কেন জাপানে নিষিদ্ধ ভারতীয় আম?

Indian mangoes in Japan: ২০ বছর পর আবার কেন ভারতীয় আমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল জাপান? শুধু গুণমানের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, নাকি এর পিছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রাজনীতি ও প্রযুক্তিগত ‘মনোপলি’র অভিযোগও?

inscript
৩ মিনিট
কেন জাপানে নিষিদ্ধ ভারতীয় আম?

ভারতীয় আমের কদর এখন বিশ্বের নানা দেশে। আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া বা বাঙ্গানাপল্লির মতো আম বিদেশের বাজারে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে বহুদিন ধরেই। কিন্তু সেই সাফল্যের মাঝেই এ বছর বড় ধাক্কা এল জাপান থেকে। প্রায় ২০ বছর পর ফের ভারতীয় আম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জাপান। আর এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই ক্ষোভ, হতাশা এবং নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রফতানিকারকদের মধ্যে।

জাপানের অভিযোগ, ভারতের কিছু ট্রিটমেন্ট বা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে ত্রুটি ধরা পড়েছে। মার্চ মাসে উত্তরপ্রদেশের রেহমানপুরে একটি ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (VHT) কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে জাপানের কোয়ারান্টাইন আধিকারিকরা নাকি ফিউমিগেশন ও জীবাণুনাশক ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখতে পান। তারপরই জাপান সিদ্ধান্ত নেয়, ২৫ মার্চের পর ভারত থেকে দেওয়া শংসাপত্রযুক্ত আম আর তারা গ্রহণ করবে না।

এই ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (VHT) পদ্ধতিটি আসলে কী? এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে আমকে নিয়ন্ত্রিত গরম ও আর্দ্র বাতাসের মধ্যে রাখা হয়, যাতে ফলমাছি বা অন্য কোনো পোকামাকড় না থাকে। জাপান বহু বছর ধরেই ভারতীয় আমের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কঠোরভাবে মানিয়ে আসছে। প্রতি বছর আমের মরসুম শুরুর আগে জাপানের বিশেষজ্ঞ দল ভারতে এসে এই কেন্দ্রগুলি পরীক্ষা করে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমও হতে পারে প্রাণঘাতী! সর্বোচ্চ আম খাওয়ার যে পরিমাণ বেঁধে দিলেন চিকিৎসকরা

Mango Health Hazards: যেহেতু আম ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।

তবে ভারতীয় রফতানিকারকদের একাংশের বক্তব্য, শুধু প্রযুক্তিগত কারণে এই নিষেধাজ্ঞা হয়েছে, এমন নয়। তাঁদের অভিযোগ, জাপান ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করতে চাইছে, যেখানে শুধু জাপানি প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতিই অনুমোদন পাবে। ফলে গোটা মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর এক ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতে পারে। উত্তরপ্রদেশের এক রফতানিকারক আক্রম বেগ এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন,

“যদি শুধু জাপানি সিস্টেমকেই মান্যতা দেওয়া হয়, তাহলে এটা প্রযুক্তিগত বিষয় না হয়ে কূটনীতি ও মনোপলির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।”

রফতানিকারকদের আরও অভিযোগ, সব কেন্দ্রের আম একসঙ্গে বাতিল করার সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক। তাঁদের মতে, কোনো একটি কেন্দ্রে সমস্যা থাকলে নির্দিষ্ট সেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু পুরো ব্যবস্থাকেই অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ফলে অনেকের মনেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে, জাপান আগে থেকেই কড়া অবস্থান নিয়ে এসেছিল কি না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গাছ পাহারা দেয় নিরাপত্তারক্ষী এবং কুকুর! জানেন বিশ্বের সবচেয়ে দামী আম কোনটি?

Most Expensive Mango : কয়েক ভরি সোনার দামে বিকোয় এক কেজি আম! এই জাপানি আমের কথায় চোখ কপালে উঠবে আপনারও!

এই নিষেধাজ্ঞার সময়টাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিল থেকে জুন—এই সময়টিই ভারতীয় আম রফতানির সবচেয়ে বড় মরসুম। তার মধ্যেই জাপানের এই সিদ্ধান্তে বহু ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এমনিতেই এ বছর অতিরিক্ত গরমে মহারাষ্ট্রের আলফানসো উৎপাদন কমেছে। পরিবহণ খরচও বেড়েছে। তার উপর জাপানের বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাপ আরও বাড়ল।

যদিও পরিসংখ্যান বলছে, জাপান ভারতের সবচেয়ে বড় আম-ক্রেতা নয়। ভারতের প্রধান রফতানি বাজার হলো সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, আমেরিকা, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস ও সৌদি আরব। তবু জাপানের বাজারের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ সেখানে ভারতীয় আম তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয় এবং গুণমানের জন্য বিশেষ পরিচিতি পায়। গত অর্থবর্ষে জাপানে প্রায় ১৫ লক্ষ ডলারের আম ও আমজাত পণ্য রফতানি হয়েছিল।

১৯৮৬ সালে প্রথম ভারতীয় আমের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল জাপান। অভিযোগ ছিল, ভারতীয় আমে ফলমাছির সংক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। সেই নিষেধাজ্ঞা টানা ২০ বছর বহাল ছিল। পরে দীর্ঘ আলোচনা, বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এবং বিশেষ ট্রিটমেন্ট পদ্ধতি চালুর পর ২০০৬ সালে জাপান সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তখন ভারত সরকার এটিকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য বলেই দেখেছিল।

নিষেধাজ্ঞা ওঠার পর আলফানসো, কেসর, ল্যাংড়া, চৌসা, মালিকা ও বাঙ্গানাপল্লি—এই ছয় ধরনের আম জাপানে রফতানির অনুমতি পায়। নির্দিষ্ট কয়েকটি রাজ্যের অনুমোদিত কেন্দ্র থেকেই সেই আম পাঠানো হতো। অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ছিল সেই তালিকায়।

ভারতের আমচাষি ও রফতানিকারকদের আশা ছিল, ধীরে ধীরে জাপানের বাজার আরও বড় হবে। কারণ জাপানে বিদেশি ফলের বাজার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হলেও ক্রেতারা ভালো মানের ফলের জন্য বেশি দাম দিতে রাজি থাকেন। কিন্তু এবারকার সিদ্ধান্ত সেই আশায় ধাক্কা দিল।

যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবে আমচাষিদের সংগঠনের দাবি, কেন্দ্র ইতোমধ্যেই জাপানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। তাঁদের আশা, অন্তত আগামী মরসুমের আগে কোনো সমাধান বেরোতে পারে। কিন্তু এই মরসুমে নিষেধাজ্ঞা ওঠার সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে করা হচ্ছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

মোদী জমানায় যেভাবে বেড়েছে ভাই-বেরাদারি পুঁজিবাদ

25 Years of Modi's Economic Legacy: মোদী জমানায় রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কর্পোরেট পুঁজির ঘনিষ্ঠতায় কীভাবে বদলে যাচ্ছে ভারতের অর্থনীতির চরিত্র, বেড়েছে ভাই-বেরাদারি পুঁজিবাদ, একচেটিয়া বাজার ও মুষ্টিমেয় শিল্পগোষ্ঠীর আধিপত্য?

বছরে ৫০ দিনের ছুটি কমে ৪০! বাদ পড়তে পারে কোন কোন উৎসবের ছুটি?

West Bengal Government Holidays: পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মীদের বছরে ছুটির সংখ্যা প্রায় ৫০ দিন থেকে কমিয়ে ৪০ দিন করার পরিকল্পনা করছে শুভেন্দু সরকার। অর্থসচিবকে নতুন ছুটির তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূল আমলে চালু হওয়া শিবরাত্রি, ভাইফোঁটা, ছটপুজো-সহ একাধিক ছুটি কি তবে এবার বাতিল হতে চলেছে?

দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের জয়, ট্রাম্পের ক্ষমতায় কতটা লাগাম পড়বে?

US midterms 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দুর্গে বড় ধস নামিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শুল্কনীতি এবং যুদ্ধ সংক্রান্ত অসন্তোষের জেরে ট্রাম্পের নীতি প্রত্যাখ্যান করল ভোটাররা। বদলের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে?

মিডটার্ম নির্বাচনে কে কত টাকা ঢাললেন?

US midterm elections 2026: আমেরিকার নির্বাচনে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ব্যয়। ইলন মাস্ক ও জর্জ সোরোসের মতো ধনকুবেরদের অনুদান, সুপার প্যাক ও ডার্ক মানি কীভাবে আমেরিকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে?

মানুষ টাকা পেয়ে গেলে ভুলে যাবে, অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ সম্পর্কে বললেন বিজেপি বিধায়ক সজল

Sajal Ghosh interview: ‘ভয় ছাড়া ভক্তি আসে না’— আইন-শৃঙ্খলা, দুর্গাপূজা বিতর্ক এবং তৃণমূলের দলবদল নিয়ে নিজের মতামত জানালেন বিজেপি নেতা সজল ঘোষ।

ভারতের রাজনীতি কতটা বদলে দিয়েছেন মোদী?

25 years of Narendra Modi: ২৫ বছরে মোদী কতটা বদলে দিয়েছেন ভারতের রাজনীতি? উন্নয়ন, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রচারের ধরন থেকে শুরু করে গণতন্ত্র, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাতীয় পরিচয়ের ধারণা—কীভাবে বদলেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র?

ব্রাজিল থেকে আমেরিকা যে কারণে দক্ষিণপন্থীদের শাস্তি দিচ্ছে শান্তিকামী মানুষ

The Alt - right Tide Turns: বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে। হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের অরবান-শাসনের অবসান, সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী বিজয়, ব্রাজিলে প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে থেকেও লুলার জয়, আমেরিকায় মিডটার্মে ডেমোক্র্যাটদের সংসদের দুই কক্ষ দখল, সব মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে অতি-দক্ষিণপন্থী জোয়ারে ভাটার সুর। তবে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, ইতালিতে দক্ষিণপন্থা এখনও টিকে আছে। সেগুলির বিরুদ্ধেও চলছে জেনজিদের, শ্রমজীবী অভিবাসী মানুষদের বিক্ষোভ।

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?