নারী সংরক্ষণ বিল বাস্তবায়নে হঠাৎ এত তাড়া কেন? ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে উঠছে প্রশ্ন

২০২৩ সালে এই আইন পাস হওয়ার সময় থেকেই তার কার্যকারিতা ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল—যা কার্যত বাস্তবায়নকে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ এখন হঠাৎ করেই সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

inscript
৪ মিনিট
নারী সংরক্ষণ বিল বাস্তবায়নে হঠাৎ এত তাড়া কেন? ডিলিমিটেশন ও আসন বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে উঠছে প্রশ্ন

ভারতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার ভাষা প্রায়শই নিজেকে নৈতিকতার আবরণে ঢেকে রাখতে পছন্দ করে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টির নীতিগত ও রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলি সেই চেনা প্রবণতারই একটি সুসংগঠিত উদাহরণ হয়ে উঠছে। উন্নয়ন, জাতীয়তাবাদ এবং নারী ক্ষমতায়ন—এই শব্দগুলিকে ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে। সেই তালিকায় সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো নারী সংরক্ষণ বিল বা ‘নারী শক্তি বন্দন’।

লোকসভা ও বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রস্তাবটি শুনতে নিঃসন্দেহে প্রগতিশীল মনে হয়। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক সংশোধন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের তৎপরতার গভীরে গেলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। এই উদ্যোগ কি কেবলই নীতিগত সংস্কার, নাকি এর পিছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল?

২০২৩ সালে নারী সংরক্ষণ বিল পাস হওয়ার সময় থেকেই এর কার্যকারিতা ‘ডিলিমিটেশন’ বা সীমানা পুনর্নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বিলটি বাস্তবায়নের বিষয়টি কার্যত এক অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। অথচ এখন হঠাৎ করেই সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুত শেষ করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রস্তাব উঠেছে লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৮১৬ করার, যেখানে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকতে পারে ২৩৯ থেকে ২৭৩টি আসন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাস্তবায়নের এই আকস্মিক তাড়াহুড়োর প্রকৃত উদ্দেশ্য আসলে কী?

মোদি সরকারের দাবি অনুযায়ী, এটি নারী ক্ষমতায়নের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর এই তৎপরতাকে নিছক কাকতালীয় বলে মেনে নেওয়া কঠিন। বরং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জনমানসে নিজেদের হারানো জমি ফিরে পাওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরির একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

ডিলিমিটেশন প্রসঙ্গে সরকারের সিদ্ধান্ত ২০২৭-এর সম্ভাব্য নতুন জনগণনার বদলে ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি দীর্ঘদিন ধরেই আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল, নতুন জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বিন্যাস হলে সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে। ২০১১-র তথ্য ব্যবহার করে সেই আশঙ্কা আংশিকভাবে প্রশমিত করার চেষ্টা হলেও, এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়; বরং একপ্রকার রাজনৈতিক ‘স্টপগ্যাপ’। প্রশ্ন উঠছে, জনসংখ্যার বাস্তব পরিবর্তনকে উপেক্ষা করলে প্রতিনিধিত্বের কাঠামো কতটা ন্যায়সঙ্গত হবে?

বিরোধী শিবিরের সমালোচনাও এখানে সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কংগ্রেসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও ঐক্যমত ছাড়াই বিলটি সংশোধনের পথে দ্রুত এগোচ্ছে কেন্দ্র। বাস্তবে, এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক যোগ্য মহিলা প্রার্থী খুঁজে বের করা এবং তাঁদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। এর ফলে এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যত বড় দলগুলির জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ, প্রার্থী বাছাই ও প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করার ক্ষেত্রে তারা আগে থেকেই অনেকটা এগিয়ে। এক্ষেত্রে ছোট দলগুলো বড় ধরনের অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি একটি ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে। তৃণমূল কংগ্রেস গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মহিলা প্রার্থী দাঁড় করিয়ে রাজ্যে একটি শক্তিশালী নারীভিত্তিক রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলেছে। ফলে জাতীয় স্তরে এই বিলের মাধ্যমে যে ‘নতুনত্ব’-এর দাবি করা হচ্ছে, তা বাংলার রাজনীতির নিরিখে খুব একটা নতুন কিছু নয়। ফলে জাতীয় স্তরে এই বিলের মাধ্যমে যে ‘নতুনত্ব’-এর দাবি করা হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়: এই আইন কি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করছে, নাকি এটি মূলত নির্বাচনী সুবিধা অর্জনের একটি উপায়? সংসদে মহিলাদের সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু কেবল সংখ্যাই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলি যদি শুধুমাত্র ‘সংরক্ষিত’ আসনে দলীয় অনুগত বা প্রতীকী প্রার্থী দাঁড় করায়, তবে তা প্রকৃত ক্ষমতায়নের বদলে ‘টোকেনিজম’ বা নামমাত্র উপস্থিতিতে পরিণত হতে পারে।

নারী সংরক্ষণ বিল আজ এক দ্বিমুখী বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়। একদিকে, এই বিল মহিলাদের দীর্ঘদিনের দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দিচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় জয়। অন্যদিকে, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সেই সদিচ্ছার বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। আদতে এটি কি নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন, নাকি ভোটের সমীকরণে নারী শক্তিকে কেবল একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা?

অতএব, এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সংখ্যার মোহ কাটিয়ে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুণগত দিকটি নিয়ে ভাবা। নারী প্রতিনিধিত্ব কেবল আসনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ থেকে নির্বাচনী কৌশল হয়েই থাকবে, নাকি নীতি নির্ধারণের স্তরে কার্যকর, স্বতন্ত্র এবং প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করবে?

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ডানাছাঁটা ট্রাম্প-নেতানিয়াহু, বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

Trump midterm defeat: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির পরাজয় এবং ইজরায়েলের নির্বাচনে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো—দুটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী হবে? আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের সমীকরণ কি বদলাবে? আর বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাবই বা কতটা পড়বে?

ট্রাম্পের হারের ৫ কারণ: কেন মুখ ফিরিয়ে নিলেন মার্কিন ভোটাররা?

US Midterm Elections: আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে ট্রাম্পের নীতি—রিপাবলিকানদের ভরাডুবির পাঁচটি মূল কারণ কী কী?

পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন

Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?

রামলীলা ময়দানের সভায় ভিড় দেখাতে এআই ছবি? কতটা সত্যি?

Ramlila Maidan AI image controversy: দিল্লির রামলীলা ময়দানে ১ নভেম্বরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের সমাবেশে ভিড় ও এআই ছবি ব্যবহার নিয়ে বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে বিতর্ক তুঙ্গে। ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা কী?

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।