দোরগোড়ায় ডে জিরো: ভারতে জলভাণ্ডার শেষের মুখে?
Day Zero Drought: গবেষকদের মতে, Day Zero Drought (DZD) এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে বহু বছরের খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নদী-জলাধারের জল কমে যাওয়া এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা একসঙ্গে ধাক্কা দেয়। ফলে জলাধার কার্যত শূন্য হয়ে যায়।
জলের অপর নাম জীবন। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জল ছাড়া আমাদের চলে না। কিন্তু কোনোদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কলের ট্যাপ খুলে যদি দেখেন জল পড়ছে না এক ফোঁটাও! শুধু আপনার বাড়ি নয়, শহরজুড়ে একই অবস্থা। জলাধার শুকিয়ে গেছে। কী করবেন? এমন পরিস্থিতি ভাবাই যায় না, তাই তো? কিন্তু এটাই ভবিতব্য; বলছেন বিজ্ঞানীরা। ডে জিরো (Day Zero Drought) একসময় ছিল ভবিষ্যতের ভয়াবহ কল্পনা। এখন যা বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস এবং সতর্কবার্তা।
ডে জিরো আসলে কী?
গবেষকদের মতে, Day Zero Drought (DZD) এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে বহু বছরের খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, নদী-জলাধারের জল কমে যাওয়া এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা একসঙ্গে ধাক্কা দেয়। ফলে জলাধার কার্যত শূন্য হয়ে যায়। Nature Communications-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে খরা-কবলিত এলাকার প্রায় ৭৫ শতাংশেই ভয়াবহ জল সংকট দেখা দিতে পারে।
এর আগে ২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন কার্যত ডে জিরোর দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। জলাধার প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় সরকার ঘোষণা করেছিল, কলের জল বন্ধ করে দেওয়া হবে। শেষ মুহূর্তে কড়া বিধিনিষেধ, জল রেশনিং ও নাগরিক সচেতনতায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
এছাড়াও ভারতের চেন্নাইয়ে ২০১৯ সালে জলাধার শুকিয়ে যায়, ট্যাংকার নির্ভরতা বাড়ে। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে দীর্ঘ খরায় বাধ্যতামূলক জল কাটছাঁট করা হয়। তাছাড়া মেক্সিকো, সাও পাওলো, তেহরান সব জায়গাতেই জল সংকট এখন স্থায়ী সমস্যা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Pollution: ২০২৫-এর শেষ দিক এবং ২০২৬-এর শুরুর দিকের পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। কলকাতার বায়ুদূষণ নিয়ে যে তথ্যগুলো সামনে আসছে, তা রীতিমতো উদ্বেগের। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন মনিটরিং স্টেশনে, AQI প্রায়শই ৪০০ ছুঁইছুঁই, ক্যাটাগরিক্যালি দেখলে যা 'বিপজ্জনক' বা 'খুবই খারাপ' (Very Poor)।
এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনে গবেষণায় চারটি বড় কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলি হলো - বৃষ্টির ঘাটতি, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মাটির আর্দ্রতা হারানো, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং মানুষের চাহিদা, জল সরবরাহের ক্ষমতাকে ছাপিয়ে যাওয়া।
বিশ্বের কোন কোন অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিতে?
বিজ্ঞানীরা যেসব অঞ্চলকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকার বড় অংশ, ভারত, উত্তর চিন, দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া।
Ecoticias-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২০-৩০-এর দশকেই বহু অঞ্চলে ডে জিরো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। বিশ্বের প্রায় ১৪ শতাংশ বড় জলাধার এই সময়ের মধ্যে পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতে ডে জিরোর ঝুঁকি কতটা?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
La Nina Effect: উত্তর ভারতে নভেম্বর থেকেই শীতল প্রবাহ শুরু হয়েছে। এর পিছনের কারণ হলো ‘পোলার ভর্টেক্স’। মেরু অঞ্চলে ঘূর্ণায়মান অত্যন্ত শীতল বাতাসের যে বলয় থাকে, তাকেই পোলার ভর্টেক্স বলা হয়।
ভারতের ক্ষেত্রেও ডে জিরো ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং আসন্ন সময়ের বাস্তব। অনেক জায়গায় তার ছায়া ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, দিল্লি, জয়পুর; এই শহরগুলিতে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত নামছে। অতিরিক্ত বোরওয়েল, কংক্রিটের বিস্তার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণের অভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
কিন্তু সমস্যা শুধু জল কমে যাওয়ার নয়, জলের মানও ভয়াবহ ভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে পানীয় জলের পাইপে ছিদ্র হয়ে তাতে শৌচাগারের জল মিশে যায়। এবং তার ফলে, সেই দূষিত জল পান করে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৫ জনের মৃত্যু হয়। যখন সরকারি জল সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যেই নর্দমার জল ঢুকে পড়ে, তখন এটি স্পষ্ট যে, জল সংকট মানে শুধু ‘জল অভাব’ নয়। অপরিকল্পিত ও ভগ্ন পরিকাঠামোও ডে জিরোর আরেকটি রূপ।
যখন পর্যাপ্ত জল নেই, তখন মানুষ বাধ্য হয় দূষিত উৎসের উপর নির্ভর করতে। আর সেখান থেকেই ছড়ায় ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিসের মতো রোগ। ডে জিরো তাই শুধুই পরিবেশগত সংকট নয়— এটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ও।
শহর বনাম গ্রাম: কারা বেশি বিপদে?
গবেষণা বলছে, প্রায় ৭৫ কোটির বেশি মানুষ প্রথম পর্যায়ের ডে জিরোর মুখোমুখি হতে পারেন। এর মধ্যে শহরের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে, কারণ শহর সম্পূর্ণভাবে পাইপলাইন ও জলাধারের উপর নির্ভরশীল। গ্রামে প্রথম প্রভাব পড়বে কৃষিতে, যা খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার জল সংকট শুরু হলে, অনেক জায়গাই আর আগের অবস্থায় ফিরতে পারে না। একের পর এক খরা অঞ্চলকে ‘নো-ব্রিদার সাইকেল’-এ ফেলে দেয়।
তাহলে পথ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়ন যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আটকে রাখা যায়; তাহলে ডে জিরো কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। তার জন্য কার্বন নিঃসরণ কমানো, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জল ব্যবস্থাপনা জলাধার ও পাইপলাইনের সংস্কার এবং পানীয় জল ও নর্দমার সম্পূর্ণ পৃথক ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এসব না হলে ডে জিরো অনিবার্য।
গবেষকদের স্পষ্ট সতর্কবার্তা, ডে জিরো আর দূরের ভবিষ্যৎ নয়। অনেক জায়গায় তা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। প্রশ্ন একটাই, জল পুরোপুরি ফুরিয়ে গেলে তারপর কি আমরা তার দাম বুঝব?







