলে দখলও করতে পারেন।
এই মন্তব্য নিছক রাজনৈতিক নয়, এর পেছনে একটি বৃহত্তর কৌশল কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার বিরোধী। ১৯৬০-এর দশক থেকে চলা নিষেধাজ্ঞা এই নতুন পদক্ষেপে আরও কঠোর হয়েছে। এখন লক্ষ্য শুধু চাপ সৃষ্টি নয়, সরাসরি রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে উঠে আসছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেলকে সরানোর প্রস্তাবও দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিও সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। কিউবা এই পরিস্থিতিকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হিসেবে দেখছে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনো চুক্তি হলে তা তাদের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্মান করেই হতে হবে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Che Guevara and Football: গেভারা তার দোস্তকে ডাকত ‘পেদেরনেরিতা’ বলে, এর চেয়ে আদরের ডাক আর কীই বা হতে পারে!
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ না থাকায় খাদ্য সংরক্ষণ, হাসপাতালের পরিষেবা, পানীয় জল কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। হাজার হাজার অস্ত্রোপচার করা যায়নি, শহরগুলিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে, মানুষ রাস্তায় নেমে ক্ষোভ দেখাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে কিউবা কিছুটা নরম হতে শুরু করেছে। তারা এখন প্রবাসী কিউবানদের দেশে টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ দিচ্ছে, যা আগে এত সহজ ছিল না। অনেকেই মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত মূলত বর্তমান সংকট সামলানোর জন্যই নেওয়া হয়েছে।
তবে এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে শুধু কিউবার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বৃহত্তর ভূরাজনীতির অংশ। ভেনেজুয়েলা, ইরান এবং লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আগ্রাসী অবস্থানের সঙ্গে এই ঘটনাগুলি সরাসরি যুক্ত। কিউবা সেই বৃহত্তর শক্তির লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলকে চাপ তৈরি করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জ্বালানি বন্ধ করে দিলে একটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন খুব সহজেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়, তবে কিউবার ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একদিকে একটি দেশ জ্বালানি সংকটে দিশেহারা, অন্যদিকে একটি সুপারপাওয়ার প্রকাশ্যে সেই দেশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে। এই অবস্থায় কূটনৈতিক সমাধান না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।
কিউবার মানুষ এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তারা বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে যেমন দিন কাটাচ্ছে, তেমনই আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলায়ও আটকে পড়েছে। আর সেই খেলায় শেষ পর্যন্ত কী হবে, কিউবা কি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে, নাকি চাপে পড়ে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, তা সময়ই বলবে।





