বৃষ্টির ফোঁটায় তেল আর অ্যাসিড! কেন তেহরানে অ্যাসিড বৃষ্টি?

Iran-Israel conflict: ৯ মার্চ সকাল থেকেই তেহরানের আকাশ জুড়ে কালো রঙের বৃষ্টি শুরু হয়; স্বচ্ছ বৃষ্টির ফোঁটার পরিবর্তে আকাশ জুড়ে নামতে থাকে তৈলাক্ত বারিধারা।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
বৃষ্টির ফোঁটায় তেল আর অ্যাসিড! কেন তেহরানে অ্যাসিড বৃষ্টি?

আকাশ থেকে নাকি কালো বৃষ্টি পড়ছে। না এ কোনো কল্প বিজ্ঞানের গল্প নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত তেহরানের বাসিন্দারা সম্প্রতি এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন। টাইম ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতা জানান কিয়ানোশ নামের এক প্রকৌশলী; তিনি জানান জ্বলন্ত তেলের ডিপো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত তাজরিশেও এই কালো বৃষ্টি লক্ষ্য করা গিয়েছে। এই কালো বৃষ্টির নেপথ্যে রহস্য কী?

গত ৭ মার্চ রাতে, তেহরানের তেল পরিশোধন কেন্দ্র, শাহারান, ফারদিস এবং আঘদাসিয়ায় অবস্থিত তেলের ডিপো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইজরায়েল। মুহূর্তেই আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের বিভীষিকা এতই বেশি ছিল পরেরদিন সকালে তেহরান তেল পরিশোধন কেন্দ্র এবং শাহারান ডিপোর স্যাটেলাইট ছবিতে ধোঁয়ার প্রমাণ মেলে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন বারবার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে কলকাতা?

Kolkata Earthquake: অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র সাতক্ষীরায় হলে কলকাতায় এত তীব্র কম্পন অনুভূত হলো কেন? অথবা এতক্ষণ ধরে কম্পন স্থায়ী হওয়ার কারণ কী? সেজন্য আমাদেরকে কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটির চরিত্র বুঝতে হবে।

তার পরপরেই, ৯ মার্চ সকাল থেকেই তেহরানের আকাশ জুড়ে কালো রঙের বৃষ্টি শুরু হয়; স্বচ্ছ বৃষ্টির ফোঁটার পরিবর্তে আকাশ জুড়ে নামতে থাকে তৈলাক্ত বারিধারা। বৃষ্টি থামার পর গাড়ির কাঁচ বা বনেট, বাড়ির জানালার ছাদ ছেড়ে যায় পুরু ধূসর আস্তরণে। সেই ঘটনার পরপরই ইজরায়েলের প্রথম সারির একটি পত্রিকা ঘোষণা করে যে তেহরানের বাতাসকে বিষিয়ে দিতে, বিষাক্ত হাইড্রোকার্বন যৌগ, সালফার এবং নাইট্রোজেন-অক্সাইড (NOx) গ্যাস পরিবেশে ছড়িয়ে দিয়েছে ইজরায়েল। এমনিতেই পেট্রোল, ডিজেলের মতো দাহ্য পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এলে দহনের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে সালফার-ডাই-অক্সাইড (SO2), নাইট্রোজেন-ডাই-অক্সাইড (NO2) তৈরি করে। রাসায়নিক মিশ্রিত বিষাক্ত বায়ুমন্ডলের ভিতর দিয়ে নামার সময় বৃষ্টির কণাগুলি এই সমস্ত রাসায়নিকগুলিকে শোষণ করে, ক্ষেত্রবিশেষ সালফিউরিক (H2SO4) ও নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO3) তৈরি করে। তার ফলে এই তৈলাক্ত, কালো বৃষ্টির দেখতে মিলেছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দোরগোড়ায় ডে জিরো: ভারতে জলভাণ্ডার শেষের মুখে?

Day Zero Drought: গবেষকদের মতে, Day Zero Drought (DZD) এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে বহু বছরের খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নদী-জলাধারের জল কমে যাওয়া এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা একসঙ্গে ধাক্কা দেয়। ফলে জলাধার কার্যত শূন্য হয়ে যায়।

তবে শুধু রাসায়নিক পদার্থ নয়, এই বৃষ্টির সঙ্গে মিশে আছে ভারী হাইড্রো-কার্বন, মিসাইলের টুকরোর ধাতব অংশ, যেগুলি পরিবেশ তথা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর । গত, ১১ মার্চ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই অ‍্যসিড বৃষ্টি বা কালো বৃষ্টির জন্য সতর্কতা জারি করে; এইসব ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থগুলি কোনোভাবে মানব শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, মাথাঘোরার, স্কিনে র‍্যাশ বেরোনোর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এমনকী দুর্বল রোগীদের শ্বাসযন্ত্র পর্যন্ত বিকল হয়ে যেতে পারে। এছাড়া বাতাসে পেট্রোকেমিক্যালজাত হাইড্রোকার্বনের (পলি সাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন) দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এই কালোবৃস্টির ফলে গতকাল (১১ মার্চ)থেকে গোটা তেহরান জুড়ে মানুষজন মাথাব্যথা, মুখে তেতো স্বাদের মতো অস্বস্তি অনুভব করছেন; অনেকেই সারাদিন ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নেবুলাইজার বা ইনহেলার। কিন্তু চাহিদা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায়, তাদের দাম আকাশছোঁয়া।

তেহরানের জনবহুল শহর, প্রায় ১ কোটি লোক এখানে বসবাস করেন। চারপাশে পাহাড় দিয়ে ঘেরা এই রাজধানী শহরটির ভৌগলিক অবস্থান আরও দূষণকে দীর্ঘায়িত করে তুলেছে। ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এবং পাহাড়ের কারণে পর্যাপ্ত বায়ুপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় দূষণ সৃষ্টিকারী পদার্থগুলি অনেকক্ষণ পর্যন্ত বাতাসে ঘুরপাক খেতে থাকে, আর সেই রেশ টানতে হয় শহরবাসীর।

কালো বৃষ্টির এই সংকট, যে কোনো বিস্ফোরণের থেকে কম নয়; কারণ বৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষতিকারক এই রাসায়নিক পদার্থগুলি যদি কোনোভাবে ভূগর্ভস্থ জলের সঙ্গে মিশে যায়, তার পরিণাম হবে আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি। এর ফলে, ওই এলাকার খাদ্য-শৃঙ্খল পর্যন্ত বিগড়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি নামক একটি সংস্থা ওই এলাকায় দুই শতাধিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে। অতএব, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে কালো বৃষ্টির মতো ঘটনা যে আবার ঘটবে না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?