সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও দিল্লিতে সাংবাদিকদের আটক কেন?
সাংবাদিকদের আটকের ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন এক দিনে, যখন সুপ্রিম কোর্টে দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত। শনিবারের পর রবিবার আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ফের পুলিশি বাধা ও আটকের মুখে পড়েন সাংবাদিকেরা। সুপ্রিম কোর্টে বেআইনি আটক রোখা এবং মানুষের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়টি ওঠার পরও সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিয়ে।
কত জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল, তা নিয়ে অবশ্য কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। দ্য হিন্দু জানিয়েছে, অন্তত সাত জন সাংবাদিককে আটক করা হয়। স্ক্রল ডট ইন-এর প্রতিবেদনে অন্তত ন’জনের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দুস্তান টাইমস-এর দাবি, রবিবার অন্তত ১২ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল। ফলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী আটক হওয়া সাংবাদিকদের সংখ্যা ভিন্ন। দিল্লি পুলিশও এই বিষয়ে তার কোনও হিসেব প্রকাশ করেছে বলে এই প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ নেই।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর হিন্দি বিভাগের সাংবাদিক শাশ্বত, সিয়া এবং বিজয় কুমার রবিবার দিল্লির কনট প্লেস এলাকায় CJP-র বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করছিলেন। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁদের চেলমসফোর্ড রোড এলাকা থেকে পুলিশ আটক করে বাসে তোলে। পরে উত্তর দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামের কাছে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আটক হওয়ার পর প্রায় ৪৫ মিনিট তাঁদের পুলিশের হেফাজতে থাকতে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ওই সাংবাদিকেরা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকেরা নিজেদের প্রেস কার্ড দেখিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের আটক করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ আটকের নির্দিষ্ট কোনও আইনি কারণ জানায়নি। কনট প্লেসে বিক্ষোভকারীদের আটক করার সময় সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন তাঁরা। সেই ঘটনার খবর করতে গিয়েই পুলিশি পদক্ষেপের মুখে পড়েন বলে তাঁদের বক্তব্য।
Peek TV-র দুই সাংবাদিক বেদান্ত আগরওয়াল এবং সারা খানকেও কনট প্লেস থেকে আটক করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের আটক করার ঘটনা কভার করার সময় প্রেস কার্ড দেখানো সত্ত্বেও পুলিশ তাঁদের টেনে নিয়ে যায়। Peek TV-র তরফে তাঁদের আটকের কথা জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া মালয়ালম ভাষার অন্তত তিনটি সংবাদমাধ্যম— Reporter TV, 24 News এবং Asianet News-এর সাংবাদিকদের আটক করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁদের কয়েক ঘণ্টা পরে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে মাতৃভূমি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, প্রত্যেক সাংবাদিককে ঠিক কখন আটক করা হয়েছিল এবং কখন মুক্তি দেওয়া হয়, তার বিস্তারিত সময় সব ক্ষেত্রে প্রকাশিত হয়নি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাজধানীতে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার আবহে নিরাপত্তা বাহিনীর এই তৎপরতা নজর কেড়েছে। তবে রবিবারের পরবর্তী কর্মসূচি কোথায় এবং কীভাবে হবে, সে বিষয়ে সিজেপি-র ঘোষণার দিকে নজর রয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের সহযোগী প্রকাশনা হিন্দুস্তান-এর সাংবাদিক আশিস সিং রবিবার দুপুর আড়াইটে নাগাদ আর কে আশ্রম মার্গে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-এর বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করছিলেন। তাঁর দাবি, পুলিশের আটক করার ঘটনা ক্যামেরাবন্দি করার সময় তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং কোনও ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয় বলে তাঁর সন্দেহ। বারবার নিজের পরিচয় জানিয়ে প্রেস কার্ড দেখালেও পুলিশ তাঁর কথা শোনেনি বলে অভিযোগ আশিসের।
আশিসের বক্তব্য, তাঁকে এক চিত্রসাংবাদিকের সঙ্গে বাসে তুলে দেওয়া হয়। প্রায় ২০-৩০ মিনিট পর মন্দির মার্গ এলাকায় পৌঁছলে তাঁরা বাস থেকে নেমে যান। পুলিশের হাতে তাঁদের ফোন চলে যেতে পারে এবং তাতে থাকা ছবি বা ভিডিও মুছে দেওয়া হতে পারে, এমন আশঙ্কাও হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। একই প্রতিবেদনে এক জাতীয় সংবাদ সংস্থার এক চিত্রসাংবাদিকের আটকের কথাও রয়েছে। ওই চিত্রসাংবাদিক পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
স্বাধীন সাংবাদিক এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটরও আটক
এদিন স্বাধীন সাংবাদিক এম রাজশেখরও আটক হন বলে খবর। কনট প্লেসে ছাত্রছাত্রীদের আটক করার ছবি তুলছিলেন তিনি। সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর শ্যাম মীরা সিংকেও আটক করা হয়।
এর আগের দিন, অর্থাৎ শনিবারও সাংবাদিকদের আটকের খবর সামনে এসেছিল। স্ক্রল ডট ইন-এর সাংবাদিক আয়ুষ তিওয়ারি ও শোয়েব দানিয়াল দিল্লিতে এবং দিব্যা আশ্লেষা পুণেতে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আটক হন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Human rights violation in cockroach protests: ১০ অক্টোবর, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির ডাকে দিল্লির বিক্ষোভে, পুলিশি দমনপীড়নে ৭ হাজারের বেশি আটক হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ বন্দিদের ‘তাৎক্ষণিক নিঃশর্ত মুক্তি’ দাবি করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক এই বিবৃতি, ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’ ও ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিউজলন্ড্রি, দ্য কুইন্ট, নবভারত টাইমস, রয়টার্স, অল্ট নিউজ, বুম লাইভ, মলিটিক্স এবং রিপোর্টার টিভি-র সাংবাদিকদেরও আটকের কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। তাঁদের পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও কেন আটক?
সাংবাদিকদের আটকের ঘটনাটি সামনে এসেছে এমন এক দিনে, যখন সুপ্রিম কোর্টে দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং নাগরিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আদালত শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র নাগরিকদের বেআইনি ভাবে আটক না করা এবং মানুষের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছিল। আদালতের নির্দেশের পরও সাংবাদিকদের আটক করার অভিযোগে প্রশ্ন উঠেছে, মাঠে সেই নির্দেশ কতটা কার্যকর হয়েছে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলির বক্তব্য কী?
সাংবাদিকদের আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম-স্বাধীনতা পর্যবেক্ষক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)। সংস্থাটি ভারতে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ‘নির্মম ভাবে আটক’ করার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।
RSF-এর বক্তব্য, “জনস্বার্থের ঘটনা কভার করা কোনও অপরাধ নয়। এটা সাংবাদিকদের কাজ। সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।” RSF-এর এক্স হ্যান্ডেলে করা পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, ভারতে কমপক্ষে ১৬ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে; যখন তাঁরা গণবিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করছিলেন।
স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের সংগঠন Digipub News India Foundation-ও দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সঙ্গে মাঠের পরিস্থিতির অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। প্রেস কার্ড ও মাইক্রোফোন হাতে থাকা সাংবাদিককে আটক করাকে শুধুমাত্র ভিড় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায় না, এমন মন্তব্যও করেছে সংগঠনটি।
Digipub-এর দাবি, আটক সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে তাঁদের বাধাহীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সাংবাদিকদের বেআইনি আটকের অভিযোগ ও তাঁদের উপর হামলার ঘটনা নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আটক হওয়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা পরিচয়পত্র দেখানোর পরও কেন আটক হলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী আইনি ভিত্তিতে পদক্ষেপ করা হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও কেন আটক করা হলো, এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর কি পাওয়া যাবে?





