নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

Asish Gupta
১২ মিনিট
নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

একজন লেখক তাঁর বই লিখবেন, পাঠক সেই বই কিনবেন, প্রকাশক বই বিক্রি করে লেখককে রয়্যালটি দেবেন—সাহিত্যজগতের এই স্বাভাবিক সম্পর্কের মধ্যে রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা আইনের প্রবেশ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু কোনো লেখকের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁর বই প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেন অপরাধের আওতায় পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলে, প্রশ্নটি আর শুধু প্রকাশনা শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রতিবাদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা এবং গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার নিয়ে এক গভীর বিতর্ক। আইরিশ ঔপন্যাসিক স্যালি রুনির সাম্প্রতিক ঘটনা সেই বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ফিলিস্তিনপন্থী প্রত্যক্ষ আন্দোলনকারী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন জানানো এবং নিজের বই থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির অর্থ ওই সংগঠনকে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করার পর ব্রিটেনে তাঁর বই সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রকাশনা সংস্থা ফ্যাবার। সংস্থাটির বক্তব্য, বর্তমান ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী রুনির বই বিক্রি করে তাঁর প্রাপ্য অর্থ তাঁকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কোনো লেখকের বই বিক্রি করে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য অর্থ দিতে না পারা প্রকাশকের কাছে একটি ‘অবিবেকসুলভ’ পরিস্থিতি। ফ্যাবারের এই অবস্থান শুধু একজন লেখকের প্রকাশনা-সংক্রান্ত সমস্যার বিবরণ নয়; এটি রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার মধ্যে সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

স্যালি রুনি সমকালীন আইরিশ সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত নাম। নর্মাল পিপল, কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস এবং বিউটিফুল ওয়ার্ল্ড, হোয়ার আর ইউ–এর মতো উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাঁর লেখা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রেম, বিচ্ছিন্নতা ও তরুণ প্রজন্মের মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক শ্রেণি, ক্ষমতার সম্পর্ক, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সমকালীন সমাজের অসংগতিও তাঁর সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নর্মাল পিপল, কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস বিবিসির জন্য টেলিভিশন ধারাবাহিক হিসেবেও নির্মিত হয়েছে। ফলে ব্রিটেনের বাজার থেকে তাঁর বই সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো অখ্যাত লেখকের সীমিত প্রকাশনা-সংক্রান্ত সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাহিত্যবাজার, একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাষ্ট্রের আইনি ক্ষমতার মধ্যে সংঘাত।

এই ঘটনার সূত্রপাত প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে ঘিরে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্ত থেকে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার সন্ত্রাসবাদ আইনের অধীনে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সংগঠনটি মূলত ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কর্মসূচি চালিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ব্রাইজ নর্টন ঘাঁটিতে সংগঠনটির কর্মীদের অনুপ্রবেশ ও ক্ষতিসাধনের অভিযোগ। সরকারের বক্তব্য, সংগঠনটি পরিকল্পিতভাবে অপরাধমূলক প্রত্যক্ষ পদক্ষেপের অভিযান চালিয়েছে। অন্যদিকে, প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ইজরায়েলের সামরিক শিল্পের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরেছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সংঘাতের নিষ্পত্তি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে সম্ভব নয়; সংগঠনটির নিষিদ্ধকরণের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতা বিচার করাও জরুরি।

প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধ হওয়ার পর রুনি প্রকাশ্যে জানান, তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি অব্যাহত রাখতে চান এবং নিজের বই ও সেগুলির টেলিভিশন অভিযোজন থেকে প্রাপ্ত অর্থ সংগঠনটিকে সহায়তা করার কাজে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের উদ্দেশ্যের প্রতি সমর্থন জানানো, কোনো সংগঠনের নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা এবং সেই সংগঠনকে আর্থিক বা বস্তুগত সহায়তা দেওয়া—এই তিনটি বিষয় আইনগতভাবে এক নয়। ব্রিটিশ আইনে নিষিদ্ধ সংগঠনকে অর্থ দেওয়া বা জেনেশুনে এমন অর্থ সরবরাহ করা, যা সন্ত্রাসবাদের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে, অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার কারণে রুনির রয়্যালটি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই আইনি ঝুঁকিই তৈরি হয়েছে বলে তাঁর প্রকাশক জানিয়েছে। রুনি নিজেও বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রিটেনে তাঁর কাজ প্রকাশের চুক্তি কার্যকর করা গুরুতর অপরাধের কারণ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ফ্যাবারের সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, বর্তমান ব্রিটিশ আইন এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে রুনির বই থেকে ব্রিটেনে অর্জিত অর্থ তাঁকে দেওয়া সম্ভব নয়। কোনো লেখকের বই বিক্রি করে তাঁর প্রাপ্য অর্থ তাঁকে না দেওয়াকে প্রকাশক হিসেবে তারা ‘অবিবেকসুলভ’ বলে মনে করে। তাই রুনির পূর্ণ সম্মতিতে ব্রিটেনে কোনো মাধ্যমেই তাঁর বই আর সরবরাহ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ব্রিটেনের বাইরে তাঁর বই প্রকাশ ও বিক্রি অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ, এখানে বইগুলিকে সাহিত্যিক মূল্যহীন বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়নি, কিংবা লেখকের বিরুদ্ধে কোনো সাহিত্যিক মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং রাজনৈতিক অবস্থান ও সম্ভাব্য আইনি দায়ের সংঘাতের কারণে বইয়ের বাণিজ্যিক সরবরাহ বন্ধ হয়েছে।

এই ঘটনাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ বলা হবে কি না, তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। ব্রিটিশ সরকার রুনির উপন্যাসগুলিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি। প্রকাশকও বলেছে, তারা লেখকের সঙ্গে সম্মতি জানিয়েই সরবরাহ বন্ধ করছে। কিন্তু কোনো লেখকের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁর বইয়ের রয়্যালটি হস্তান্তর করা আইনগত ঝুঁকির মুখে পড়লে এবং সেই ঝুঁকি এড়াতে তাঁর বই একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হলে, তার বাস্তব ফলাফল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। রাষ্ট্র সরাসরি কোনো বই নিষিদ্ধ না করলেও আইন, আর্থিক বিধিনিষেধ এবং সম্ভাব্য ফৌজদারি দায়ের সম্মিলিত প্রভাবে বইয়ের প্রচার ও পাঠকের কাছে তার পৌঁছনোর সুযোগ সীমিত হতে পারে। স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপের বিতর্কে এই পরোক্ষ প্রভাবকে উপেক্ষা করা যায় না।

রুনির ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের নিষিদ্ধকরণ নিজেই ব্রিটেনে একটি বড় সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার-সংক্রান্ত বিতর্কের বিষয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের হাইকোর্ট সরকারের নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তকে বেআইনি ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে রায় দিয়েছিল। কিন্তু জুন মাসে আপিল আদালত সেই রায় উল্টে দিয়ে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। সংগঠনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি এখন সুপ্রিম কোর্টে এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। আগামী ৪ ও ৫ নভেম্বর এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা। ফলে রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এমন একটি সময়ে এসেছে, যখন সংগঠনটির নিষিদ্ধকরণের বৈধতা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত বিচার এখনও বাকি।

এই আইনি লড়াইয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের আইন ও মানবাধিকার বিভাগের পরিচালক টম সাদারল্যান্ড প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশকারীদের দীর্ঘ কারাদণ্ডের ঝুঁকির মুখে পড়তে হওয়া বাক্‌স্বাধীনতার উপর গুরুতর আঘাত। অ্যামনেস্টি সুপ্রিম কোর্টে আপিলের অনুমতিকে স্বাগত জানিয়ে সরকারের কাছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে।

এখানে মূল প্রশ্নটি হলো, রাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষমতার সীমা কোথায় শেষ হবে এবং নাগরিকের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোথা থেকে শুরু হবে। কোনো সংগঠনের নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা এবং সেই সংগঠনকে ঘিরে যাবতীয় রাজনৈতিক সংহতি, প্রতিবাদ কিংবা আর্থিক লেনদেনের উপর বিস্তৃত বিধিনিষেধ আরোপ করা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু নিরাপত্তার যুক্তিতে গৃহীত ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং মানবাধিকারের সঙ্গে তার সামঞ্জস্যও বিচার করা আবশ্যক। নিষিদ্ধ সংগঠনকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে আইনি বিধিনিষেধের প্রশ্নটি তাই একদিকে যেমন ফৌজদারি আইনের বিষয়, অন্যদিকে তেমনই রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ব্রিটেনে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধ হওয়ার পর সংগঠনটির প্রতি সমর্থন জানানোর অভিযোগে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিস্তৃত প্রয়োগ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকেও অপরাধের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ, গ্রেফতার বা মামলা হয়েছে বলেই তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয় না। একইভাবে, কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সমর্থন করা মানেই তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই পার্থক্যগুলি অক্ষুণ্ণ রাখা অত্যন্ত জরুরি।

স্যালি রুনির অবস্থান এই বিতর্কে একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে। তিনি শুধু ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেননি; নিজের সাহিত্যকর্ম থেকে উপার্জিত অর্থ কোথায় ব্যয় করবেন, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে যুক্ত করেছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সকলের একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কৌশল, প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ কিংবা সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলারও অবকাশ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিবাদের নামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা, সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইকে সমর্থন করা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের সমতুল্য করে দেখা যায় না। আইনের শাসন বজায় রাখার জন্যই এই সীমারেখা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

রুনির ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: একজন লেখকের সাহিত্যকর্ম কি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেখা সম্ভব? সাহিত্য কোনো শূন্যস্থানে জন্ম নেয় না। লেখকের সামাজিক অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক চেতনা, শ্রেণিগত অবস্থান এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে। পাঠক কোনো লেখকের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একমত না হয়েও তাঁর সাহিত্য পড়তে পারেন, তাঁর চিন্তার সমালোচনা করতে পারেন, এমনকি তাঁর অবস্থানের বিরুদ্ধেও যুক্তি দিতে পারেন। কিন্তু লেখকের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তাঁর বইয়ের প্রচার ও বিতরণ বাধাগ্রস্ত হলে সেই বিতর্কের ক্ষেত্রটিই সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশেষত বইয়ের বাজারে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব দ্বিমুখী হতে পারে। একদিকে, ব্রিটেনের পাঠকেরা রুনির বই নতুন করে কেনার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়বেন। অন্যদিকে, প্রকাশক, বই বিক্রেতা এবং লেখকেরা ভাবতে পারেন, বিতর্কিত রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিলে তাঁদের পেশাগত সম্পর্ক ও আর্থিক স্বার্থও আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে কি না। এই আশঙ্কা যদি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসেন্সরশিপ তৈরি হতে পারে। লেখকেরা তখন কী লিখবেন, কোন বিষয়ে মুখ খুলবেন এবং কোন রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করবেন, তা নির্ধারণের সময় সাহিত্যিক বিবেচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য আইনি পরিণতির কথাও ভাবতে বাধ্য হবেন।

তবে ফ্যাবারের সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। প্রকাশকটি লেখকের উপার্জন আটকে রেখে তাঁর বই বিক্রি চালিয়ে যাওয়াকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেনি। লেখকের সঙ্গে সম্মতির ভিত্তিতে সরবরাহ বন্ধ করে তারা জানিয়েছে, ব্রিটেনের বাইরে রুনির বই প্রকাশ ও বিক্রি অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ, প্রকাশক এখানে লেখকের প্রাপ্য অর্থ না দিয়ে তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে লাভ করার পথ বেছে নেয়নি। বরং লেখকের অধিকার ও বর্তমান আইনি পরিস্থিতির মধ্যে সংঘাতকে সামনে এনে বই বিক্রি বন্ধ করেছে। এই অবস্থান প্রকাশকের নৈতিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: রাষ্ট্রীয় আইন যদি কোনো লেখকের বৈধ উপার্জন হস্তান্তরের পথে বাধা তৈরি করে, তাহলে প্রকাশকের দায়িত্ব কী হবে? আইন মেনে ব্যবসা চালানো, নাকি লেখকের অধিকার রক্ষায় সেই ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থগিত করা? ফ্যাবার দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নের বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এই ঘটনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গাজায় যুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি এবং ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছে। বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থী, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই প্রতিবাদের সঙ্গে সব সংগঠন বা আন্দোলনের কৌশল এক নয়; প্রত্যেকের কার্যকলাপের বিচারও পৃথকভাবে হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার দাবি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৈধ আলোচ্য বিষয়। সেই দাবির পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে যে আইনি পার্থক্য রয়েছে, তা অস্বীকার না করেই বলা যায়, সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিবাদের পরিসর অযথা সংকুচিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

আদালতের রায়ের অপেক্ষা করতে করতে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষমতা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই সেই ক্ষমতার সমালোচনা করার অধিকারও গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। কোনো আইন কতটা কঠোর, তা শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা যায় না; দেখতে হয়, বাস্তবে তার প্রয়োগ নাগরিকের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক জীবন এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার ওপর কী প্রভাব ফেলছে। একজন লেখকের বই বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই প্রভাবের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ।

লিখেছেন
Asish Gupta
Asish Gupta
2 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?