কান টানলে অভিষেক? এই কারণেই ইডির শমন থেকে রেহাই পাচ্ছেন না তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড
Abhishek Banerjee: তৃণমূল প্রতিহিংসার তত্ত্ব খাড়া করলেও কেন অভিষেককে ধরে টানাটানি করছে ইডি?

কান টানলে মাথা আসবে?
পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অনুব্রত গ্রেফতারের পর এই আওয়াজ তুলেছিল বিরোধী শিবির। (গর্জেছিলেন খোদ বিরোধী দলনেতা)।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণীর আগে দিল্লি সফর নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। তৃণমূল এবং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বকেয়া আদায় করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। ৪০ মিনিট ধরে তিনি শুধুই বকেয়া আদায়ের চিঠি ধরালেন? এই নিয়ে প্রশ্ন ওঠার ছিল, উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, ওই সফর ছিল আসলে `সেটিং’। সে যাই হোক, এর আগে দেখা গেছে সিবিআই, ইডি অভিষেককে ধরে টানাটানি করতেই তিনি দিল্লি ছুটে গিয়েছেন। এমনকী বিরোধী ঐক্য তৈরির বাড়া ভাতে কার্যত ছাই দিয়েছে সেই ঘটনা। কারণ মমতাকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য ভাইপোকে ধরে টানাটানির প্রয়োজন ছিল? এবারও কি মমতা সেই ইঙ্গিত আগে পেয়েছিলেন? ছাত্র সমাবেশের মঞ্চ থেকে সেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়ো রোডের ছাত্র সমাবেশের মঞ্চ থেকে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, “এই সভায় একটু আগেই অভিষেক খুব ভালো বক্তৃতা দিয়েছে, আমার মন বলছে, ওকে কাল না নোটিস ধরায় আবার। আগে তো ওকে নোটিস ধরিয়েছে, ওর বউকেও নোটিস ধরিয়েছে। এবার বোধ হয় ২ বছরের বাচ্চাটাকেও নোটিস ধরাবে।” এটা কি নেহাতই কাকতালীয়? বোধহয় না। কারণ ২১ জুলাই এর সভার পরেপরেই ইডির জালে পার্থ এবং তারপর সিবিআইয়ের জালে অনুব্রত। সরকারকে একেবারে ল্যাজেগোবরে করে ছাড়ছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। তৃণমূল প্রতিহিংসার তত্ত্ব খাড়া করলেও কেন অভিষেককে ধরে টানাটানি করছে ইডি?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব ইডি-র। অভিষেককে সমন পাঠাল ইডি। কলকাতার ইডি-র অফিস সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে ২ সেপ্টেম্বর। কয়লা পাচার মামলায় তাঁকে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দিল্লি থেকে টিম আসছে। তদন্তকারী অফিসার-সহ একটি বিশেষ দল অভিষেককে জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানা গিয়েছে। মমতার ভবিষ্যদ্বাণীর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার সকালেই কয়লা পাচার কাণ্ডে এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব করল ইডি। এর আগেও তলব করা হয়েছিল তাঁকে। একাধিকবার তাঁকে দিল্লিতে তলব করা হয়েছিল। যা নিয়ে রীতিমতো শীর্ষ আদালত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন অভিষেক-রুজিরা। তাঁদের একটাই আবেদন ছিল, কলকাতাতেই যেন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় অবশ্য শীর্ষ আদালতে তাঁর সেই মামলা মেনশন হয়নি। এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতার অফিসেই ডেকে পাঠাল ইডি।
কেন তলব
ইডি সূত্রে খবর, বেশ কিছু নতুন তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। সেই তথ্য-ই তাঁরা যাচাই করে দেখতে চান। সেই কারণেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়কে তলব করা হয়েছে। এর আগে দিল্লিতে গিয়ে ইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন অভিষেক। এবার তলব কলকাতাতেই। কয়লা পাচার মামলায় ইডির এই তলব নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
চলতি বছরের ২৯ মার্চ মঙ্গলবার দুপুর ১১টা নাগাদ দিল্লিতে ইডির দফতরে অভিষেককে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে ওইদিন হাজির থাকতে হয় দিল্লির ইডির অফিসে। এদিকে তার আগে ২৪ মার্চ অভিষেককে প্রায় সাড়ে ৮ ঘণ্টা দিল্লিতে ইডির অফিসে জেরা করা হয়েছিল। এরপর তিনি ইডির অফিস থেকে বেরিয়ে জানিয়েছিলেন, কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলি তিনি পাঠিয়ে দেবেন।
কিন্তু কেন আবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তলব করল ইডি? তবে কি কয়লাকাণ্ড নিয়ে ইডি যা জানতে চাইছে তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি? তবে কি আরও তথ্য ইডি অভিষেকের কাছ থেকে জানতে চাইছে ? সূত্রের খবর , অভিষেক এর আগে যে বয়ান দিয়েছিলেন সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে তিনি এর আগে কথা বলার পরেও সবটা জানতে পারেননি ইডি কর্তারা। এখনও অনেক প্রশ্ন রয়েছে। কারণ গত কয়েকমাসে নানা সূত্র পেয়েছে ইডি। তার ভিত্তিতেই তাঁকে ফের জেরা করা উদ্যোগ। তবে এযাত্রা তাঁকে দিল্লি যেতে হচ্ছে না। সূত্রের খবর এমনটাই।
অন্য দিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের শ্যালিকা মেনকা গম্ভীবরকেও তলব করেছে ইডি। তাঁকেও কয়লা পাচায় মামলাতেই তলব করা হয়েছে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর মেনকা গম্ভীরকে দিল্লির ইডি অফিসে হাজিরা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে নোটিসে। যদিও সূত্রের খবর, এই নোটিসের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে মেনকা।
ষড়ষন্ত্রের তত্ত্ব
তৃণমূলের অভিযোগ, ২০২১ এর আগে বিজেপি মোদী-শাহর মতো হেভিওয়েট ব্যাটেলিয়ান প্রচারে নামিয়েও ভালো রেজাল্ট দূর অস্ত, এক্কেবারে ফেল করে রাজ্য থেকে পাত্তারি গুটিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে বাংলাকে পাখির চোখ করেও দাঁত ফোটাতে পারেননি মোদী। অভিযোগ, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি করেন, করছেন। তাই এই রাজ্যকে তাক করে একে একে রাঘব বোয়ালদের জেল পাঠাচ্ছে সিবিআই, ইডি।
বিরোধীদের বারবার তাড়া করেছে সিবিআই, ইডি জুজু। এই অস্ত্রে বিরোধীদের চমকে দিতে বারবার শান দিয়েছে তারা! এখনও বিজেপি এবং কেন্দ্রের মরণ কামড়ের নাম সিবিআই ও ইডি। তার প্রয়োগ দেখা গেছে কখনও রাহুল, সোনিয়া, ফারুক আবদুল্লা, শিবকুমার, এমনকী উত্তরপ্রদেশে বুয়া-বাবুয়ার ক্ষেত্রেও।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, দিল্লির আঙিনায় বিরোধী ঐক্য তৈরি করতে সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় জয়কে সামনে রেখে বিরোধীরা এক হচ্ছিল। বিজেপি যে তাতে বাধ সাধবে, এ আর কী আশ্চর্যের! মোদি-শাহরা ভালোই জানেন অভিষেকের কান টানলে মমতাকে ভালোই বিড়ম্বিত করা যাবে। অভিযোগ, নিপুণভাবে এই কাজে সিবিআই এবং ইডিকে নিয়োগ করে তারা। পার্থ, কেষ্ট গ্রেফতারের অনেক আগে থেকেই অভিষেককে ধরে টানাটানি করছে ইডি, সিবিআই।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিজেপির বহু পুরনো ও চেনা হাতিয়ার হিন্দুত্ব। দেশে প্রাচীন স্মৃতি সৌধের ইতিহাস পরিবর্তন করে গায়ে হিন্দুত্বের তকমা লটকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। রামমন্দির হচ্ছে। এদিকে মোদি ক্ষমতায় এসে বুঝেছিলেন, নতুন ভারতের মন হিন্দুত্বে ভিজবে না। নতুন ভারত কাজ চায়। তাই মোদিকে বারবার বলতে হয়েছে উন্নয়নের কথা। এতকিছুর পরেও সিবিআই ও ইডির মতো `ভোঁতা অস্ত্রে’ কেন বারবার শান দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র? একথা ঠিক যে, এই রাজ্যে দুর্নীতির পচা শামুকে সরকারের পা কেঁটে রক্তাক্ত হয়েছে। তবে কেন্দ্রের বারবার বিরোধীদের ঘায়েল করতে সিবিআই ও ইডি-র মতো অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতার সাক্ষী থেকেছে দেশ। এত প্রয়োগের ফলে এই দুই অস্ত্রের ব্যবহার ছিদ্রযুক্ত পাত্রে জল ভরার বৃথা চেষ্টার সামিল হবে না তো? নাকি এবারও বড়শিতে মাছ গাঁথবে? দেখা যাক।







